Thursday, 2 January 2020

ভাললাগা ভৌতিক গল্প(মোবাইল ভাঃ): মেছোভূত (বরেন গঙ্গোপাধ্যায়)


মেছোভূত
বরেন গঙ্গোপাধ্যায়
মাছ ধরা একটা নেশা। এই নেশাতেই পড়ে গিয়েছিলাম একসময়। আয়োজনের ত্রুটি নেই, দামী হুইল আর ছিপ কিনে ফেললাম। কেবল হুইল আর ছিপ থাকলেই তো হয় না, চার আর টোপও দরকার। কত মশলাপাতি কিনে যে টোপ বানাতাম তার হিসেব নেই। খবর পেলেই ছুটে যেতাম কোথায় পিঁপড়ের ডিম পাওয়া যায়, কোথায় মৌচাক কী বোলতার চাক। মাছ ধরার জন্য পুকুরের ধারে বাঁশ পুঁতে মাচাও বানিয়ে নিয়েছিলাম। অথচ কপালের ফের, রুই কাতলা কালেভদ্রে এক আধবার হয়তো তুলতে পেরেছি কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুঁটি ট্যাংরা কই মাগুর। এত আয়োজন করে বড় মাছ যদি না তোলা যায়, মন খারাপ লাগবে বৈকি! প্রায় দিনই কুচোকাচা মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় বেশ মন খারাপ হয়ে যেত।
সেই পুকুরের ধারে মাছ ধরার জন্য আরো কয়েকজন ছিপ নিয়ে এসে বসত সেসময়। দু'একজনের সঙ্গে একটু বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যারা মাছ ধরে তারা ছিপ ফেলে কখনো বকবক করে না। কেবল জলের উপর ফাতনার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ফাতনা একটু নড়ে উঠলেই আর রক্ষে নেই, পৃথিবী যদি রসাতলেও যায় মাছটাকে ডাঙায় না তোলা অবধি মাথার ঠিক থাকে না।
আমি যেখানে বসতাম সেখান থেকে হাত পঁচিশেক দূরে বসত মনোজ। মনোজের কপালটাও ঠিক আমারই মতো, ওকেও খুব বেশি একটা রুই–কাতলা ধরতে দেখতাম না। সেই মনোজ একদিন বিরক্ত হয়ে বলল, এ তো আর পারা যাচ্ছে না ভাই। মাছ ধরার জন্য যা খরচ করছি, তাতে বাজার থেকে কিনে খেলে অনেক লাভ হত।
বিশু, আমাদেরই আর এক মাছ ধরার বন্ধু। কথাটা শুনতে পেয়েই হেসে উঠল, তা যা বললে ভাই। কিন্তু বাজারের মাছ আর ছিপে ধরা মাছের স্বাদ যে আকাশপাতাল তফাত। ও ভাই তুমি যাই বলো, এ পুকুরে বড় মাছ-টাছ আর আছে কিনা সেটাই আমার সন্দেহ। আমাদের বোধহয় এবার থেকে অন্য পুকুরে গিয়ে বসা উচিত।
বললাম, বড় মাছ যে নেই, সেটা কিন্তু ঠিক নয়। সেবার পরাশরবাবু তিন কেজি ওজনের একটা কাতলা ধরেছিলেন মনে আছে? আসলে আমাদের ছিপ ফেলার মধ্যেই কোথাও যেন একটা গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে।
মনোজ গাঁক গাঁক করে উঠল, মাছ ধরা আমাকে শেখাবি নাকি। জীবনে কত মাছ ধরেছি তার হিসেব দিলে তোর মাথা ঘুরে যাবে।
আমি আর কথা বাড়াই না। আবার ফাতনার দিকে চোখ পেতে বসে থাকি। ঘড়িতে বড় জোর চারটে। আর ঘণ্টা খানেক কি ঘণ্টা দেড়েক এখানে বসা যাবে। তারপর মন খারাপ করে বাড়িতে গিয়ে ঢুকতে হবে। ফালতু বকবক করে আর লাভ নেই।
যাই হোক আরও মিনিট দশ পনের বোধ হয় কেটেছিল, হঠাৎ কোত্থেকে মোটাসোটা একটা লোক ছিপ হাতে এগিয়ে এসে পুকুরের একধারে বসে পড়ল।
মনে মনে ভাবলাম, যাক বাবা, হতভাগাদের দলে আরো একজন বাড়ল।
দেখলাম, লোকটার কেমন গম্ভীর গম্ভীর মুখ। কোনো দিকেই নজর নেই। পুকুরের ধারে একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়ল। তারপর বঁড়শিতে টোপ গেঁথে সেই টোপ কপালে তিনবার ছুঁইয়ে পুকুরের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ফাতনার দিকে চোখ পেতে বসে রইল।
থাকো বসে। আমরাও পাত্তা দিলাম না। পাত্তা দেওয়ার কোনো কারণও ছিল না। কেন না, আমরা সারাদিন বসে বসে কি মাছ পেয়েছি তা জানি। বড়জোর চার ইঞ্চি সাইজের দুটো একটা চারাপোনা, দু’দশটা ট্যাংরা কি কই-টই। লোকটা দিনের শেষে এসে কত আর ধরবে!
তবু কেন জানি লোকটার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলাম। পরনে মালকোঁচা মারা ধুতি, গায়ে ফতুয়ার মতো একটা জামা। দেখি, মাঝে মাঝে ফতুয়ার পকেট থেকে কী যেন বার করে মুখে পুরছে।
মনোজের দিকে তাকালাম, কি খাচ্ছে রে?
কে জানে, ছেড়ে দে না। ও সব আলতু-ফালতু লোকের দিকে না তাকিয়ে নিজের ফাতনার দিকে নজর রাখ।
লোকটা বোধহয় ডালমুট কিংবা বাদাম ভাজা-টাজা খাচ্ছে, খুব চালু। আমি আবার আমার ফাতনার দিকে নজর দিলাম।
আরো মিনিট কয়েক কেটে গেল। হঠাৎ চমকে উঠলাম। দেখি, লোকটা মাছ বাঁধিয়েছে টোপে। ছিপে টান মেরে উঠে দাঁড়িয়েছে। সুতো তখনো জলের নিচে। বোধহয় একটা বড় মাছই আটকেছে। ছোট মাছ হলে ছিপের টানে মাছটা উঠে আসত। বড় মাছ বলেই তা সম্ভব হল না। সুতোটা জলের ওপর এখন এপাশ-ওপাশ দৌড়চ্ছে, হুইল থেকে সুতো ছাড়তে শুরু করেছে লোকটা। ছোট ছিপটা ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে উঠেছে।
আশ্চর্য কপাল লোকটার। দশ মিনিট বসতে না বসতেই বড় মাছ বাঁধিয়ে ফেলল। হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। জলের নিচে বঁড়শিতে আটকে যাওয়া মাছটার গায়ে যে বেশ জোর বোঝাই যাচ্ছে। এরকম অবস্থায় মাছটাকে তুলতে হলে বেশ কায়দা জানা দরকার। জলের নিচে খুব করে দৌড়তে দিতে হয় মাছকে। শেষ পর্যন্ত দৌড়াতে দৌড়তে যখন ও ক্লান্ত হয়ে পড়বে তখন ওকে নেটের মধ্যে ফেলে ডাঙায় তুলে আনতে হবে। তা না করে সুতো ধরে বোকার মতো টানলে মাছটা সুতো ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু না, লোকটাও কম যায় না। মিনিট কয়েক লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত মাছটাকে ডাঙায় তুলে ফেলল। আই বাপ এ যে তিন কেজির উপর! কি কপাল মাইরি। এসে মিনিট পাঁচেক বসেই অত বড় একটা মাছ ধরে ফেলল, আর আমরা সারাদিন বসে সামান্য এই কটা ছোট মাছ পেলাম!
মনোজের দিকে তাকালাম। কী কাণ্ড দেখলি? মনোজ আর কী উত্তর দেবে! বোকার মতো হাসে। একেই বলে লাক!
লোকটা ততক্ষণে তার ছিপ গুটিয়ে নিয়েছে। মাছটার মুখের মধ্যে দড়ি ঢুকিয়ে ভাল করে বেঁধে নিলো। তারপর সেই বিরাট মাছটাকে হাতে ঝুলিয়ে গভীর মুখে পুকুর ছেড়ে হনহন করে চলে গেল।
ওদিকে সূর্যটা তখন ডুবুডুবু। আমাদের ওঠার সময় হয়ে এসেছিল। কী রে মনোজ, সন্ধ্যা তো হয়ে এল, চল বাড়ি ফিরি এবার।
দেখলাম, বেশ খানিকটা দূরে পরাশরবাবুও তাঁর ছিপ গুটোতে শুরু করেছেন। সবারই কেমন গম্ভীর মুখ। হুট করে অজানা একটা লোক এসে অত বড় একটা মাছ ধরে নিয়ে গেল, আর ওরা সারাদিন বসেও তেমন কিছু জোটাতে পারল না, মুখ গম্ভীর হওয়ারই কথা।
মনোজ বলল, চল আমাদের কপালে নেই, হবে না। লোকটা কিন্তু জব্বর মাছটা ধরে নিয়ে গেল রে।
কী আর বলব। ছিপ গুটিয়ে ফেললাম। আগামী শনি আর রবি পরপর দু’দিন ছুটি আছে। ঠিক হল শনিবার আবার এসে বসব এখানে। বড় মাছ এবার ধরতেই হবে। এর মধ্যে কলকাতার নিউ মার্কেট থেকে বেশ খানিকটা চার কিনে এনে রাখব। দেখি মাছ সেই চারের গন্ধে এগোয় কিনা।
মনোজ আর আমি কাছাকাছিই থাকি। বাড়িমুখো হাঁটা দিলাম।
যথাবিহিত পরের শনিবার আবার পুকুরের জলে চার-টার ফেলে ছিল নিয়ে বসলাম। হে ভগবান, আজ আর বিমুখ করো না গো, জব্বর একটা মাছ দিও। ছোট ছোট মাছ ধরে কারো কাছে আর মুখ দেখাতে পারি না ভগবান।
মনোজ বলল, আজ যা চার ঢালা হয়েছে তাতে বড় মাছ এদিকে না এসেই পারে না।
বললাম, মাছেরাও আজকাল খুব চালাক হয়ে গেছে রে। ফাতনা থেকে সুতো ঝোলা দেখেই ওরা বুঝতে পারে।
দেখাই যাক কী হয়। দু’জনেতে আবার ফাতনার দিকে চোখ পেতে বসে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। হঠাৎ মনে হল, ফাতনাটা বুঝি একটু নড়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ছিপ হাতে নিয়ে আমি তৈরি হই। বড় মাছ যদি হয়, ফাতনাটাকে এখুনি টুক করে জলের নিচে তলিয়ে নিয়ে যাবে। আর সঙ্গে সঙ্গে টান মেরে বুঝে নিতে হবে কেমন মাছ। যদি বড় মাছ হয়, হুইল থেকে সুতো ছাড়তে হবে। উত্তেজনায় আমি তাকিয়েই থাকি ফাতনার দিকে। কিন্তু না, আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। তবে কি ফাতনাটা জলের ঢেউয়েই নড়েছিল, কেমন মন খারাপ হয়ে যেতে থাকে আবার।
হতাশ হয়ে বসে রইলাম। ওদিকে পরাশরবাবু সটাক করে ছিপ টেনে একটা মাছ তুললেন। ছোট মাপের মৃগেল বোধহয়। তা হোক বউনি হল পরাশরবাবুর।
আমার এমনই কপাল, বউনি হল ঘণ্টা দুয়েক পরে। একটা পাঁচ-ছয়’শো গ্রাম ওজনের শোল। ওদিকে মনোজ ততক্ষণে কয়েকটা শিঙি আর মাগুর মাছ ধরে ফেলেছে। | দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে শুরু করল। আরো দু'একটা করে ছোটখাট মাছ আমরা সবাই ধরে ফেলেছি। কিন্তু আজকের দিনেও বড় মাছের কোন লক্ষণই নেই।
মনোজের দিকে তাকালাম, আজকের দিনটাও বৃথা গেল রে। ফালতু ফালতু পয়সা খরচ করে চার আনালাম।
মনোজ বলল, মাছ ধরা এবার থেকে ছেড়েই দেব ভাবছি। কপালে না থাকলে ওসব হয় না।
কি আর বলি, ঘড়িতে ততক্ষণে সাড়ে চারটে বেজে গেছে। আর বড়জোর ঘন্টা খানেক কি ঘন্টা দেড়েক বসা যাবে। আবার টোপ ফেলে ফাতনার দিকে তাকাই।
হঠাৎ এক সময় চমকে উঠলাম, এই মনোজ, সেই লোকটা রে! সেই যে সেদিন অত বড় মাছটা ধরে নিয়ে গেল।
হ্যাঁ সেই লোকটাই। পরনে মালকোঁচা মারা ধুতি, গায়ে ফতুয়া। চোখ মুখ কেমন গম্ভীর গম্ভীর।
লোকটা কারো দিকে তাকাল না। ধীরে ধীরে পুকুরের ধারে গিয়ে বসে পড়ল। তারপর বঁড়শিতে টোপ গেঁথে পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলল।
দেখে মনে হয়, বেশ বেরসিক। যেন একটু আলাপ-সালাপ করতে গেলে দাঁত খিঁচিয়ে উঠবে। লোকটাকে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করতে থাকি।
ঠিক সেদিনকার মতোই ফতুয়ার পকেট থেকে ডালমুট কিংবা বাদাম ভাজা বার করে টুকটুক করে খেতে শুরু করেছে।
মনোজ বলল, দেখা যাক, আজ বেটা কী মাছ ধরে! বুঝলি বার বার ঘুঘু ধান খেতে পারে না।
কথাটা তখনো শেষ হয়নি মনোজের, লোকটা ছিপ হাতে নিয়ে টান মেরেই উঠে দাঁড়িয়েছে। নির্ঘাৎ বড় মাছ। হুইল ঘোরাতে শুরু করেছে। আশ্চর্য ব্যাপার, লোকটা কি মন্ত্রতন্ত্র জানে নাকি!
মিনিট দশেক মাছটা জলের নিচে ছুটোছুটি করে শেষটায় লোকটার হাতে ধরা দিল। আই বাপ, এ যে বিশাল মাছ। চার সাড়েচার কেজির কম হবে । এ রকম দুটো মাছ হলেই একটা বিয়েবাড়ির কাজ চলে যায়।
কী দারুণ কপাল দেখেছিস? চল না লোকটার সঙ্গে একটু আলাপ করি।
মনোজ বলল, কী আলাপ করবি?
মানে, লোকটা বসতে না বসতেই অত বড় মাছ পেয়ে যাচ্ছে। ওর কাছ থেকে কৌশলটা জেনে নেওয়া যায়।
ঠিক আছে চল। ছিপ গুটিয়ে নিয়ে আমি আর মনোজ লোকটার কাছে এগিয়ে এলাম।
লোকটা সেই আগের দিনের মতোই মাছের মুখে দড়ি ভরে নিয়ে শক্ত করে একটা গিঁঠ দিয়ে হাতে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে কিন্তু আমাদের দিকে তাকাবার প্রয়োজন মনে করে না। গম্ভীর মুখেই হাঁটতে শুরু করে।
মনোজই ডাকল, দাদা শুনছেন?
লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকাল। ব্যস ওইটুকুই। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল।
আচ্ছা বেরসিক তো। ও দাদা, আমাদের সঙ্গে একটু কথা বললে কি দোষ হবে?
লোকটা এবার দাঁড়াল, গম্ভীর মুখ আমার সময় নেই, সন্ধের আগেই আমাকে মাছটা পোঁছে দিতে হবে।
কোথায় পৌঁছে দেবেন?
কেন হে ছোকরা? তোমাদের কি দরকার?
মানে, রাগ করবেন না। আমারও আপনার মতোই এ পুকুরে মাছ ধরতে আসি, কিন্তু আজ পর্যন্ত এত বড় মাছ কোনোদিন ধরতে পারিনি।
লোকটা হি হি করে হাসল কেবল।
মাথায় ছিটটিট নেই তো! মনোজ বলল, আপনার বাড়ি কোথায়? কোথায় থাকেন?
যেখানেই থাকি না, তোমাদের কি?
আমাদের কিছু না। আসলে মাছ ধরার কৌশলটা একটু যদি শিখিয়ে দিতেন।
মাছ ধরবে? ধর না, শেখাবার কি আছে। বঁড়শিতে টোপ গাঁথবে, জলে ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকবে, আবার কি!
তাই তো করি। কিন্তু কেবল ছোট ছোট মাছ ওঠে, বড় মাছ কোনোদিন পেলাম না।
বড় মাছ ধরবে?
আপনি যদি একটু দয়া করে শিখিয়ে দেন।
শিখবে। কিন্তু এখন তো আমার হাতে সময় নেই। সন্ধের মধ্যেই আমাকে মাছ পোঁছে দিয়ে আসতে হবে। ঠিক আছে তোমরা আমার সঙ্গে এস, হাঁটতে হাঁটতে যতটুকু পারি বলে দেই।
উৎসাহে লোকটার সঙ্গে হাঁটা শুরু করি আমি আর মনোজ।
লোকটা বাঁ দিকে ঘুরে জঙ্গলের দিকে এগোতে শুরু করল। এ জলে সাপ শেয়াল কত কিছু থাকতে পারে। আমি মনোজের দিকে তাকাই।
মনোজ চোখের ইশারা করে, চল না। ভয় কি!
লোকটা একবার দুবার আকাশের দিকে তাকায়, সন্ধে হতে আর কত দেরি হে?
মনোজ বলল, আমার ঘড়িতে এখন ছটা।
ছটা মানে, আজ সূর্যাস্ত হওয়ার কথা ছটা বারোতে, তাই না? তার মানে এখনো সন্ধে হতে আরো বারো মিনিট বাকি আছে। একটু তাড়াতাড়ি চল।
বললাম, এই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আপনি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
ফের কথা বলে! বড় মাছ কী করে ধরে যদি জানতে চাও, বকবক করো না। চল।
আমরা আবার চুপ করে লোকটার পিছন পিছন হাঁটতে থাকি। লোকটার হাতে ঝোলানো সেই বিশাল মাছটা। আর এক হাতে ছিল হুইল। দেখাই যাক না, কোথায় নিয়ে যায় আমাদের।
জঙ্গল আরো ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারটাও যেন জড়িয়ে ধরতে থাকে। দুটো একটা জোনাকিও চোখে পড়ে আমাদের।
অন্ধকার গাছগুলোকে ঠিক মতো চেনা যাচ্ছে না, কী গাছ ওগুলো! লোকটাই বলল, গাব গাছ! গাব গাছ চেন?
গাব গাছ সচরাচর চোখে পড়ে না। আমরা লক্ষ্য করি। হঠাৎ মনোজ আমাকে ইশারা করে, ওই দেখ গাছের ডাল থেকে কত মোটা একটা দড়ি ঝুলছে।
হ্যাঁ, এই দড়িটার নিচে গিয়ে আমি এখন দাঁড়াব। আর তা হলেই তোমরা বুঝতে পারবে কি করে আমি বড় মাছ ধরি।
কেমন যেন রহস্যময় লাগে লোকটার কথা। আমি আর মনোজ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি।
লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দড়ি-ঝোলা গাছটার নিচে দাঁড়াল। আর ঠিক এই সময়ই আমাদের নজরে আসে লোকটার দুটো হাতই ফাঁকা। মাছ নেই, ছিপটাও নেই!
মনোজ চেঁচিয়ে উঠল, আপনার মাছ?
লোকটা হি হি করে একটু হাসল, যার মাছ সে নিয়ে গেছে। বললাম না, সন্ধে হলেই যার মাছ তাকে পোঁছে দিতে হবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখ, ছ’টা বারো পার হয়ে গেছে।
কী ব্যাপার বল তো! মনোজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, ছটা বত্রিশ।
তারপর আরো আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। গাছের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠি, লোকটাও নেই দড়িটাও নেই।
সারা গা কাঁটা দিয়ে উঠল আমাদের। মনোজ চিৎকার করে উঠল, ভূত ভূত।
তারপর দু’জনে মিলে দে ছুট। ছুটতে ছুটতে জঙ্গল থেকে যখন বেরুলাম তখন বেশ রাত। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন।
পরদিন ফের মনোজের সঙ্গে দেখা। মনোজ বলল, আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, জঙ্গলের ভিতর ওই গাব গাছে দড়ি ঝুলিয়ে একটা লোক ফাঁসি দিয়ে মরেছিল কয়েক বছর আগে। কাল বড্ড বেঁচে গেছি আমরা।
এর পরও আমরা অনেক দিন ওই পুকুরে মাছ ধরতে গেছি, কিন্তু মেছোভূতটাকে আর কোনদিন চোখে দেখিনি।
আপলোড: ১৩/১/২০২০