Friday, 12 January 2018

গল্প (মোবাইল ভাঃ): তিস্তাচরের ভয়ংকর


গল্প
তিস্তাচরের ভয়ংকর

শিশির বিশ্বাস
ত জায়গায় যে চাকরি করেছি সব মনেও নেই আজ। তবে মাত্র বছর দেড়েকের জন্য হলেও তিস্তা প্রজেক্টের সেই চাকরি ভুলব না কোনও দিন। প্রাণটাই যেতে বসেছিল কিনা।কথা শেষ করে বিনুমামা থামলেন।
সে কী!
কী হয়েছিল?’ সমস্বরে প্রায় হইহই করে উঠলাম আমরা।
আসলে বিনুমামার মুখ খোলা মানেই আমাদের ছোটদের প্রায় রুদ্ধশ্বাস অবস্থা। এমন দারুণ সেসব গল্প। সবাই তাই হাঁ করে থাকি। অথচ তাঁকে কাছে পাওয়া সহজ নয়। ব্যস্ত মানুষ। বছরে এক-আধবার কলকাতায় কাজে এলে সময় থাকলে আসেন কখনও। তেমন এক সুযোগ চলে এসেছিল সেদিন। রাতের খাওয়ার পরে যথারীতি ঘিরে ধরেছি। আর তারপরেই ওই কথা! আসলে বিনুমামা ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে গোছের। নানা অভিজ্ঞতায় ঝুলি ভরতি। আমাদের কথায় ফের মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন পাশের ঘর থেকে মা বললেনদাঁড়া বিনু। আমি আসছি।
সারাদিন কলকাতায় ছুটোছুটির পরে বিনুমামা সাধারণত রাতেই আমাদের বাড়িতে আসেন। এই সময় তাঁকে যাতে বিরক্ত না করি সেজন্য কড়া নজর থাকে মায়ের। কিন্তু মা নিজেও যে বিনুমামার গল্পের বেজায় ভক্ত তা জানতে বাকি নেই কারও। অগত্যা সামান্য থামতেই হল তাঁকে।
কাজ সেরে মা একটু পরে মোড়া নিয়ে বসতেই বিনুমামা শুরু করলেন এ সেই সত্তর দশকের কথা রে। সেই ভয়ানক ঘটনার* পর সেলস রেপ্রিজেন্টেটিভের চাকরিটা সবে ছেড়েছি। তবে বেশিদিন বসে থাকতে হয়নি। অল্প দিনের মধ্যেই অন্য এক চাকরি জুটে গেলকলকাতার বড় এক ঠিকেদারি সংস্থা উত্তরবঙ্গের তিস্তা প্রজেক্টে বড় এক কন্ট্রাক্ট পেয়েছেটানা কয়েক বছরের কাজ। ওসব জায়গা তখনও প্রায় পাণ্ডব বর্জিত স্থান। ম্যালেরিয়ার আখড়া। কেউ যেতে চায় না। চাকরিটা তাই সহজেই হয়ে গিয়েছিল।
সার্ভে করে ইঞ্জিনিয়াররা রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসারে তখন কাজ শুরুর তোড়জোড় চলছে। সময়টা নভেম্বরের গোড়ার দিকে। মানে পুজোর পরেই। এসব কাজ একবার শুরু হলে চলে ঝড়ের গতিতে। যতটা সম্ভব সেরে ফেলতে হবে বর্ষার আগেই। তার মানে আগামী জুনের মধ্যেতারপর বর্ষা নেমে গেলেই তিস্তার অন্য রূপ। চারদিক ডুবিয়ে মাইলের পর মাইল তখন শুধু জল আর জল। কাজও বন্ধ। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা যেটুকু কাজ সারা হল তা যেন সঠিক হয়। তা না হলে নদীর জলের তোড়ে সব বরবাদ হতে পারে। তাহলে ফের নতুন করে শুরু করতে হবে।
তবে তা নিয়ে চিন্তা ইঞ্জিনিয়ার অফিসারদের। আমার দায়িত্ব ছিল ক্যাম্পের দেখভাল। সেই কারণে আসতেও হয়েছিল একেবারে শুরুতেই। যেদিন শিলিগুড়ি থেকে কোম্পানির গাড়ি সাইটে নামিয়ে দিল চারপাশে তাকিয়ে ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। এ কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা! যতদূর চোখ যায় শুধু উলুখাগড়ার বন। আর ছড়ানো ছেটানো কিছু ছোটবড় গাছ। এছাড়া বিস্তীর্ণ বালির উপর দিয়ে এঁকে-বেঁকে বয়ে যাওয়া সরু তিস্তা নদী। দেখে কে বলবে বর্ষায় এই নদী অমন ভয়ানক হয়ে ওঠে!
গোড়ায় কয়েক দিন কিছু অস্বস্তি হলেও তা কেটে যেতে সময় লাগেনি। আসলে কাজের এত চাপ অন্য ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় ছিল না। আগেই বলেছি একেবারে শুরুতেই যেতে হয়েছিল আমাকে। ইঞ্জিনিয়ার অফিসারদের প্রায় কেউই তখনো আসেননি। ক্যাম্পসাইটের জন্য কিছুটা উঁচু যে জমি ঠিক হয়েছিল আমার কাজ ছিল সেটা সাফ করে ক্যাম্প অফিস কর্মচারী আর কুলিমজুরদের থাকার ঘর তৈরি করা। সাইটের পিছনেই নতুন তৈরি উঁচু রাস্তা। প্রতিদিন দশবারোটা ট্রাক সমানে মালপত্র নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সেসব বুঝে নেওয়াই শুধু নয় ইতিমধ্যে জনা পঞ্চাশেক মিস্ত্রিমজুর ক্যাম্পের অফিস আর কর্মচারিদের জন্য ঘর তুলতে শুরু করেছে সেসবের তদারক। সময় কোথা দিয়ে পার হয়ে যায় হুঁশ থাকে না। রাতে ক্লান্ত শরীরে চাট্টি মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লেই এক ঘুমে রাত কাবার।
কুলিমজুরদের বেশিরভাগই নেওয়া হয়েছিল আশপাশের গ্রাম থেকে। আশপাশ মানে সেও খুব কাছে নয়। অনেকটাই দূর। তাদেরই একজন ছিল জগদীশ রাজবংশী। মাঝবয়সি পেটানো শরীর। চটপটে কাজের মানুষ। দিন কয়েকের মধ্যে মালুম পেলাম লোকটার রান্নার হাতও দারুণ। তারপর সেই কাজেই লাগিয়ে দিয়েছিলাম তাকে।
জগদীশ এরপর দুবেলা আমার রান্না আর ফাইফরমাশ খাটত। তিস্তা নদীতে তখন প্রচুর বোরলি মাছ পাওয়া যেত। কতকটা পারশে মাছের মতো দেখতে। আকারে কিছু ছোট হলেও দারুণ স্বাদ। জগদীশকে বলে রেখেছিলাম। ও প্রায়ই গ্রাম থেকে বোরলি মাছ নিয়ে আসত। ক্যাম্পের কাছে নদী থেকেও ধরে আনত কখনো। এছাড়া গ্রাম থেকে টাটকা সবজি। আর ফরমায়েশ হলেই জুটিয়ে আনতো দারুণ স্বাদের দেশি মুরগি নয়তো কচি পাঁঠার মাংস। সুতরাং খাওয়ার ব্যাপারে সমস্যা ছিল না। লোকটা বেশ অনুগতও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সন্ধের আগেই জগদীশ রান্নার কাজ সেরে গ্রামে ফিরে যেত। তাই রাতে পাওয়া যেত না। যখন ভাবছি কিছু মাইনে বাড়িয়ে ওকে ক্যাম্পেই রেখে দেব সেই সময় একদিন ও বলল বাবু জায়গাটা ভাল নয়। রাত্তিরে এখানে থাকিস না।
হেসে বললাম ক্যাম্পে থাকব না তো যাব কোথায়? এখানে আমার কী ঘরবাড়ি আছে?
তা ঠিক! রীতিমতো উদ্বিগ্ন গলা জগদীশের তুই এক কাজ কর না কেন বাবু। রাতে আমার বাড়িতে থাকবি। অসুবিধা হবে জানি। তবু তো মোটে রাতটা।
গোড়ায় ওর কথা সেভাবে তলিয়ে ভাবিনি। কিন্তু এবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু অন্য গন্ধ পেলাম। ভুরু কুঁচকে বললাম কেন রে?
সে বড় ভয়ানক কথা বাবু। শুনলে ডর পাবি।
জগদীশের সেই ভীত মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা অনুমান করতে অসুবিধা হয়নি। তাই আর প্রশ্ন করিনি। এসব দেহাতি জায়গায় ভূতপ্রেত আর নানা অপদেবতার অভাব নেই। অযথা সময় নষ্ট। শুধু বললাম আমার যা চাকরি রাতে ক্যাম্প ছেড়ে যাবার উপায় নেই রে।
শুনে জগদীশ আর জোর করেনি। শুধু বলল তাহলে একটা কথা বলি বাবু। রাতে একটু হুঁশিয়ার থাকিস। হুট করে বাইরে বের হবি না।
সেদিন জগদীশের ওই কথায় পর বুঝতে বাকি থাকেনি রাতে ও কিছুতেই ক্যাম্পে থাকতে রাজি হবে না। তাই সেই কথা আর ব্যক্ত করিনি।
বিদেশ বিভূঁই। গোড়ায় কয়েক দিন রাতে আর ঘর থেকে বের হইনি। কিন্তু অবস্থা পালটাতে দেরি হল না। ক্যাম্প তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হতেই কলকাতা থেকে একে একে ইঞ্জিনিয়ার ওভারসীয়ার আর অভিজ্ঞ মিস্ত্রির দল আসতে শুরু করল। দেখতে দেখতে ভরে উঠল ক্যাম্প। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। মানুষের হট্টগোলে নিঝুম ক্যাম্প জেগে উঠল অল্প দিনের মধ্যেই।
প্রজেক্টের কাজ বাড়ল বটে। তবে আমার কাজ অনেকটাই কমে গেল। ক্যাম্পের কেয়ারটেকার বাবু। কাজ বলতে তখন নানা খুচখাচ সমস্যার মুশকিল আসান। কোনও টিউবওয়েল হয়তো খারাপ হয়েছে জল পড়ছে না। কোনও ওভারসীয়ার বাবুর ঘরের জানলা ঠিক মতো বন্ধ হচ্ছে না রাতে হাওয়া ঢুকছে। মিস্ত্রি লাগিয়ে মেরামতের ব্যবস্থা
বলতে গেলে তেমন কাজই নয় এসব। হাতে তাই অখণ্ড অবসর। ইতিমধ্যে ভাল শীত পড়ে গেছে। কখনো চারপাশে খানিক ঘুরে দেখতে বের হয়ে পড়তাম। শহরের মানুষ। গ্রাম বাংলাতেও থেকেছি। কিন্তু প্রকৃতির এমন রূপ আগে দেখিনি। মাইলের পর মাইল তিস্তা চরের ফাঁকা প্রান্তর। উলুখাগড়ার বন। লম্বা শীষের উপর ঝাঁক বেধে দোল খাওয়া মুনিয়া আর টিয়ার ঝাঁক। কাশফুলের উপর ঢেউ খেলে যাওয়া দামাল বাতাস। দূরে নদীর ওপারে সবুজ পাহাড়। 
অমন নির্জন প্রান্তরের মাঝে গোড়ায় দুএক দিন সামান্য ভয়ভয় করলেও সেটা কেটে যেতে সময় লাগল না। এসব জঙ্গলে চিতাবাঘের উপদ্রব আছে। তবে  মানুষকে এড়িয়ে চলে তারা। আর যেহেতু দেখিনি কখনো তাই পরোয়া ছিল না। আর জগদীশের সেই সতর্কবাণী তো কবেই ভুলে গেছি।
ইতিমধ্যে জানুয়ারি প্রায় শেষ। কলকাতায় এই সময় তেমন শীত না থাকলেও নর্থ বেঙ্গলে ভালই টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাতের দিকে। ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই পেতে এই সময় দারুণ এক উপায় বের করেছিলামগায়ে পুলওভার চাপিয়ে এক এক দিন ঘর থেকে বের হয়ে পড়তাম। স্পোর্টসম্যান। স্কুল কলেজে গণ্ডা কয়েক মেডেল পাওয়া মানুষ। প্রথম কয়েক রাত পিছনের পাকা রাস্তায়। তারপর মেঠো উলুখাগড়া জঙ্গলের পথ ধরে দৌড়তে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই শীত পালাতে পথ পেত না। গ্রামের মানুষ। মাথার উপরে একরাশ তারা ভরা মেঘমুক্ত আকাশ তো আগেও দেখেছি। কিন্তু সেই নিশুতি রাতে তিস্তাচরের আকাশ ছিল একেবারেই অন্য রকম। উপর দিকে তাকালে শুধু তারা আর তারা। আকাশে এত তারা আছে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। তারই মাঝে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত হালকা আলোর এক নদী। আসলে ছায়াপথ। সে এক অপরূপ দৃশ্য। যারা দেখেনি বলে বোঝানো যাবে না।
এই পর্যন্ত বলে বিনুমামা সামান্য থামলেন। গল্পটা কোন দিকে বাঁক নিতে চলেছে তখনও আঁচ করতে পারিনি। উৎকণ্ঠা চেপে রাখতে না পেরে পুপুল বললতারপর কী হল মামা? ওই রাতেই বুঝি?’
একদমবড় একটা দম নিয়ে বিনুমামা বললেনআমি যে এভাবে রাতের বেলাতেও বের হতে শুরু করেছি জগদীশের কাছে সেটা গোপন থাকেনি। একদিন এসে বলল বাবু তুই রেতেও বাহির হইছিস!
সে দুএক দিন রে মাত্র। হেসে উড়িয়ে দিলাম।
জগদীশ কিন্তু আশ্বস্ত হল নামাথা নেড়ে ভয়ার্ত মুখে  বলল না রে বাবু। এক দিনও নয়। তুকে তো বলেছি জায়গাটা ভাল নয়। এমন করিস নাই।
মাথা নেড়ে ওকে আশ্বস্ত করলাম ঠিকই। তবে বের হয়ে পড়েছিলাম সেই রাতেও। সেদিন আবার অমাবস্যা। তবে নির্মল মেঘমুক্ত আকাশে শুধু তারার মেলা। তাই অন্ধকার ঘন হলেও নিশ্ছিদ্র নয়। পথ চলার কাজ দিব্যি চলে যায়। পুলওভার গায়ে সহজেই পৌঁছে গিয়েছিলাম তিস্তার কাছে। সামনে শুধু ধুধু বালির চর। ছড়ানো হরেক আকারের ছোটবড় পাথর। তারই মাঝ দিয়ে তিরতির করে বইছে কাকচক্ষু জল। তার অনেক জায়গায় হয়তো গোড়ালিও ডুববে না এমন ক্ষীণ।
অনেকটা দৌড়ে আসায় শরীর তখন বেশ গরম। সামান্য ঘাম দিতে শুরু করেছে। তাই ঠাণ্ডা বাতাসে কিছু আরামই লাগছিল। তন্ময় হয়ে নদীর বিস্তীর্ণ চরের দিকে তাকিয়ে আছিহঠাৎ ওপারে অনেক দূরে অন্ধকার ফুঁড়ে একটা আলো জ্বলে উঠল। রাতে আগেও বেরিয়েছি। এমন কখনও দেখিনি। প্রথমে মনে হয়েছিল আলেয়ার আলো। কিন্তু আলেয়া সাধারণত মজা বা পোড়ো জলায় দেখা যায়। এই তিস্তাচরে সেই সম্ভাবনা কম।
হাঁ করে তাকিয়ে আছি। অন্ধকার ফুঁড়ে আরও একটা আলো জ্বলে উঠল। তারপরে আরও একটা। পরপর গোটা কয়েক। একটু পরেই বুঝলাম আলোগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি নাহঠাৎ জগদীশের সেই সতর্কবাণীর কথা মনে পড়ল। ফিরে যাব কিনা ভাবছি হঠাৎ পিছনে কিছু দূরে নিস্তব্ধতা ভেদ করে খটখট আওয়াজ। কেউ হেঁটে আসছে। ভূতপ্রেতে তেমন বিশ্বাস নেইতবু মুহূর্তে বুকের ভিতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। শিরশির করে উঠল সারা শরীর। অকারণে নয়। বেশ বুঝতে পারছিলাম যে হেঁটে আসছে সে মানুষ বা কোনও প্রাণী নয়। তাদের হাঁটায় এমন শব্দ হয় না।
চট করে পিছন ফিরে তাকালাম। অবাক কাণ্ড শব্দটা সেই মুহূর্তেই থেমে গেল। চেষ্টা করেও কিছু দেখতে পেলাম না। দূরে অন্ধকারের ভিতর ক্যাম্পের মাঝে মই লাগানো উঁচু খুঁটির মাথায় রাতে যে গ্যাসবাতি জ্বলে কী কারণে সমানে দপদপ করেছে। কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। ভাল করে কান পেতেও কোনও শব্দ আর শুনতে পেলাম না।
মনের ভুল ভেবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসছিল। হঠাৎ খেয়াল হল ওপারে সেই আলোর সংখ্যা ইতিমধ্যে আরও বেড়েছে। শুধু তাই নয় কাছেও এগিয়ে এসেছে। সেই সাথে মৃদু ধপধপ শব্দ। গোড়ায় কিছু কৌতূহলী হয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হঠাৎই মনে হল এভাবে সময় নষ্ট না করে সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পিছন ফিরতে যাচ্ছি ফের সেই খটখট শব্দটা শুরু হল। এবার আর ধীরে নয়। দ্রুত এগিয়ে আসছে আমার দিকে।
কী বলব এমন ভয় জীবনে কখনো পাইনি। যেটুকু সাহস অবশিষ্ট ছিল মুহূর্তে যেন উপে গেল। কেঁপে উঠল ভিতরটা। হঠাৎ মনে হল বিপদ শুধু সামনে নয় পিছনেও। পালিয়ে যাব কোথায়? গোঁয়ার্তুমি করতে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করে ফেলেছিবড্ড দেরি হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে পিছনে সেই খটখট শব্দ আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। বাঁচার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে পিছন ফিরে দৌড় লাগাতে যাব তার আগেই বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডটা আতঙ্কে যেন লাফিয়ে উঠল। আমার পিছনে অন্ধকারে হাত কয়েকের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রায় তালগাছের মতো লম্বা একটা ছায়ামূর্তি।
অ্যাঁ!প্রায় আঁতকে উঠে সবাই তখন বিনুমামার কাছে ঘেঁসে এসেছি। মা বললেনবলিস কী রে বিনু!
হ্যাঁ রে দিদি।বিনুমামা বললেনজীবনে অমন ভয় কমই পেয়েছিগলা দিয়ে একটি কথাও সরেনি তারপর। দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়ে গেছেমাথা ঘুরে পড়েই যেতাম হয়তো। এমন সময় সেই তালগাছের মতো ছায়ামূর্তি সড়াৎ করে ছোট হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখি অন্ধকারে সামনে দাঁড়িয়ে একটা মানুষ। দুহাতে দুটো লম্বা বাঁশের টুকরো। মানুষটা আর কেউ নয় জগদীশ। ভাগ্যিস মাথাটা কিছু ঠিক ছিল তখনও। তাই খটখট আওয়াজের রহস্য বুঝতে সময় লাগল না। বাঁশের রণপা চেপে জগদীশই তখন অন্ধকারে ছুটে আসছিল।
বিনুমামা অল্প থামলেন। তারপর সামান্য দম নিয়ে শুরু করলেন আবাররণপা চিনিস তো? দুটো লম্বা বাঁশের উঁচুতে গাঁটের খাঁজে পা রেখে সেকালে গ্রামের মানুষ মাঠঘাট ভেঙে দ্রুত চলাফেরা করত। নাম ছিল রণপা। মূলত পাইকলেঠেলরা ব্যবহার করলেও দ্রুত চলাফেরার জন্য গ্রামের অনেক সাধারণ মানুষেরও পছন্দ ছিল। যাই হোক আমি কিছু বলার আগেই জগদীশ দুহাতে আমাকে ধরে ফেলে বলল ভয় পাসনি বাবু। আমি ঠিক ধরেছি তুই আজ রাতেও ঘর থেকে বের হয়েছিস। তাই রণপা নিয়ে ছুটে এসেছি। ক্যাম্পের দিকেই গিয়েছিলাম। তা দেখি তুই ঘরে নেই। দরজা খোলা। তাই ফের ছুটে এলাম। এখনো দাঁড়িয়ে আছিস এখানে! বুঝিস নাই কী বিপদ সামনে?
জগদীশের কথায় চমকে উঠে নদীর দিকে ঘাড় ফেরালাম। তবু গোড়ায় বুঝতে পারিনি। কিন্তু একটু পরেই সারা শরীর প্রায় শিউরে উঠল। অন্ধকারে তিস্তা চরের বালি ভেঙে এগিয়ে আসছে এক দঙ্গল সচল পাহাড়। অগুনতি। মুহূর্তে পিছন ফিরে জগদীশের সঙ্গে প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। সত্যি কথা বলতে কী সেই রাতে মানুষটা শুধু আমাকেই নয় বাঁচিয়ে দিয়েছিল গোটা ক্যাম্পটাকেও। নইলে সব তছনছ হয়ে যেত। ভগবান নয় সেদিন জগদীশ রাজবংশী রক্ষা করেছিল আমাদের।
বিনুমামার সেই কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। মা বললেনসচল পাহাড় কী রে? হাতির পাল?’
একদম ঠিক ধরেছিস দিদি। বুনো হাতির পাল। পাহাড়ের ওদিকে জঙ্গল থেকে এই সময় দল বেঁধে নেমে আসে ওরা। সব মিলিয়ে কয়েকশো। ওদের সেই চলার পথের উপরেই তৈরি হয়েছিল আমাদের ক্যাম্প। জগদীশের হুঁশিয়ারি ছিল সেই কারণেই। দুর্ভাগ্য আমিও ভুল বুঝেছিলাম। তাই আর জানতে চাইনি। বলেনি জগদীশও। বুদ্ধিমান মানুষ। বেশ জানত বলে লাভ হবে না। ক্যাম্পের জায়গা বদল করা আমার ক্ষমতার বাইরে। তবে গ্রামে ফিরে গেলেও রাতে হুঁশিয়ার হয়ে থাকত।
কাজটা বিশেষ কঠিনও ছিল না। নদীর ওপারেও দেহাতি গ্রাম। রাতে হাতির পাল নামতে শুরু করলেই তারা খেতের ফসল বাঁচাবার জন্য মশাল হাতে পিছনে ধাওয়া করে। নদীর অন্য পারে তাড়িয়ে দেয়অন্ধকারে একের পর এক যে আলো জ্বলে উঠতে দেখেছিলাম তা সেই মশালের।
সেই রাতে এক ছুটে ক্যাম্পে ফিরেও কিন্তু রেহাই ছিল না। আরও বড় এক কাজ বাকি ছিল তখনও। সবাইকে ডেকে তুলে কাপড়ের টুকরো দেদার কেরোসিন আর পেট্রোল দিয়ে তৈরি হয়েছিল শতখানেক মশাল। তারপর সমানে ক্যানেস্তারা পিটিয়ে হাতির দলকে ঘুরিয়ে দিতে হয়েছিল অন্য পথে। নইলে তাদের পায়ের তলায় গোটা ক্যাম্পটাই হয়তো তছনছ হয়ে যেত। এরপর শুধু সেই রাতেই নয়। হামলা হয়েছে আরও অনেক বার। আসলে ওদের দোষ নেই। স্মরণাতীত কাল থেকে চলার জন্য যে পথ ওরা বংশ পরম্পরায় ব্যবহার করে আসছে তা কী সহজে ছাড়া সম্ভব? হাতি তাড়াবার জন্য এরপর তাই বিশেষ দল তৈরি করতে হয়েছিল। তিস্তাচরের সেই ভয়ংকর রাতের কথা ভাবলে আজও তাই বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে।
*লেখকের গল্প রুম নম্বর ১৩
ছবি: সুদীপ্ত মণ্ডল (সৌজন্য: শুকতারা)
আপলোড: ১৭/৬/২০১৮