Sunday, 3 January 2021

ভাললাগা রহস্য গল্প (মোবাইল ভাঃ): চাবি (শ্রীধর সেনাপতি)

 

চাবি

শ্রীধর সেনাপতি

কটা চাবি ঘুরল। দরজা খুলল। এক সেকেন্ডের জন্য বিরতি। ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল একজন। দরজা ফের বন্ধ হয়ে গেল। ফের চাবি ঘুরল। সময়টা দুপুর হলেও ঘরের সব কটি জানালায় ভারী ভারী পর্দা ঝুলিয়ে দিয়ে অল্প পাওয়ারের রঙিন আলো জ্বেলে রাখা হয়েছে।

আগন্তুককে বসতে বলা হল। সে একটা চেয়ারে বসে গৃহস্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল।

একখানা হুইল চেয়ারে বসে রয়েছে টেবিলের পাশে। বয়স ষাটের ওপর। গায়ের রং সাহেবদের মত। মাথার সব চুল, চোখের ভুরু সাদা হয়ে গেছে। দুটো পাই হাঁটুর কাছ থেকে নেই।

আগন্তুক বলল, ‘আমাদের কাছে আপনার নাতির সাঙ্কেতিক নাম ছিল ডট। ইণ্ডিয়ার পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র সম্পর্কে কিছু গোপন কাগজপত্র নক্সা আমাকে দেবার জন্য তার হাতে জমা ছিল। আপনার এই ফ্লাটের মধ্যেই সেগুলো রয়েছে। ডট আমাকে এসময়ে এখানেই দেখা করতে বলেছিল। কিন্তু ঘণ্টা খানেক আগে--’

বৃদ্ধ বলল, ‘ইদানীং আমি বুঝতে পারছিলাম, কোন বিপজ্জনক কাজে হাত দিয়েছে ও। আপনি বলুন, কী হয়েছে ওর। সব রকম খবর শোনবার জন্য আমি আমার মনটাকে তৈরি করে রেখেছি।

আগন্তুক আমতা আমতা করে বলল, ‘মানে--আমি আপনার নাতির কাগজপত্রগুলো এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। যা হবার হয়ে গেছে। যাতে এ বয়সে আপনি অকারণে বিপদের মধ্যে জড়িয়ে না পড়েন...’

টেবিলের ওপরে নানা রকম ওষুধের শিশি। গ্লাসে একটু জল নিয়ে একটা ওষুধ ঢেলে পকেট থেকে কী একটা বের করল বৃদ্ধ। সেটা টপ করে মুখের ভেতরে ফেলে দিয়ে জল সমেত ওষুধটা ঢকঢক করে খেয়ে নিল।

ব্যস্তভাবে বলল আগন্তুক, ‘ওকি! আপনি কী খেলেন?’

বৃদ্ধ নিরুত্তাপ গলায় বলল, ‘ওষুধ। আপনার ভয় নেই। নাতির অপরাধের জন্যে তার দাদু বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে না। যদি এক ঘণ্টা আগে অপঘাতে তার মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে তার অপরাধের শাস্তি তো হয়েই গেছে।

আগন্তুক বলল, ‘তার দরকারি কাগজপত্র সে ফ্ল্যাটে কোথায় রাখত, আপনি কি জানেন?’

বৃদ্ধ বলল, ‘জানা দরকার মনে করিনি।

আমি তাহলে একটু তল্লাশি করে দেখছি। আপনি কিন্তু ওই ফাঁকে টেলিফোন ছোঁবেন না। বা কোন রকম চিৎকার করাও ইউজলেস। আগন্তুকের হাতে একটা পিস্তল দেখা গেল। ‘হ্যাঁ, ইউজলেস। কাছাকাছি এক জায়গায় কী উপলক্ষে মাইক বাজানো হচ্ছে।

কিন্তু, বৃদ্ধ সাহস করে বলল, ‘পিস্তলের আওয়াজ কারো না কারো কানে ধরা পড়ে যেতে পারে।

এই ফ্লাট বাড়ির প্রায় গা ঘেঁষে রয়েছে একটা রেলওয়ে ব্রীজ। সেখান দিয়ে ট্রেনের হরদম যাওয়া-আসা। এই তো, আমি এখানে ঢোকার আগেই একখানা ট্রেন ঝমঝম করে বেরিয়ে গেল। পিস্তলের আওয়াজ চাপা পড়ে যাবে।

বৃদ্ধ বলল, ‘জানেন, ছোঁড়াটার এই পরিণতির কথা আমি তার হাতের রেখা দেখে আগেই বলে দিয়েছিলাম।

তাই বুঝি? আপনি জ্যোতিষবিদ্যা জানেন?’

বৃদ্ধ বলল, ‘ওই জ্যোতিষবিদ্যার জোরে একজন ইংরেজ কারিগরের নজরে পড়ে গিয়েছিলাম। লোকটা তালা-চাবির পাক্কা কারিগর ছিল তখন। আমাকে সে অনেক কৌশল শিখিয়েছিল। ভাল চাকরি দিয়েছিল। থাক, সেসব কথা। বলে রিঙে আটকানো একগোছা চাবি নিয়ে সে নাড়াচাড়া করতে লাগল।

আগন্তুক উপহাস করে বলল, ‘জ্যোতিষবিদ্যার বড়াই করছেন, অথচ আপনার নিজের কপালে কী রয়েছে, সেটাও জানেন বলে আমি মনে করি না।

বৃদ্ধের মুখে শীর্ণ হাসি ফুটে উঠল। অনুত্তেজিত গলায় বলল, ‘আপনি যা বললেন, সবই ঠিক। কিন্তু আপনি যেমন আমার ভবিষ্যৎটা এমুহূর্তে দেখতে পাচ্ছেন, তেমনি আপনার ভবিষ্যৎও আমি পরিষ্কার ভাবে দেখতে পাচ্ছি, একথা বিশ্বাস করেন? আমার। ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ আপনার হাতে...কিন্তু আপনারটাও সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমার ওপর। আমার এবং আমার নাতির ওপর।

একটা ট্রেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ব্রীজ কাঁপিয়ে ঝমঝম করে বেরিয়ে গেল। আগন্তুকের হাতের পিস্তলের ট্রিগারে চেপে বসল একটা আঙুল। সাক্ষী নির্মূল হোক!

দশ মিনিটের মধ্যে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি। ডেস্কের ড্রয়ার থেকে সব কাগজ আর নক্সাই পাওয়া গেছে। হাতের ব্যাগে সেগুলোকে ভরে নিয়ে সে তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতর থেকে দরজার হাতল ঘোরাতে চাইল। ঘুরল না। হাতলের পাশে একটা ছোট্ট সরু ছেঁদা। চাবি ঢোকানোর ঘর। চাবিটা? টেবিলের ওপরে পড়ে রয়েছে রিঙে আঁটা একগোছা চাবি, যা নিয়ে বৃদ্ধ নাড়াচাড়া করছিল একটু আগে।

কোন চাবিটা এ দরজায় লাগবে? সে হাতড়াতে লাগল। ছোট্ট সরু ছেঁদায় ঢুকবে, এমন কোন আকারের চাবিই দেখা যাচ্ছে রিঙে নেই!

চাবি! বৃদ্ধ নিজ মুখে বলেছিল তালা-চাবির অনেক কৌশল তাকে শিখিয়েছিল এক ওস্তাদ সাহেব। মনে মনে ভয়ানক ছটফট করতে করতে সে হাতের ব্যাগ নামিয়ে রেখে চাবির সন্ধানে টেবিল ড্রয়ার, বৃদ্ধের জামা, হুইলচেয়ার হাতড়াতে লাগল।

একসময়ে ওষুধের শিশিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভয়ে হিম হয়ে গেল তার শরীরটা। একটু আগে ওষুধ খেয়েছিল বৃদ্ধ। সেই সময়ে পকেট থেকে কী-একটা জিনিস বের করে মুখে ফেলে দিয়েছিল। কী জিনিস ছিল সেটা? কোন ওষুধের বড়ি, নাকি সরু ছোট্ট একটা চাবি?

ভয়াবহ চিন্তাটার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধের কথার প্রতিধ্বনি কানে বাজতে লাগল তার: আমার ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ আপনার হাতে...কিন্তু আপনারটাও সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমার ওপরআমার এবং আমার নাতির ওপর!

আপলোড: ২৭/৭/২১