Tuesday, 16 January 2018

ভাললাগা ভৌতিক গল্প (মোবাইল ভার্শন): সহচর (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়)

সহচর
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ঙ্গী ভদ্রলোক হঠাৎ আবিষ্কার করলেন সামনের একখানা ছয়বার্থের সেকেণ্ড ক্লাস রিজার্ভ করেছেন তারই পরিচিত একদল এবং তাদের বার্থ খালি যাচ্ছে একখানা। খবরটা সংগ্রহ হতে-না-হতে হৈ-হৈ করে তিনি মালপত্র টেনে নামালেন। যাওয়ার সময় এক গাল হেসে বলে গেলেন, ‘ভালোই হল মশাই আপনার। এখন আপনি একচ্ছত্র। বেশ সম্রাটের মতো ঘুমিয়ে যেতে পারবেন।’
সম্রাট’, ‘একচ্ছত্র এ-সব ভালো কথা শোনবার আগেই আমি অনুমান করেছিলাম, বাইরের কার্ডে যার নাম ছিল, তিনি এ কালের একজন দিপাল সাহিত্যিক। আমি তাঁকে, অবশ্য কখনও দেখিনি; কিন্তু তার ছবির সঙ্গে এ ভদ্রলোকের চেহারারও সাদৃশ্য ছিল যথেষ্ট, তাই একখানা কুপেতে ওপরের বার্থে এমন একজন ভয়ঙ্কর বিখ্যাত সঙ্গীকে নিয়ে ট্রেন যাত্রার কল্পনায় রীতিমতো শঙ্কিত ছিলুম আমি।
সাহিত্য এবং সাহিত্যিক-- দুটোকেই আমি নিদারুণ ভয় করি। আমি কাজ করি স্ট্যাটিসটিসে এবং এ কথা স্বীকার করতে লজ্জা নেই সংখ্যাতত্ত্বের কাছে রসতত্ত্বের স্বাদ অত্যন্ত জোলো বলে মনে হয় আমার কাছে। সারা ভারতবর্ষে বছরে কোন্ ভাষার কত বই ছাপা হয় তার হিসেব মোটামুটি একটা দিতে পারি, কিন্তু ঊর্ধ্ব লোকবিহারী সাহিত্যিক মহারথীটি যদি হঠাৎ জিজ্ঞাসা করেন তার কী কী বই আমি পড়েছি তাহলেই গেছি। মানসাঙ্কে ফেল করা ছাত্রের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া নাস্ত্যেব গতিরন্যথাঃ।
কাজেই তিনি নেমে যেতে বেশ খানিকটা স্বস্তিই অনুভব করলুম সন্দেহ কী! বেশ নিজের মতো বিছানা পেতে নিলুম। গুছিয়ে নিলুম জিনিসপত্র। তারপর আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে মুখাগ্নি করলুম সিগারেটে।
হাওড়া থেকে যখন ট্রেনটা ছাড়ল সেই স্বস্তির আমেজে তখনও ভরপুর হয়ে আছি। পর পর উল্কাবেগে যখন কয়েকটা স্টেশন ছিটকে বেরিয়ে গেল, তখনও। কিন্তু আলো নিভিয়ে শোওয়ার উপক্রম করতেই কি রকম একটা অদ্ভুত অশান্তি আমাকে পেয়ে বসল।
হঠাৎ মনে হতে লাগল, আমি একা। শুধু এই ছোট কামরাটুকুর ভেতরেই নয় এই বিরাট ট্রেনটাতে আমি একা ছাড়া আর কোথাও কোন যাত্রীই নেই। একটা অতিকায় ভুতুড়ে গাড়ি আমাকে নিয়ে একরাশ অজানা অন্ধকারের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়েছে। কোথায় যাচ্ছে আমি জানি না, হয়তো গাড়িটারও সেকথা জানা নেই।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি উঠে বসলুম, আলো জ্বেলে দিলুম। আর তীক্ষ তীব্র আলোর একটা ঝাপটা চোখে এসে লাগবার সঙ্গে-সঙ্গেই অস্বস্তির ঘোরটা কেটে গেল। সত্যি কথা বলতে গেলে, হাসিই পেল আমার। সাহিত্যিকের সঙ্গগুণ আছে বটে। ভদ্রলোক আমার সহযাত্রী না হতেই তার ব্যাধি এসে আমাকে ছুঁয়েছে সঙ্গে থাকলে আর রক্ষা ছিল না দেখা যাচ্ছে। কী করে যে এসব উদ্ভট কল্পনা মাথায় এল আশ্চর্য!
একগ্লাস জল খেয়ে, একটা আলো জ্বেলে রেখে শুয়ে পড়লুম আবার।
কিন্তু চোখের কাছে আলো জ্বললে আমার কিছুতেই ঘুম আসে না। বিরক্ত হয়ে আমি এপাশ-ওপাশ করতে লাগলাম। অথচ আলো নিবিয়ে দিতেও সাহস হচ্ছে না পাছে আবার ওই সমস্ত এলোমেলো ভুতুড়ে ভাবনা আমাকে পেয়ে বসে। চোখের পাতা দুটোকে যথাসাধ্য চেপে ধরে প্রাণপণে ঘুমের সাধনা শুরু করলুম।
সেও মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। তার পরেই একটা নতুন ভাবনা আমাকে পেয়ে বসল। বড় বেশী জোরে যাচ্ছে নাকি গাড়িটা বড় বেশী অস্বাভাবিক স্পীডে? যতগুলো রেলওয়ে অ্যাকসিডেন্টের খবর জানি একটার পর একটা মনে পড়ে যেতে লাগল সেসব। অন্ধকারের ভিভতর দিয়ে অন্ধের মতো ছুটছে ট্রেনটা পার হয়ে যাচ্ছে ঘুমন্ত গ্রাম, শুন্য প্রান্তর, কালো জঙ্গল, নদীর পুল। এই নির্জন নিশীথ যাত্রা যেন ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। কে বলতে পারে কোথায় আলগা হয়ে আছে একটা ফিস প্লেট, কোথায় ব্রীজের পিলারে ধরছে ফাটল! মুহুর্তের ভেতরে লাইন থেকে ছিটকে পড়ে যেতে পারে ট্রেনটা, তারপর আবার আমি নিজের ওপরে বিরক্ত হয়ে উঠলাম। কী আশ্চর্য কেন এ সমস্ত অবান্তর অর্থহীন ভাবনা আমার! প্রতিদিন, প্রতিরাত এমনি অসংখ্য ট্রেন সারা ভারতবর্ষময় ছুটে বেড়াচ্ছে, তাদের কখানাতে অ্যাকসিডেন্ট হয়? দুর্ঘটনা ঘটার ভয় আমার যত বেশী, তার চাইতেও বেশী রেল কোম্পানীর যারা এই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের। কম করেও তিন-চারশো মানুষের প্রাণের দায়িত্ব যাদের হাতে, এ সব ভাবনা আমার চাইতে ঢের বেশীই ভাবছে তারা।
আমি আবার উঠে পড়লুম। টয়লেটে ঢুকে মাথায় চোখে ঠাণ্ডা জল দিলুম খানিকটা। একা গাড়িতে এভাবে চলবার অভিজ্ঞতা জীবনে আমার প্রথম নয় যে জন্যে এই সমস্ত ছেলেমানুষী দুশ্চিন্তা আমাকে পেয়ে বসবে! কোনো কারণে মাথা গরম হয়ে গেছে, তাই এই কাণ্ড।
দুটো পাখারই রেগুলেটার পুরো ঠেলে দিয়ে গাড়ি অন্ধকার করে আবার শুয়ে পড়লুম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সেই অদ্ভুত ভয়টা যেন বুকের ওপরে এসে চেপে বসতে লাগল। মনে হতে লাগল, কোথায় কী যেন ঘটতে চলেছে কী একটা নিশ্চয় ঘটবে। আজ হোক কাল হোক এই গাড়িতে হোক বা পরে হোক। আরো মনে হতে লাগল, এই গাড়িতে এখন আর আমি একা নেই, আমার সঙ্গে আর কেউ অথবা আর কিছু একটা চলেছে। আমার এই বার্থটার নীচেই সে গুড়ি মেরে বসে আছে। একবার মাথা নামিয়ে নীচের দিকে তাকালেই আরো দুটো জ্বলজ্বলে চোখ আমি দেখতে পাবো।
কিন্তু এইবারে আমি নিজের ওপরে চটে উঠলুম। পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি আমি! কোন কারণ নেই কোন অর্থ নেই, তবু পৃথিবীর যত অবাস্তব উদ্ভট কল্পনা আমাকে পেয়ে বসেছে! হালে কতকগুলি বিলিতী ভূতের গল্প পড়েছিলাম, হয়তো তারই প্রতিক্রিয়া এসব
এই অদ্ভুত অস্বস্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্যে এবার আমি মনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলুম দস্তুবমতো। প্রাণপণে ভাবতে চেষ্টা করলুম সংখ্যাতত্ত্বের কতকগুলি জটিল সমস্যা যা ভেড়া গোনবার চাইতেও কার্যকরী। তারপর প্রায় আরো এক ঘণ্টা পরে গাড়ি খড়গপুর ছাড়িয়ে গেল, আমার চোখে ঘুম নেমে এল।
কিন্তু কে জানত জেগে থাকার চাইতেও আরও বীভৎস হয়ে উঠবে ঘুমটা! মনের সমস্ত সরীসৃপ ভাবনা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে ঘুমের ভেতরে! আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলুম।
অদ্ভুত কুৎসিতে সে স্বপ্ন। পরিষ্কার দেখলুম একটা ন্যাড়া নগ্ন পাহাড় আমার সামনে। তার কোথাও একটা গাছপালা নেই এক গুচ্ছ ঘাস পর্যন্তও নয়। কলকাতার চিড়িয়াখানার অতিকায় কচ্ছপগুলোর মতো বড়ো বড়ো পাথরে ছেয়ে আছে তার সর্বাঙ্গ। চারিদিকে, জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। শুধু পাহাড়টার মাথার ওপর পড়ন্ত বেলার খানিক রক্ত-রৌদ্র কারো নিষ্ঠুর ভ্রূকুটির মতো জ্বলছে। আর সেখানে সেই অশুভ রাঙা আলোয় ডানা মুড়ে বসে আছে একটি মাত্র শকুন, যেন অপেক্ষা করে আছে কালপুরুষের মতো। কিন্তু ওইখানেই শেষ নয়। আরো ছিল তারপর। আমি দেখলাম, সেই পড়ন্ত আলোয়, সেই ভয়ঙ্কর নগ্নতার ভেতরে শকুনের সেইক্ষুধার্ত চোখের নীচে চারজন মানুষ একটা মৃতদেহ কাঁধে করে নিয়ে চলেছে। কোথায় চলেছে জানি না। তাদের চারজনের চোখে-মুখেই একটা বিবর্ণ ক্লান্তি। আর আর সেই শববাহকদের মধ্যে আমি একজন।
চীৎকার করে আমি জেগে উঠলুম। আমার সর্বাঙ্গ দিয়ে তখন দরদর করে ঘাম পড়ছে। চলন্ত ট্রেনের শব্দ ছাপিয়ে বেজে উঠছে আমার হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ।
আলো জ্বেলে দিয়ে উঠে বসলুম এবার। না আর ঘুমোব না। যে কোনো কারণেই হোক আমার মধ্যে কোথাও কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম রাত প্রায় তিনটের কাছাকাছি। ঐ সময়টুকু না হয় আলো জ্বেলে বসেই থাকব।
এতক্ষণে আমার মনে অনুতাপ হতে লাগল। সাহিত্যিক ভদ্রলোককে ধরেই রাখা উচিত ছিল আমার গাড়িতে।
এই দুঃস্বপ্নের চাইতে সাহিত্যচর্চাও নেহাৎ মন্দ ছিল না।
হেলান দিয়ে বসে বসে আবার সংখ্যাতত্ত্ব ভাবতে শুরু করলুম। কিন্তু এতক্ষণে সত্যিই ঘুম আমাকে পেয়ে বসেছে। বসে থাকতে থাকতে আবার আমার চোখ জড়িয়ে এল।
এবং—
এবং একটু পরেই সেই কুৎসিত স্বপ্নটার পুনরাবৃত্তি। সেই পাহাড় সেই পড়ন্ত রোদ  সেই শকুন। আর তেমনি একটা মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে আমরা চারজন শবযাত্রী!
এবার চীৎকার নয় আর্তনাদ করে সোজা হয়ে বসলুম আমি। আর পাশের জানলার ভিতর দিয়ে যদি ভোরের ফিকে আভাস দেখা না যেত তা হলে হয়তো চেন টেনে ট্রেন থামিয়ে দিতুম, নয়তো ঝাঁপিয়ে পড়তুম দরজা দিয়ে।
উঠে সমস্ত জানলাগুলো খুলে দিলুম। সূর্য ওঠেনি এখনো বাইরের গাছপালা, মাঠ আর পাহাড়ের ওপরে শুভ্র ধূসর ব্রাহ্মমুহূর্ত। একরাশ কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলে শরীরে আমি গ্রাহ্য করলুম না। বিদেশী কবির ভাষায় শুধু আমার প্রাণভরে বলতে ইচ্ছে করছে:
Hail Holy light—
বেলা আটটার সময় পৌঁছলুম গন্তব্য স্টেশনে। ভুতুড়ে গাড়িটা থেকে নেমে যেন মুক্তিস্নান হল।
স্টেশনে এক্কা ছিল মামাই পাঠিয়েছেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই আট মাইল রাস্তা পার হয়ে গেলুম।
মামা ব্যাচেলার মানুষ। একটু পাগলাটে ধরনের। প্রথম জীবনে সন্ন্যাসী হয়ে কয়েক বছর অজ্ঞাতবাস করেছিলেন, তারপর এখানে এসে ডাক্তারী শুরু করেছেন। একেবারে পাণ্ডববর্জিত গ্রাম-অঞ্চল। কয়েক বাক্স হোমিওপ্যাথি ওষুধের জোরেই এখানে ধন্বন্তরি হয়ে বসেছেন তিনি।
পাহাড়, শালবন, একটি ছোট নদী আর কয়েক ঘর দেহাতী মানুষের ভেতরে মামার লাল টালির ছোট্ট বাড়িটি অত্যন্ত মনোরম। জায়গাটার কাব্যসৌন্দর্য আমি ঠিক বর্ণনা করতে পারব না। সেই সাহিত্যিক ভদ্রলোক থাকলে তিনিই সেটা ভালভাবে করতে পারতেন। মোটের ওপর আমার ধারণা কলকাতা থেকে যারা কিছুদিনের জন্য পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে চায় এবং সেই অজ্ঞাতবাসের সময়ে শহরের কোন পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা না হলেই যারা স্বস্তি বোধ করে, এ জায়গা তাদের পক্ষে আদর্শ।
অনেকটা আগে বাড়িয়েই মামা দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর রগের দু'পাশে দুগোছা পাকা চুল ঝকঝক করছিল সকালের রোদে।।
কিন্তু তার চাইতেও ঝকঝকে হাসি হাসলেন মামা, ‘আয়-আয়! পথে কোন অসুবিধে হয়নি তো?’
অসুবিধে! আমি হাসলাম উত্তরে। সারারাত ট্রেনের সেই দুঃস্বপ্নটা আবার আমার নতুন করে মনে পড়ে গেল।
কিন্তু একটু পরেই ঠাণ্ডা জলে স্নান করে জ্বালা ধরা চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল, আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে এল সব, তখন চামচেতে মুরগীর ডিমের পোচ তুলতে তুলতে আমি মামাকে স্বপ্নটা বললুম। শুনে মামা হো–হো করে হেসে উঠলেন।
‘আসবার আগে মাংস-টাংস খেয়েছিলি বোধ হয়’
‘তা খেয়েছিলুম। একটু বেশীই হয়ে গিয়েছিল।’
‘তাই এই কাণ্ড। পেট গরম হলেই লোকে ওসব খেয়াল দেখে। রান্নার তো দেরি আছে ব্রেকফাস্টটা ভালো করে সেরে নিয়ে ঘণ্টা তিনেক নিশ্চিন্তে ঘুমো। আমি ততক্ষণে গ্রাম থেকে এক রোগী দেখাবার পাট সেরে আসি।’
ব্রেকফাস্ট চুকে যাওয়ার পরে মামার ডাক্তারী ব্যাখ্যাটাকে হৃদয়ঙ্গম করে সমস্ত মনটা বেশ ঝরঝরে হয়ে গেল। তারপর ক্যাম্বিসের খাটিয়ায় গা এলিয়ে দিতেই আবার ঘুমের পালা। এবার নিঃস্বপ্ন এবং নিচ্ছিদ্র।।
ঘুম ভাঙল চাকরটার বিকট কান্নায়।
ছুটে বেরিয়ে এলুম বারান্দায়। মামাকে একদল মানুষ বয়ে আনছে কম্পাউণ্ডের মধ্যে। তাদের চোখে-মুখে শোক আর বেদনার ছাপ। হাউ হাউ করে কাঁদছে চাকরটা।
‘কী হয়েছে? কী হয়েছে?’ বুকফাটা জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিলুম আমি।
কিন্তু উত্তরের দরকার ছিল না আমার মন তা আগেই টের পেয়ে গেছে। তবু কে জানত মামার হার্টের অবস্থা এত খারাপ ছিল! মাইল চারেক দুরে পাহাড়ী রাস্তায় ওঠবার সময় ঘোড়া থেকে তিনি পড়ে যান। যারা কাছে ছিল, তারা বললে, ঘোড়া থেকে পড়ে তিনি মারা যাননি পড়বার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। কাঁদবার মত শক্তি আমার ছিল না।
এসে যখন পড়েছি, তখন শোকে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকা আমার চলে না। আট মাইল দূরের পোস্ট অফিসে দরকারী টেলিগ্রাফ পাঠিয়ে সব ঠিক করে, যখন মড়া নিয়ে বেরুলাম তখন বেলা নেমে এসেছে।
আড়ষ্ট ক্লান্ত পায়ে চলেছি। প্রায় মাইল দেড়েক দূরে শ্মশান।
কিন্তু একি একি! এখানে সেই ন্যাড়া পাহাড়টা এল কোত্থেকে? কোথা থেকে তার ধারালো চুড়োটার ওপরে অমন করে পড়েছে শেষ বেলার হিংস্র আরক্তিম আলো কোথা থেকে একটা শকুন এসে সেখানে ডানা মেলে বসেছে কালপুরুষের মতো?
সব এক সেই স্বপ্নের সঙ্গে সব এক। আমার চারিদিকে সেই অবিশ্বাস্য শূন্যতার সেই প্রেতপাণ্ডুর বিস্তৃতি।
অমানুষিক ভয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম কে যেন আমার পা দুটোকে টানতে লাগল পাথুরে মাটির তলায়। সারারাত ট্রেনে আমাকে অমন করে ভয় দেখালে কে? আমার বার্থের তলায় গুড়ি মেরে যে বসেছিল কে সে?
সে কি মৃত্যু ? আমার সঙ্গে আমারই সহচর হয়ে এসেছে সে?
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত
আপলোড: ১২/১২/২০১৮

ভাললাগা ভূতের গল্প (মোবাইল ভার্শন): ভূতের গল্প (বনফুল)


ভূতের গল্প
বনফুল
হঠাৎ মাখন সিং এসে হাজির হল অনেকদিন পর। শিকারী মাখন সিং। কাঁধে বন্দুক। হাতে একজোড়া মরা পিনটেল। পিনটেল অতি সুস্বাদু বুননাহাঁস। মাখন অনেক বুনোহাঁস খাইয়েছে আমাকে। প্রায়ই হাঁস মেরে আনত। হরিণের মাংস, বুনো শুয়োরের মাংস, সজারুর মাংস, ফ্রবিকানের মাংস ওর দৌলতেই খেয়েছি। আমার ঘরে বাঘের যে চামড়াটা দেওয়ালে টাঙানো আছে সেটাও মাখনের দেওয়া। খুব বড় শিকারী। পরনে খাকি হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট, কাইজারি গাঁফ। মাথার চুল কদম ছাঁট।
অনেক দিন পরে এল আজ। কি মাখনলাল, এস এস। এতদিন কোথায় ছিলে?
‘নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াই। ভাবলাম অনেকদিন দাদার সঙ্গে দেখা হয় নি, দেখা করে আসি। আজ ভাগ্য ভালো, দুটো পিনটেলও পেয়ে গেলাম।’
বেশ, বেশ। বস। চা খাবে না কফি?
মাখন রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, ‘কিছু খাব না। আপনি একটু অন্যমনস্ক হয়ে আছেন মনে হচ্ছে!’
হ্যাঁ, মনে মনে কল্পনার দরবারে ধন্না দিয়েছি। একটা ভৌতিক গল্পের প্লটের জন্য।’
আমার একটা অদ্ভুত ভূতের গল্প জানা আছে। শুনবেন?
বেশ, বল।’
মাখন সিং বলতে লাগল:
‘গৌড়ের কাছে একটা জঙ্গলে শিকার করতে গিয়েছিলাম। একজন খবর দিয়েছিলে সেখানে ভোরের দিকে বড় বড় কালো তিতির পাওয়া যায়। খুব ভোরে বেরোয় তারা। তা ঠিক করলাম রাতে গিয়ে বনের ধারেই শুয়ে থাকব। আমার ছোট একটি বিলিতি খাটিয়া আছে। সর্বত্র নিয়ে যাওয়া যায় প্যাক করে। তার মাপে মশারিও আছে আমার একটা। ঠিক করলাম জঙ্গলের ধাবেই মশারি খাটিয়ে শুয়ে থাকব রাত্রে।
‘খাওয়া-দাওয়া করে চলে গেলাম রাত দশটার পর। সন্ধ্যা থেকেই আমার চাকর শুকুর বিছানা করে মশারি টাঙিয়ে অপেক্ষা কবছিল আমার জন্য। আমি গিয়ে তাকে ছুটি দিয়ে দিলাম। সে বাসায় চলে গেল। আমি লোডেড বন্দুকটি নিয়ে শুয়ে পড়লাম। তখনও চাঁদ ওঠেনি। কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি। কিন্তু বেশ হাওয়া দিচ্ছিল। একটু পরেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না। হঠাৎ একটা ফেঁস করে শব্দ হল। মনে হল সাপ নাকি! সঙ্গে টর্চ ছিল। জ্বেলে দেখি ও বাবা, সাপ নয়, হাতী। বিরাটকায় একটা হাতী। ঠিক সেই সময়েই আকাশে মেঘটা সরে গেল। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের-জ্যোৎস্নায় ভরে গেল চতুর্দিক। দেখলাম হাতী শুধু বিরাটকায় নয়, বেশ সুসজ্জিতও। পিঠে হাওদা রয়েছে। আমার মশারির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে শুড় নাড়ছে, কান নাড়ছে, আর ফোস ফোস শব্দ করছে মাঝে মাঝে। আর কিছু করছে না। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। চুপটি করে বসে রইলাম। ভাবলাম কোথা থেকে এসেছে, আপনিই চলে যাবে। এ বুনো হাতী নয়, পোষা হাতী। প্রায় মিনিট দশেক কেটে গেল হাতী কিন্তু নড়ে না! ক্রমাগত শুড দোলাচ্ছে আর কান নাড়ছে। আরও মিনিট দশেক কেটে গেল! কি করব ভাবছি। এমন সময় হাতীটা এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। হঠাৎ সে আকাশে দিকে শুঁড়টা তুলে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপব শুঁড়টা নামিয়ে আমার মশারির ভিত শুঁড়টা ঢুকিয়ে দিল। শুঁড়ে একটি রুদ্রাক্ষের মালা ছিল, সে মালাটি পবিয়ে দিল আমার গলায়। শুঁড়ের ভিতর থেকে ঠক করে কি একটা পড়ল আমার কোলের উপর। তুলে দেখি শ্বেতপাথরের ছোট শিবলিঙ্গ একটি। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল আমি গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক আর এটি হচ্ছে আমার প্রিয় হস্তী মৈনাক।
‘বললাম, মৈনাক, কি খবর?
‘সঙ্গে সঙ্গে মৈনাক হাঁটু গেড়ে বসল। আর তার শুঁড়টি বেঁকিয়ে ধরল। আমি তার শুঁড়ে পা রেখে হাওদায় গিয়ে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে চলতে শুরু করল সে। গজেন্দ্র গমন নয় ছুট লাগল মৈনাক। কত মাঠ বন গিরি নদী পার হয়ে গেলাম। রাত্রি প্রভাত হয়ে গেল। মৈনাক তবু থামে না। দিনের আলোয় দেখলাম চমৎকার এক দেশ। চারিদিকে প্রাচুর্য, চারিদিকে সৌন্দর্য। কত মন্দির, কত হর্ম, কত জলাশয়, কত বাগান পার হয়ে গেলাম। মৈনাককে দেখে রাস্তার লোক সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দিতে লাগল। জয় মহারাজ শশাঙ্কের জয় জয়ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে লাগল চারিদিক। মৈনাক কিন্তু এক নিমিষের জন্য থামে নি। সে ছুটে চলে। সমস্ত দিন ধরে সে ছুটল। তারপর সূর্য যখন অস্ত গেল, অন্ধকার রাত্রি নামল, তখন বিরাট এক জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল মৈনাক। শুঁড় দিয়ে বড় বড় গাছের ডাল ভেঙে পথ পরিষ্কার করতে করতে এগিয়ে চলল জঙ্গলের ভিতর। কিছুদূর গিয়ে দেখতে পেলাম একটি পরিষ্কার জায়গায় চিতা জ্বলছে। আর চিতার পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাজ্যশ্রী। আমি রাজ্যশ্রীকে ভালবাসতাম কিন্তু তার ভাই রাজ্যবর্ধন ও হর্ষবর্ধনের সঙ্গে আমার ঝগড়া ছিল, তাই তাকে পাইনি।
‘বললাম রাজ্যশ্রী, এখানে কি করছ?
‘আমি জ্বলন্ত চিতায় প্রাণ বিসর্জন করব। তুমি আমাকে বাধা দিও না।
‘নিশ্চয় দেব।
‘সঙ্গে সঙ্গে আমি মৈনাকের পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়লাম। হঠাৎ একটা বর্শা এসে বিধল আমার বুকে। দেখি রাজ্যবর্ধনের প্রেত দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ কুটিল, চোখে আগুন।’
ঠিক সেই সময়ে আমার পৌত্র হুড়মুড় করে ঘরে এসে ঢুকল।
‘দাদু, আজ আমাদের প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ছিল। দেখ, আমি কী সুন্দর রামায়ণ পেয়েছি।’
প্রকাণ্ড কৃত্তিবাসী রামায়ণটা সে রাখল টেবিলের উপর।
সঙ্গে সঙ্গে মাখন সিংযেন উবে গেল। মরা পিনটেল দুটো যেখানে পড়ে ছিল, দেখলাম, সে দুটোও নেই সেখানে। পরদিন খবর পেলাম, শিকার করতে গিয়ে মাখনলালের মৃত্যু হয়েছে। একটা বনের ভিতর তার মৃতদেহটা পড়েছিল।
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত
আপলোড: ১১/১২/২০১৮

Saturday, 13 January 2018

হরর অনুবাদ গল্প (মো. ভার্শন): মাকড়শা বাড়ি


মাকড়শা বাড়ি

পিটার ডি নিভারভিল
বাংলা রূপান্তর: শিশির বিশ্বাস

হাইওয়ের পাশে ছোটমতো এক পোস্টের দিকে চোখ পড়তে জনসন গাড়ির ব্রেক কশে ব্যাক গিয়ার দিয়ে পিছিয়ে নিল খানিক প্রায় অস্পষ্ট হয়ে আসা পুরোনো এক সাইনবোর্ড
এলসওয়ার্থের বিখ্যাত মাকড়শা বাড়ি
পাশের রাস্তায় মাত্র পাঁচ মাইল
মাকড়শার ব্যাপারে জনসনের আগ্রহ অনেক দিনের মনে আছে বয়স তখন মাত্রই আট বছর চিলেকোঠায় বাতিল মালপত্রের ঘরে সোনালি রঙের বড় একটা মাকড়শার জালের খোঁজ পেয়েছিল রোজ সকালে একটা জারে গোটা কয়েক পিঁপড়ে আর পোকামাকড় যোগাড় করে হাজির হত সেখানে একটা একটা করে সেগুলো মাকড়শার জালের উপর ফেলে দিত প্রায় বিদ্যুৎ গতিতে মাকড়শাটা তার গোপন আস্তানা থেকে ছুটে এসে তীক্ষ্ণ দাঁড়া দিয়ে আতঙ্কিত শিকারের দেহে বিষ ফুঁড়ে দিয়ে অপেক্ষা করত বিষের ক্রিয়ায় শিকারটি স্থির হয়ে যেত এক সময় মাকড়শাটা এরপর সন্তর্পণে ফিরে আসত শিকারটির কাছে হরেক কায়দায় জাল দিয়ে মুড়ে ফেলত পরে আহারের জন্য  
   এভাবে চলত জারের শেষ পোকাটি পর্যন্ত একদিন মায়ের চোখে পড়ে যেতে শুধু বকাঝকা নয় পিঠেও কয়েক ঘা পড়েছিল তবে পরোয়া করেনি। জালে আটকানো পোকাগুলোর ছটফটানির সেই ভয়ানক দৃশ্য বহুবার রসিয়ে বন্ধুদের কাছে গল্প করেছে মাকড়শার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে আরও
মাত্র পাঁচ মাইল! জনসন হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল বিকেল চারটে মাকড়শা বাড়ি দেখে মোটেলে ফিরে স্নান সারতে সমস্যা হবার কথা নয় মিটিং সেই সন্ধে ছটায় হাতে যথেষ্টই সময়  
পাশে হাইওয়ে ক্রস করে সরু এক রাস্তা জনসন দেরি না করে সেই পথে গাড়ি ঘুরিয়ে দিল ভিতরে তখন এক অন্য রকম উত্তেজনা টের পাচ্ছিল ও দিনভর বায়ার্সদের সঙ্গে একঘেয়ে মিটিং। কোম্পানির আজেবাজে জিনিসের গুণগান এই ব্যাপারে ওর কেরামতি অবশ্য কম নয় গত তিন বছর ধরে কোম্পানির সেরা সেলস অফিসার। মোটা রোজগার তবু একেবারেই পছন্দ নয় আজকের মিটিংও ব্যতিক্রম নয় তার আগে একটু পছন্দের কিছু মন্দ নয় ভাবতে গিয়ে খুশিতে গাড়ির স্পীড আরও বাড়িয়ে দিল ও কিন্তু খানিক এগোতেই দমে গেল বেশ ধুলোয় ভরা সরু রাস্তাটার প্রায় কঙ্কালসার অবস্থা সাবধানে ড্রাইভ করেও শেষে পথের মাঝে বিশ্রী এক গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে পড়তেই হল
 জনসন ঘড়ির দিকে তাকাল সাড়ে চারটে গোড়ায় ভেবে রেখেছিল মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে যেতে পারবে প্রায় দ্বিগুণ সময় পার হয়ে গেছে ফিরে যাবে কিনা ভাবছে হঠাৎ পিছনে ঝোপজঙ্গল ভরা ছোট এক টিলার মাথায় পাঁচিল ঘেরা পুরোনো এক খামার বাড়ি নজরে পড়ল পাশে আনকোরা নতুন এক সাইনবোর্ড
এলসওয়ার্থের বিখ্যাত মাকড়শা বাড়ি
হরেক মাকড়শার রোমহর্ষক কাণ্ড দেখতে আসুন
ভাগ্যিস পথের উপর গর্তটা ছিল! নইলে নজরেই পড়ত না ছেড়ে এগিয়ে যেত তারপর ফেরার পথে নজরে পড়লেও সময় হত না ফের কবে এদিকে কাজ পড়বে সেই অপেক্ষায় থাকতে হত আসলে সাইনবোর্ডেররোমহর্ষক কাণ্ডশব্দ দুটো তখন প্রায় পেড়ে ফেলেছে ওকে একেবারে মনের কথা!
গাড়ি নিয়ে জনসন যখন টিলার উপর যথাস্থানে পৌঁছল কিছুটা যেন দমেই গেল উঁচু পাঁচিল ঘেরা বাড়ি আধভাঙা কার্নিশ প্লাস্টার খসে প্রায় হতশ্রী অবস্থা আশপাশে জনপ্রাণী নেই কেমন নিঝুম থমথমে বাড়িতে কেউ আছে তো?
সন্দেহটা জনসনের মাথায় সবে পাক খেতে শুরু করেছে কালো স্কার্ট পরা এক বৃদ্ধা পাশের দরজা ফাঁক করে বেরিয়ে এলেন বয়স সত্তরের কম নয় আশিও হতে পারে শীর্ণ লোলচর্ম
কী চাই বাপু?’ খনখনে গলায় বৃদ্ধা বললেন
বাড়ির অবস্থা দেখে জনসন গাড়ি থেকে বের হয়নি তখনও ভিতর থেকেই মুখ বাড়িয়ে বললএটাই কী মাকড়শা বাড়ি?’
বোর্ডে তেমনই তো লেখা নয় কী?’
বৃদ্ধার বাঁকা উত্তর গায়ে না মেখে জনসন বললএখন খোলা আছে কি ? দেখা যাবে?’
দাঁড়াও তাহলে জ্যাককে নিয়ে আসছি ও আবার কাঠ চ্যালা করছেকথা শেষ করে বৃদ্ধা পাশে সরু এক অন্ধকার পথে অদৃশ্য হয়ে গেলেন
জনসন দরজা খুলে গাড়ি থেকে বের হল এবার চারপাশে ফের তাকাল কিন্তু কেমন একটা অস্বস্তি সমানে তাড়া করেই বেড়াতে লাগল খামার বাড়ি এমন নিস্তব্ধ হয় নাকি! বাতাসের মৃদু গোঙানি ছাড়া কোনও সাড়াশব্দ নেই। কেমন নিঝুম লোক ঠকানো কারবার নয়তো? জনসনের কপালের ভাঁজ ক্রমেই বাড়ছিল। ফিরে যাবে কিনা ভাবছে বৃদ্ধাকে ফের দেখা গেল পিছনে আরও লোলচর্ম এক প্রাচীন বৃদ্ধ পরনে নীল রঙের ঢিলে ট্রাউজার আর শার্ট সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আগন্তুক মানুষটিকে সামান্য জরিপ করে নিলেন তিনি থুক করে একদলা চিবোনো তামাক ফেলে হাতের পিঠ দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে চাপা গলায় পাশে বৃদ্ধাকে লক্ষ্য করে বললেনহুঁ গাড়ির শব্দটা তাহলে ভুল শুনিনি দেখছি
উনি তোমার মাকড়শা দেখতে এসেছেনকথা শেষ করে বৃদ্ধা এক মুহূর্ত দেরি করলেন না ঘুরে ভিতরে চলে গেলেন
বৃদ্ধও দেরি না করে ফের জনসনের দিকে তাকালেনআপনি তাহলে আমার মাকড়শা দেখতে এসেছেন?’
একদমজনসন ততক্ষণে মত পালটে ফেলেছে এসেই যখন পড়েছে দেখেই যাবে ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললএকদম তাই কত লাগবে?
জনসনের দিকে বৃদ্ধ নীরবে তাকিয়ে রইল খানিক মুখমণ্ডলের লালচে বলিরেখায় গোটা কয়েক ভাঁজ পড়ল আরও তারপর সংক্ষিপ্ত উত্তরপুরো পঞ্চাশ
পঞ্চাশ ডলার! জনসন ভুরু কোঁচকালবড্ড বেশি!’
তাহলে যেতে পারেনবৃদ্ধ কাঁধ ঝাঁকালেনআমারও সময় নেই হাতের কাজ ফেলে এসেছিথুক করে ফের একদলা চিবোনো তামাক ফেলে হাঁটা দিলেন তিনি
জনসন তাড়াতাড়ি বললঠিক আছে ঠিক আছে ওই পঞ্চাশই দেবপকেট থেকে তাড়াতাড়ি ওয়ালেট বের করল ও
বৃদ্ধ মুখ ফেরালেন অল্প ঠোঁট চেটে জুলজুল করে তাকিয়ে রইলেন জনসনের ভারি ওয়ালেটের দিকে ব্যাপারটা নজরে পড়তে জনসন তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ওয়ালেট পকেটে চালান করে দিল। হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল দক্ষিণা
থ্যাংকসপ্রায় ছোঁ মেরে সেটা হস্তগত করে বৃদ্ধ চোখের সামনে মেলে খানিক দেখলেন তারপর ভাঁজ করে পকেটে ফেলে বললেনআসুন আমার সঙ্গে
নোংরা ঘাসে ঢাকা পথ দিয়ে বৃদ্ধ এরপর ওকে খামারের পিছনে এক হলঘরে নিয়ে এলেন চাপা আলোর আধো অন্ধকারে ঘরের দেয়ালে সামনে কাচ দেওয়া বড় আকারের সারি সারি কাঠের বাক্স সব মিলিয়ে গোটা বারোর মতো ভিতরে শুকনো ডালপালা আর পাথরের টুকরো ওদের সামনেই এক বাক্সে বড় এক মাকড়শা নিবিষ্ট মনে জাল বুনে চলেছে
এটা এক ধরণের গোল মাকড়শাবৃদ্ধ বললেন
জানি বাগানেই বেশি দেখা যায়বিরক্তি ভরা গলায় জনসন বলল আসল কথা হল সময় নষ্ট করে মাকড়শার জাল বোনা দেখতে ও আসেনি এখানে
আপনি মাকড়শা চেনেন?’
অল্পস্বল্পজনসনের উত্তরসেই ছেলেবেলা থেকে
তাহলে তো ওদের শিকার ধরা দেখেছেন! কীভাবে শিকার ধরে মেরে ফেলে জালের ফাঁদে বন্দি করে আহারের কাজ সারে দারুণ জিনিস! তাই না?’
জনসন হঠাৎ যেন একটু অস্বস্তি বোধ করল লাল হয়ে গেল মুখ বৃদ্ধ একেবারে ওর মনের কথা ধরে ফেলেছেন! বৃদ্ধ অবশ্য সান্ত্বনা দিয়ে বললেনআরে না না লজ্জা পাবার কিছু নেই ছোটবেলায় আমি নিজেও তাই ছিলাম শুধু পিঁপড়ে বা পোকামাকড় কেন? আরও কত কিছু ধরে খাইয়েছি! সব মনেও নেই এখন
আপনি আপনি বুঝি এটা অনেক দিন শুরু করেছেন?’ স্রেফ প্রসঙ্গ পালটাতে জনসন বলল
 তা বলতে পারেন অনেকেই ওদের ভয় পায় আমার কাছে তা নয় বরং অন্য রকম সম্পর্ক  
জনসন ইতিমধ্যে অন্য এক বাক্সের দিকে চোখ ফিরিয়েছে ভিতরে বড় জাতের এক কালো মাকড়শা দুই দাঁড়া দিয়ে সদ্য ধরা শিকারের রস চুষে খিদে মেটাতে ব্যস্ত জনসন নরম গলায় বললদর্শক তেমন হয় না বোধ হয়। হাইওয়ে থেকে বড্ডই দূরে
দরকার নেইবুড়ো প্রায় উড়িয়ে দিল ওর কথাআসলে এটা আমার একটা নেশা বলতে পারেন ব্রীডিংও করাই
বৃদ্ধের ওই শেষ কথায় জনসন কিছু অবাকই হয়ে গেল এমন আগে শোনেনি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেনওটা মূলত কয়েকটা কলেজের জন্য ছেলেদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে লাগে
তাহলে তো ওখানে থেকে ভালই রোজগার!’
তা হয় তবে আমার পছন্দ নয় ভাবছি বন্ধই করে দেব নির্মম কাটাছেঁড়া!’ কথা শেষ করে বৃদ্ধ সশব্দে একদলা চিবোনো তামাক মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে বললেনতাছাড়া নিজেও কিছু কাজ শুরু করেছি ব্যাপার কী জানেন সামান্য মাকড়শা হলেও ওরা গরুঘোড়া থেকে আলাদা কিছু নয় ঠিক মতো ব্রীডিং করাতে পারলে
বৃদ্ধ আরও কিছু বলতেন হয়তো কিন্তু সময় নষ্ট করে মাকড়শা দেখতে এসে এসব কথা ভাল লাগছিল না জনসনের কথার মাঝেই বললস্যার আমার হাতে কিন্তু সময় কম একটু
আরে!’ বৃদ্ধ প্রায় ধড়মড়িয়ে উঠলেনশুধু বাজে গল্প করে যাচ্ছি তাহলে চলুন আগেপ্রাইজ উইনারকে দেখিয়ে আনি আমার সেরা মাকড়শা মনে হয় যা চাইছেন পেয়ে যাবেন
সরু এক অন্ধকার গলি পার হয়ে বৃদ্ধ ফার্মের পিছনে গাছপালার ভিতর দিয়ে একটা ঘরের কাছে নিয়ে এলো ওকে সামনে গাছপালা থাকায় চট করে নজরে পড়ে না দরজায় আনকোরা ল্যাচ সহ তালা
বুঝলেন স্যার সেরা পোষ্যদের জন্য কিছু আলাদা ব্যবস্থা করতে হয়েছে
সেরা পোষ্য!’ ‘জনসন হঠাৎ কিছু হকচকিয়ে গেলকী? ট্যারেন্টুলা?’
নাহ্বৃদ্ধ দরজা খুলে ভিতরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঢুকে পড়লেন।ওসব ভয়ানক বিষাক্ত মাকড়শা কামড়ালেই মৃত্যু রাখি না আমি আপনি চলে আসুন
কিছুটা হতাশ হয়েই জনসন ঘরের ভিতরে পা দিয়েছিল এতগুলো ডলার খরচ করে সামান্য ট্যারেন্টুলাও দেখতে পাবে না! কিন্তু ঘরে ঢুকেই হঠাৎ কেমন থমকে গেল ভিতরে বেজায় অন্ধকার খুটখাট শব্দে খানিক চেষ্টায় বৃদ্ধ একটা আলো জ্বাললেন বটে কিন্তু এত কম পাওয়ার ঘরের অন্ধকার দূর হল সামান্যই যথাসাধ্য চোখ বুলিয়েও ঘরের প্রায় কিছুই দেখতে নজরে পড়ল না তবে পিছনের দেয়ালে সরু একটা প্যাসেজ দেখতে পেল ওদিকে আরও ঘর আছে হয়তো ইতস্তত করে বললঘরে আলো ভয়ানক কম আর আলো নেই?’
আছে তোবৃদ্ধ হাসলেনকিন্তু সুইচ দিতেও জ্বলল না বোধ হয় বাইরে মেইন সুইচে কিছু গোলমাল আপনি দাঁড়ান একটু
 কথা শেষ করে বৃদ্ধ দরজা টেনে বেরিয়ে গেলেন জনসন ভিতরে অপেক্ষা করছিল ঘরের ডিম আলোটাও ওই সময় নিভে গেল ডোর ক্লোজার থাকায় দরজা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ও তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে গেল কিন্তু দরজার ল্যাচ বাইরে থেকে লক হয়ে গেছে অনেক টেনেও খুলতে পারল না ভেবেছিল বৃদ্ধ এখনই হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু অন্ধকারে খানিক অপেক্ষার পরেও যখন বৃদ্ধর সাড়া পাওয়া গেল না জনসন একটু ঘাবড়েই গেল ঘরের ডিম আলো বৃদ্ধ যখন জ্বালছিল সুইচের জায়গাটা লক্ষ করেছিল। অনুমান করে ও সেদিকে হাত বাড়াল অন্ধকারে গোড়ায় তেমন কিছু না পেলেও খানিক চেষ্টার পর হাতে যা আটকাল মুহূর্তে শিরশির করে উঠল শরীর দড়ির মতো শক্ত এক মাকড়শার জাল
মাকড়শার জাল এমন হতে পারে জনসন স্বপ্নেও ভাবেনি কখনও আতঙ্কে হাত টেনে নিয়ে প্রায় ছিটকে উঠল বন্ধ দরজায় আঘাত করে সমানে চিৎকার করলে লাগল ‘দরজা খুলুন দরজা খুলুন শিগগির
কিন্তু বাইরে সামান্য সাড়াও পাওয়া গেল না বৃদ্ধ এখনও ফেরেনি শখ মেটাতে এসে এমন অবস্থায় পড়বে জনসন ভাবতেই পারেনি ভয়ানক ঘাবড়ে গেলেও মাথা অবশ্য কাজ করছিল তখনও হতচ্ছাড়া বুড়োর অপেক্ষায় পড়ে থাকলে চলবে না কিছু একটা উপায় করতেই হবে তারপর বুড়োর ব্যবস্থা। ভাবতে গিয়ে হঠাৎই ওর মনে পড়ল ঘরের পিছন দিকের দেয়ালে সরু প্যাসেজটার কথা ইতিমধ্যে অন্ধকারে চোখও কিছু থিতু হয়ে গেছ খুব সামান্য হলেও দেখা যাচ্ছে ট্যারেন্টুলার মতো বিষাক্ত মাকড়শা যখন নেই বেশি ভয় পাওয়ার মানে হয় না। প্যাসেজের ওদিকে বেরোবার কোনও পথ আছে কিনা দেখে নেওয়া যায়
ঘরের মেঝে একেবারেই পরিষ্কার নয় কাঠ আর পাথরের টুকরোয় ভরতি তারই মধ্যে সন্তর্পণে পা ফেলে একসময় প্যাসেজটা খুঁজে পেল জনসন খানিক এগোতেই আর একটা ঘর প্রথমটার থেকে কিছু ছোটই মনে হল তবে কেমন একটা পুরোনো পচা গন্ধ ও সাবধানে চারপাশে চোখ ঘোরাল অল্প দূরে দেওয়ালের উপর দিকে চিলতে এক আলোর রেখা চোখে পড়তে প্রায় লাফিয়ে উঠল ও দেয়ালের উঁচুতে ছোট একটা বন্ধ জানলা আলোর রেখা তারই ফাঁক গলে আসছে
আবর্জনায় এই ঘরটাও ভরতি বরং কিছু বেশিই সাবধানে পা ফেলে জনসন একটু পরেই সেই বন্ধ জানলার নিচে পৌঁছুল। পাশেই দেয়াল থেকে কিছু একটা ঝুলছেকৌতূহলে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুহূর্তে চমকে উঠল ভেড়ার একটা কাঁচা চামড়া প্রায় শুকিয়ে এসেছে এখন তাহলে এই গন্ধটাই এতক্ষণ নাকে আসছিল! গা গুলিয়ে উঠলেও যথাসাধ্য সামলে নিয়ে জনসন কাঠকুটোর উপর পা রেখে খানিক উঁচু হয়ে বন্ধ জানলার পাটা হাতড়ে ছিটকিনি খুঁজতে লাগল খানিক চেষ্টার পরে বুঝতে পারল জানলার পাটা ছিটকিনি এঁটে বন্ধ নয় পেরেক দিয়ে সাঁটা তবে ভরসার কথা কোনও পেরেকই সম্পূর্ণ বসেনি সম্ভবত বুড়োর শক্তিতে কুলোয়নি চেষ্টা করলে খুলে ফেলা অসম্ভব নয়
কার্যক্ষেত্রে তেমন হল না অবশ্য এসব কাজ একেবারেই অভ্যাস নেই খানিক চেষ্টায় একটা পাট খুলতে পারলেও অন্যটা কিছুতেই খোলা যাচ্ছিল না ভয়ানক শক্ত হয়ে এঁটে রয়েছে কিন্তু হাল ছাড়ার উপায় নেই বাকি পাটটা খুলতে পারলেই ভয়ানক এই ঘর থেকে বেরুতে পারবে প্রাণপণে পাটটা আঁকড়ে ধরে জনসন তখন সমানে বিড়বিড় করছেআয় বাপু উঠে আয় এবার 
কাজের ঘোরে বেচারার তখন অন্য দিকে হুঁশ ছিল না নয়তো পাশের দেওয়ালে মৃদু আওয়াজটা শুনতে পেত আধো অন্ধকার দেওয়ালে মৃদু একটা আওয়াজ টপটপটপটপ কোনও অন্ধ ব্যক্তি যেন পা বাড়াবার আগে পথের উপর লাঠি ঠুকে চলেছে টপটপটপটপ
দুর্ঘটনা তাই ঘটেই গেল জনসন তখন জানলার পাট খুলতে ব্যস্ত আচমকা মাথার পিছনে দারুণ আঘাতে মুখ ভয়ানক ভাবে ঠুকে গেল জানলার নিচে দেওয়ারে উপর বোঁ করে ঘুরে উঠল মাথা। নাক দিয়ে রক্ত গড়াতে শুরু করল। সামলে উঠতে অনেকটা সময় লাগল ওর। তারপর পিছন ফিরে তাকাল কে মারল এভাবে?
জানলার একটা পাট খুলে ফেলায় ঘরের ভিতরের অন্ধকার এখন অনেকটাই হালকা জনসন দেখল অদূরে দেয়ালের কোনে কাঠের বড় এক খোঁয়াড় মতো তারই ভিতরে গুটিসুটি হয়ে কিম্ভুত দর্শন একটা প্রাণী তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওটা যে মাকড়শা সেটা বুঝে উঠতে কিছু সময় লাগল জনসনের তাহলে এটাই বুড়োর প্রাইজ উইনার! এক্সপেরিমেন্টের ফসল! শুধু মাথাটাই আকারে ফুটবলের চাইতে বড় সেই অনুপাতে ধড় এটাই কী পিছন থেকে থাবা মেরেছিল ওকে! তারপর ছুটে ফিরে গেছে আস্তানায়? কী ভয়ানক!
ভয়ে মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠলেও একটু পরে জনসনের মনে হল মিথ্যেই আশঙ্কা করছে সে হাজার হোক মাকড়শার খাদ্য মানুষ নয় নেহাৎই পোকামাকড় তবু সাবধান না হয়ে উপায় নেই  কিছু একটা হাতিয়ার দরকার ভাবতে গিয়ে হঠাৎই পায়ের কাছে জানলার ভাঙা পাটটা নজরে পড়ল সাবধানে হাত বাড়াতে যাবে মাকড়শাটা নড়ে উঠল হঠাৎ অগত্যা থেমে গেল জনসন ভেবেছিল ওর দিকে তাকিয়ে থাকা মাকড়শাটাও হয়তো স্থির হয়ে যাবে কিন্তু তেমন হল না সাবধানে পা ফেলে ধীর গতিতে দেয়াল বেয়ে এগিয়ে আসতে লাগল অদ্ভুত হালকা একটা শব্দ টপটপটপটপ
ধীর গতিতে এগিয়ে আসা সেই প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে জনসনের সারা শরীর হঠাৎ কেঁপে উঠল জীবনে এত ভয় কখনও পায়নি এই প্রথম যেন টের পেল মাকড়শা বাড়ির মানুষগুলোর আসল উদ্দেশ্য
দারুণ আতঙ্কে শরীর প্রায় হিম হয়ে গেছে তখন ওর চোখের সামনেই দেয়াল বেয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে এলো মাকড়শাটা কাছে এসে সামনের একটা পা বাড়িয়ে দিল জনসন হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতেই প্রাণীটা পা টেনে নিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়াল মাথা ঘুরিয়ে সামান্য জরিপ করে নিল। তারপর পা ফেলে এগিয়ে এলো আরও মুখের দুপাশে তীক্ষ্ণ দাঁড়া দুটো নড়ে উঠল হঠাৎ সামনের একটা পা জনসনের কাঁধের উপর বাড়িয়ে দিল তীক্ষ্ণ রোঁয়া জামা ফুঁড়ে চামড়ার গিয়ে বিঁধল
ভয়ে জনসন প্রায় কাঠ হয়ে গিয়েছে তখন তবু সহজাত প্রতিক্রিয়ায় পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করল এক পা যেতেই পিছনের দেয়ালে আটকে গেল জায়গা নেই ততক্ষণে মাকড়শাটা সামনের অন্য একটা পা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে সময় নেই। হঠাৎ যেন সাড় ফিরে এলো জনসনের হাত বাড়িয়ে এই প্রথম সমস্ত শক্তি দিয়ে বাধা দেবার চেষ্টা করল পেরে উঠল না প্রাণীটার পায়ে যেন অসুরের শক্তি অক্লেশে জনসনের অন্য কাঁধের উপর রাখল সেটা প্রাণভয়ে জনসন এই প্রথম চিৎকার করে উঠলবাঁচাও বাঁচাও
ইতিমধ্যে মাকড়শাটা পিছনের পায়ে ভর দিয়ে জনসনকে প্রায় মুখের কাছে টেনে এনেছে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অল্প সময় মুখের দুদিকে তীক্ষ্ণ ছয় ইঞ্চি দাঁড়া দুটো আগে থেকেই নড়ছিল এবার হালকা আলোয় দুই দাঁড়ার ডগায় বিষের ফোঁটা চকচক করে উঠল নিমেষে বিঁধিয়ে দিল জনসনের বুকের মাঝে তীব্র যন্ত্রণায় জনসন আর্তনাদ করে উঠলেও গলা দিয়ে অতি সামান্য মাত্র শব্দ বের হল
মাকড়শাটা ইতিমধ্যে দেয়াল বেয়ে ফের তার আস্তানায় ঢুকে পড়েছে ওদের জীবনকথা জনসনের অজানা নয় অল্প সময়ের মধ্যেই জালে আটকানো পোকার মতো শরীর এবার অসাড় হয়ে আসবে তারপর…! ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠল ও সময় বোধ হয় আছে এখনও যন্ত্রণা যথাসাধ্য উপেক্ষা করে জনসন জানলার পাট আঁকড়ে ধরতে গেল যদি এই মৃত্যুপুরী থেকে বের হওয়া যায় কিন্তু পারল না হাত ততক্ষণে সিসের মতো ভারি হয়ে গেছে অসাড় আঙুল জানলার পাটের কাছে হাত পৌঁছুল না বরং টাল রাখতে না পেরে সশব্দে পড়ে গেল মেঝের উপর চেষ্টা করেও উঠতে পারল না
  শরীর অসাড় হয়ে গেলেও জ্ঞান হারায়নি জনসন দেখতে পেল দেয়ালে আস্তানার ভিতর মাকড়শাটা পা গুটিয়ে স্থির হয়ে রয়েছে তখনও হঠাৎই তার উঁচু পিঠটা কেমন ঝিকমিক করে উঠল কিছু নড়ছে মুহূর্তে নেংটি ইঁদুরের মতো ছোট একটা মাকড়শা মেঝেতে লাফ দিয়ে পড়ল পিছনে আর একটা জনসনের মনে পড়ল কিছু মাকড়শা পিঠে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মা শিকার পেলেই নেমে আসে ওরা
ততক্ষণে পিলপিল করে অজস্র মাকড়শার বাচ্চা সার বেঁধে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে জনসনের চোখের পাতা তখন স্থির চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারল না সারির প্রথম বাচ্চাটা ইতিমধ্যে ওর পায়ের কাছে পৌঁছে সামনের পা গুলো বাড়িয়ে দিয়েছে চিৎকার করতে গিয়েও জনসনের গলা দিয়ে শব্দ বের হল না জ্ঞান হারাবার আগে দেখতে পেল খুদে দানোটা পা থেকে এক টুকরো মাংস কেটে নিয়েছে 
 খামার বাড়ির অন্য এক ঘরে দুটি মানুষ তখন কফির কাপ হাতে গল্পে ব্যস্ত বৃদ্ধা কফিতে বড় একটা চুমুক দিয়ে বললেনজ্যাক কত সময় লাগবে আর?’
বেশিক্ষণ নয়বৃদ্ধের উত্তরজানই তো সেই রবিবারের পর কোনও ব্যবস্থা আর করা যায়নি। তেমন আসেই না কেউ
হাইওয়ের ধারে নতুন একটা সাইনবোর্ড তো লাগাতে পারো বেশ রংচঙে
নাহ্‌!’ বৃদ্ধ ঘাড় ঝাঁকালএই ঠিক আছে বেশি ভিড় মানেই বেশি ঝামেলা
গাড়িটার কথা খেয়াল আছে তোবৃদ্ধার কথায় সামান্য উদ্বেগতাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করতে হবে কিন্তু ডুগলকে আজ রাতেই ফোন করে দাও বরং
ছবি: রঞ্জন দত্ত (সৌজন্য: নবকল্লোল পত্রিকা)
মূল গল্প: The Petting Zoo
আপলোড: ২৯/১১/২০১৮