Thursday, 13 March 2014

গল্প (মোবাইল ভার্শন): সান্তা ক্লজ

গল্প (মোবাইল ভার্শন)
সান্তা ক্লজ
শিশির বিশ্বাস
শ্রীচরণেষু বাবা,
তোমার পাঠানো বইটা পেয়েছি বাবা। প্রায় এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছি। খুব ভাল বই। তবে সবচেয়ে ভাল দি হোলি ম্যানগল্পটা। তুমি পড়নি? সেদিন ওই গল্পটা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। খুব তর্ক হয়ে গেল। ওরা বলে, সান্তা ক্লজ নাকি নিছকই এক কাল্পনিক চরিত্র। বড়দিনের ছুটিতে ছোটদের খুশিতে ভরিয়ে দেবার জন্য সৃষ্টি। কিন্তু সান্তা ক্লজ তো এই পৃথিবীরই মানুষ, তাই না বাবা? জন্মেছিলেন আনুমানিক খ্রিষ্টীয় তিনশো পঞ্চাশ সালে। লিসিয়ার মাইরা শহরে। মানুষটির আসল নাম সেন্ট নিকোলাস। ওলন্দাজদের ভাষায় সেন্ট নিকোলাস সিন্টা ক্লায়েসহয়ে কবে যে সান্টা ক্লজ বনে গেছে, কেউ জানে না। কিন্তু ওরা কেউ মানতেই চাইল না। তাও তো ওদের আমি আসল কথাই বলিনি।
তোমায় চুপি চুপি বলি বাবা, আমি সান্তা ক্লজকে দেখেছি। এই কোলকাতার পথে। এবার বড়দিনের ঠিক আগের বিকেলে। পার্ক স্ট্রিটে।
বাবা, সেই যেবার তুমি আমায় বড়দিনে নিউ মার্কেটে নিয়ে গিয়েছিলে, এবার বড়দিনের জৌলুসও তার চাইতে কম নয়। গোটা চৌরঙ্গী আর পার্ক স্ট্রিট পাড়ায় খুশির আমেজ। বিকেল হতেই জ্বলে উঠেছে নানা রঙের আলো। চারদিকে রঙিন কাগজের ফুল আর পতাকার মেলা। বড় বড় দোকানে কাচের শোকেস আলো করে রয়েছে ঝলমলে এক্স-মাস ট্রি। রঙিন কাগজ আর তুলোয় মোড়া হাসিখুশি সান্তা ক্লজ বুড়ো। সাথে উপহারের ডালি। পিলপিল করে মানুষ ছুটছে দোকান থেকে দোকানে। হাত ভরতি সওদা। কেনাকাটার বিরাম নেই।
পার্ক স্ট্রিটের এক বড়সড় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বছর পঞ্চাশ বয়সের একটা মানুষ। রোগা বেঁটেখাটো চেহারা। মুখ ভরতি বসন্তের দাগ। কদিনের না-কামানো কাঁচাপাকা খোঁচা দাড়ি। পোশাকটাও বেঢপ। মাথায় সান্তা ক্লজ টুপি। কোঁচকানো ছেঁড়া সার্টের উপর তাপ্পি দেওয়া কোট। গলায় আধছেঁড়া পুরোনো টাই। পরনে ঢোলা প্যান্ট। পায়ে দোমড়ানো বিবর্ণ একজোড়া বুট জুতো। বড়দিনের পার্ক স্ট্রিটে বেজায় বেমানান।
মানুষটার বা বগলে খালি একটা ছোট টিনের কৌটো। হাতে ঝুলছে আধভেঁড়া ঢাউস এক পলিথিনের থলে। কাগজের বাঁশিতে ভরতি। রঙিন কাগজে তৈরি নলের মতো বাঁশিগুলোর একদিকে ফুটো। ফুটোয় মুখ দিয়ে সুর করে গাইলে, ফুটোর পাশে নলের মুখে আটকানো টিসু পেপারের কম্পনে মিষ্টি বশির আওয়াজে গানের সুরটি বেজে ওঠে। লোকটি মুখে একটি বাঁশি নিয়ে হরেক জনপ্রিয় গানের সুর তুলছে, আর ঘুঙুর বাধা ডান হাতে বাঁ বগলের টিনের কৌটোয় সুরের তালে তবলার বোল তুলছে।
এক একটা বাশির দাম দশ পয়সা। ফুটপাতে এক দঙ্গল অর্ধউলঙ্গ শিশুর ভিড় জমেছে মানুষটিকে ঘিরে। কেনার খদ্দের কম। তবু হাতে হাতে বিক্রিও হয়েছে কয়েকটা। চটপট বাজাবার কায়দা শিখে নিয়ে তারাও সুর তুলেছে লোকটির সাথে। দুচোখে খুশি উপচে পড়ছে। যারা কিনতে পারেনি, মজাটা উপভোগ করছে তারাও।
জলসা যখন বেশ জমে উঠেছে, হঠাৎ সামনে দোকানের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন ধোপদুরস্ত সাহেবি পোশাকের এক বাবু। বোধহয় দোকানের মালিক পক্ষের কেউ। ওদের দেখেই চোখ কটমট করে দাড়িয়ে গেলেন। দোকানের ঝকমকে শোকেস তখন প্রায় ঢেকে ফেলেছে ক্লাউনমার্কা সেই মানুষটি আর তাকে ঘিরে ভিড় জমানো এক দঙ্গল অর্ধ উলঙ্গ ছেলেমেয়ে। শোকেসের ঝলমলে সান্তা ক্লজ আর একরাশ দামি উপহারের ডালির কিছুই রাস্তা থেকে দেখার উপায় নেই। দুচোখে এক ঝলক আগুন ছুঁড়ে দিয়ে বাবুটি ধমকে উঠলেন, ‘এ বুড়া আগে বাঢ়ো। আগে বাঢ়ো, জলদি।’
মুহূর্তে থেমে গেল জলসার আসর। মুখ থেকে বাশি নামিয়ে চারপাশে ঘিরে ধরা শিশুগুলির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অদ্ভুত হাসল লোকটা। আড় চোখে একবার দেখে নিল বাবুটিকে। তারপর মাথা নুইয়ে সেলাম জানিয়ে বলল, ‘আগে তো জরুর বাঢ়েগা বাবু। সারে জিন্দগী। পিছুমে কভি নেহি।’
বাঁশিটি ফের মুখে নিয়ে ভিড় ঠেলে চলতে শুরু করল সে। বাঁশিতে তখন সুর উঠেছে:
থোড়া দেখকে চলো মেরে লাল, আগে বাঢ়ো।
সুরে সুর মিলিয়ে ছেলের দলও অনুসরণ করল তাকে। খালি হয়ে গেল শোকেসের সামনে ফুটপাত। ছেলের দল নিয়ে রাস্তার ভিড়ে হারিয়ে গেল লোকটা। শুধু টিনের কৌটোয় তোলা তবলার বোলটাই দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল, টরে-টক্কা। টরে-টক্কা। টরে-টক্কা। ঠিক টেলিগ্রাফের সংবাদের মতো।
শোকেসের ভিতর তখন ঝলমল করছে কাগজ আর তুলোর নকল সান্তা ক্লজ। হাতে উপহারের ডালি।
আমরা ভাল আছি বাবা। প্রণাম নিও। ইতি, সুমন।
ছবি: রাজা (সৌজন্য: সন্দেশ)

প্রথম প্রকাশ: সন্দেশপৌষ ১৩১৬

               December 2014

Wednesday, 12 March 2014

হাসির গল্প (মোবাইল ভাঃ): মাকুমামার ভালুক কাণ্ড


হাসির গল্প (মোবাইল ভার্শন)

মাকুমামার ভালুক কাণ্ড
শিশির বিশ্বাস
গোড়াতেই বলে রাখি এটা কোনও ভালুক শিকারের গল্প নয় বিশেষত মাকুমামার সেই নিদারুণ ব্যাঘ্ৰ কাণ্ডের পর তিনি যে বন্দুক কাঁধে ফের শিকারে বের হবেন এমন ধারণা করাটাই অন্যায় মাকুমামা তো আর পাগল নন সেবার পালামৌ থেকে ফিরে সেই যে মুটে ডেকে তাঁর শিকারের বইপত্তর, মায় সাধের নোট খাতা সের দরে বিদেয় করেছিলেন, তারপর ওসব আর মুখেও আনেননি এমনকী ছেড়ে দিয়েছেন আগের চাকরিও ডালটনগঞ্জের সেই শিবশঙ্কর রায়ের সুপারিশে জয়েন করেছেন নতুন এক অফিসে তবু তাঁর ভালুক কাণ্ডটিও হয়ে গেল আর এবারেও সেই পালামৌ জঙ্গল তবে সেবার মামা একাই ছিলেন মুখ্য চরিত্র এবার জুড়ে নিলেন আমাকেও
সেদিন মাকুমামা এসেই বললেন, ‘চল রে ফুচে, একটা ট্যুর মেরে আসি দারুণ জায়গা পরীক্ষার পরে আমার তখন অখণ্ড অবসর লাফিয়ে উঠে বললাম, কোথায় মামা?’
একগাল হেসে মাকুমামা বললেন, ‘নেতারহাটের নাম শুনেছিস তো? সাহেবরা যার নাম দিয়ে গেছে কুইন অব ছোটনাগপুর দারুণ একটা বাংলো ম্যানেজ করে ফেলেছি সপ্তা দুই বেড়িয়ে আসতে পারলে শরীর ফিরে যাবে
সুতরাং দিন কয়েকের ভিতর জিনিসপত্তর গুছিয়ে আমরা একদিন রাঁচি পৌঁছে নেতারহাটের বাসে চেপে বসলাম পুরো ব্যাপারটা শোনা হল বাসে বসেই মামার শরীরটা ইদানীং ভালো যাচ্ছিল না ডাক্তার চেঞ্জে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কিন্তু সস্তায় তেমন যায়গা কোথায়? শেষে খোঁজখবর নিয়ে শুনলেন, অফিসের বড় সাহেবেরই নাকি নেতারহাটে বাংলো রয়েছে জায়গাটা চেঞ্জের পক্ষেও দারুণ এরপর সাহেবকে ম্যানেজ করে ফেলতে বিশেষ দেরি হয়নি তার উপর খবর পেয়েছি বাংলোর মালি ঝগড়ুর রান্নার হাতও দারুণ! মুরগিও সস্তা সুতরাং দুবেলা খাও আর ঘরে বসে সানরাইজ, সানসেট দেখো
লোহারদাগা থেকেই শুরু হয়ে গেল ছোটনাগপুরের লাল মাটি আর আদিবাসীদের গ্রাম তারপর বাস এক সময় নেতারহাটের পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল পথের দুপাশে জঙ্গল ঘন হয়ে উঠল ক্রমশ বাসে মাকুমামা এতক্ষণ দারুণ মেজাজে বোঝাচ্ছিলেন আমাকে হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে কেমন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন ঠোঁট ইঞ্চি দুয়েক ঝুলে পড়ল ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘এটা কী রকম ব্যাপার হল! এ যে পালামৌ জঙ্গল রে ফুচে! সেই পাহাড়! বন জঙ্গল!’
আমি বললাম, ‘নেতারহাট তো পালামৌ জেলার মধ্যেই মামা
বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে মাকুমামা বললেন, ‘তবে যে সবাই বললে কুইন অব ছোটনাগপুর! ফুচেরে, ভালোয়-ভালোয় এখুনি ফিরে চল বাবা এ বড় ডেঞ্জারাস জায়গানিমেষেরোখকে-রোখকেবলে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে মালপত্র টানাটানি শুরু করে দিলেন তিনি
চোখমুখ দেখে বুঝলাম ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছেন কিন্তু ফিরে যাই বললেই তো হয় না বললাম, ‘খেপেছ মামা! এই জঙ্গলের মধ্যে বাস থেকে নেমে যাবে কোথায়?’
পরিস্থিতিটা এবার খানিকটা যেন বুঝলেন তিনি মালপত্র টানাটানি থামিয়ে কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন, ‘ফুচেরে, তুই জানিসনে, এ কী ভয়ানক জায়গা কী হবে এবার বল দেখি?’
এখন আর ভেবে লাভ নেই মামা এ বাস রাঁচি ফিরবে আগামীকাল সকালে সুতরাং আজ আমাদের সেই বাংলোয় থাকতেই হচ্ছে কাল সকালের আগে আর ফেরবার উপায় নেই
যথাসময়ে নেতারহাট পৌঁছে গেলাম মাকুমামা সত্যিই কাজের মানুষ ব্যবস্থা করাই ছিল বাংলোয় পৌঁছে দেখি সব একদম রেডি সুতরাং মালপত্র নামিয়ে রেখেই ছুটলাম স্নানের ঘরের দিকে
ঝগড়ু সিং-এর হাতের রান্নার সত্যিই জবাব নেই! লোকটা দেখতে অবশ্য জুতের নয় তেমন তাগড়াই শরীর ভরতি কিম্ভুত বড়-বড় লোম আর গায়ের রং? তিন পোঁচ আলকাতরা মাখালেও বুঝি অমন খোলতাই হয় না নিশ্বাসের সময় ঘোঁতঘোঁত শব্দ হয় সমানে দেখে গোড়ায় তো বেশ দমেই গিয়েছিলাম যাই হোক, দেহাতি মুরগির ঠ্যাং দিয়ে প্লেট পাঁচেক করে ভাত মেরে বিকেলে বাংলোর হাতায় চেয়ার টেনে বসলাম জুড়িয়ে গেল চোখ
চারপাশে শুধু শাল-পলাশ আর নানা আগাছার জঙ্গল বুনো ফুলের মেলা প্রাণ জুড়ানো হাওয়ায় ভেসে আসছে দোয়েলের মিঠে শিস সামনে অনেক নীচে মাইলের পর মাইল সমতলভূমি ছড়ানো দেশলাই বাক্সের মতো দেহাতি গ্রাম দূরে কোয়েল নদী বাঁকা এক টুকরো রুপোর পাতের মতো চকচক করছে সেই সাথে মাইলের পর মাইল পাহাড়ের ঢেউ খেলানো রেঞ্জ
হাঁ করে দেখছিলাম পাশে বসে আরামে ঢেঁকুর তুলে পান চিবোচ্ছিলেন মাকুমামা হঠাৎ বললেন, ‘হ্যাঁ রে ফুচে, ঝগড়ুর রান্নাটা কিন্তু দারুণ! দিন কয়েক এমন চালাতে পারলে আর দেখতে হবে না
আমি নেচে উঠে বললাম, ‘যা বলেছ মামা তারপর চারপাশের সিনারিটাও একবার দ্যাখো!’
কিন্তু সে সব বোধ হয় কানেই গেল না ওঁর কতকটা স্বগতোক্তির মতো বললেন, ‘ঝগড়ুর চেহারাটাও একবার দেখেছিস? কেমন কিং কং টাইপের তেমন বেকায়দায় পড়লে ম্যানেজ করে নিতে পারবে তাই না রে?’
বুঝতে বাকি রইল না, ঝগড়ুর এক বেলার মুরগির অ্যাকশনেই কাত হয়ে গিয়েছেন মাকুমামা উৎসাহ দিয়ে বললাম, ‘খুব পারবে তা ছাড়া বাংলোয় একটা বন্দুকও তো রয়েছে দেখলাম হাতের কাছে রাখলে ভাবনা কী?’
আমার কথাগুলো দেখলাম বেশ পছন্দ হয়েছে মাকুমামার এক গাল হেসে বললেন, ‘কালকে ফেরার ব্যাপারটা তাহলে বাতিল করে দিই কি বলিস? তুই বরং ঝগড়ুকে বলে আয় এবেলাও যেন কচি দেখে গোটা দুই মুরগির ব্যবস্থা করে রাখে
দিন কয়েক যে কীভাবে কেটে গেল কী বলব! যাকে বলে বাদশাহি হাল মাকুমামার মতো নিতান্ত নীরস মানুষের পেট থেকেও দেখি রীতিমতো কবিতা বের হতে শুরু করেছে সারা দিন শুধু খাওয়া আর ঘুম এ ছাড়া সকাল সন্ধে বাংলোর হাতায় বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ বলা বাহুল্য, দুজনের কেউই ইতিমধ্যে বাংলোর বাইরে আর পা বাড়াইনি ঝগড়ু রোজই অভয়বাক্য শোনায়, নেতারহাটের জঙ্গলে দু-চারটে বাঘ থাকলেও তারা মোটেও মানুষের ধারের কাছে ঘেঁষে না এখানে ওই ভালুকই যা বিপজ্জনক তবে সেও সেই ফাল্গুন-চৈত্র মাসে মহুয়া ফুলের সময় সুতরাং আমরা নির্ভয়ে সকাল বিকেল চারপাশটা একটু বেড়িয়ে আসতে পারি
মাকুমামা অবশ্য ঝগডুর কথায় একেবারেই কর্ণপাত করেননি আমাকেও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ‘খবরদার ফুচে, নাবালক ছেলে তুই ওসব কথায় কান দিসনি একদম
সত্যি বলতে কী, মামার অবাধ্য হইনি আমিও কিন্তু তবু ঘটল ব্যাপারটা সেদিন দুপুরে ঝগড়ু বাংলোয় নেই রাত্তিরে বুনো মুরগির ঝোলভাত খাবার ইচ্ছে মাকুমামার সেই খোঁজেই বের হয়েছে দুপুরে ভূরিভোজের পর বাংলোর হাতায় বসে চারপাশের দৃশ্য দেখছি মাকুমামার চেয়ারের পাশে যথারীতি বন্দুকটা মজুত আমার সেদিনের পরামর্শটা বেশ মনে ধরেছে ওনার বাইরে এসে বসলেই সর্বক্ষণ পাশে রাখেন দিব্যি ফুরফুরে হাওয়া হাতার বাইরে মস্ত এক মহুয়া গাছ জাঁদরেল আকারের ঝুঁটি ওয়ালা এক বুনো মোরগ অনেকক্ষণ ধরে তার ডগায় বসে কঁক্‌–কঁক্শব্দে সমানে ডেকে চলেছে জুলজুল চোখে সেদিকে তাকিয়ে মেজাজে মামা সবে একটু গুনগুনিয়ে উঠেছেন
আয় রে এবার কাছে আয়, মুরগি ওরে ভাই
ঝগডুবাবার হাতে আয়, মনের সুখে খাই
শুধু মাকুমামা নয় দূরে চকচকে কোয়েল নদীর দিকে তাকিয়ে আমার ভিতরেও কেমন কবি-কবি ভাব বুঁদ হয়ে দেখছি আমাদের ডানদিকে বাংলোর হাতার বাইরে গাছপালার ফাঁকে ঘন ঝোপঝাড়ে ভরা এক টুকরো জঙ্গল ভিতরটা প্রায় অন্ধকার হঠাৎ সেখান থেকে খচমচ আওয়াজ হতেই দারুণ চমকে ঘাড় ফেরালেন মাকুমামা তারপরখেয়ে ফেল্লেবলে মুহূর্তে এক তুড়ুক লাফ
চমৎকার একটা কবিতার আইডিয়া তখন আমার ভিতরেও এসে গেছে মুহূর্তে সেসব কোথায় হাওয়া হয়ে গেল তাকিয়ে দেখি, ভুসো কালোমতো কী একটা প্রাণী ঘোঁৎ-ঘোঁৎ আওয়াজে সেই গাছপালার ফাঁকে এগিয়ে আসছে মাকুমামার ওই ভয়ানক লাফে পিলে-টিলে আগেই চমকে গিয়েছিল গলা দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এল, ‘মামাগো, ভালুক!’
কিন্তু কোথায় মাকুমামা! তাকিয়ে দেখি ততক্ষণে তিনি বাংলোর চৌহদ্দি টপকে সামনে ঢালু জমির ঝোপঝাড় ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন হাতে সেই বন্দুক অগত্যা দেরি না করে আমিও ছুটলাম পিছনে এবড়োখেবড়ো ঢালু জমি নীচে আরও গভীর জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে হোঁচট খেতে-খেতে কোনওমতে তাকে ধরে ফেলে বললাম, ‘মামাগো, এ যে জঙ্গলের দিকে চলেছ!’
এতটা পথ দৌড়ে মামা তখন হাপরের মতো হাঁপাচ্ছেন ছুটতে ছুটতেই খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিসনি ফুচে তোকে তখনই বলেছিলাম, ফিরে যাই এখন বাঁচতে চাস তো শিগগির ঢুকে পড় এখানে
বেশি বলতে হল না সামনেই ঢালু পাহাড়ের গায়ে মস্ত এক গুহার মুখ তিন লাফে মাকুমামাকে টপকে গোড়ায় আমিই ঢুকে পড়লাম ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার পিছনে মাকুমামাও ততক্ষণে ঢুকে পড়েছেন ভিতরে, ‘ফুচে রে, এগিয়ে চল শিগগির
কিন্তু এগোব কী! আলো থেকে আসার জন্য চোখ তখন এমন ধাঁধিয়ে গেছে যে, এক আঙুল দূরের জিনিসও দেখতে পাচ্ছি না প্রায় হাতড়াতে হাতড়াতে সামান্য এগিয়েছি, হঠাৎ ফোঁৎ করে খানিকটা গরম বাতাস গায়ে এসে লাগল সেই সাথে একটা বিশ্রী বুনো গন্ধ এদিকে মাকুমামা সমানে পিছন থেকে খোঁচাচ্ছেন আমি বললাম, ‘মামাগো, বিচ্ছিরি গন্ধ
শুনে প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন উনি, ‘জঙ্গলে গুহার ভিতরে তোর জন্য গোলাপজল ছড়ানো থাকবে নাকি হতভাগা!'
আমাকে ঠেলে ফেলে পাশ কাটিয়ে মামা নিজেই এগিয়ে গেলেন এবার আর সেই মুহূর্তেই, ঘুঁক্‌-ঘুঁর্‌–র্‌–র্
 গাঢ় অন্ধকারের ভিতর এক রাশ মুলোর মতো দাঁত ক্যামেরার ফ্লাসগানের মতো ঝলসে উঠল যেন মাকুমামা ততক্ষণে ভিতরে এগিয়ে গিয়েছেন আরও নিমেষে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ধাক্কায় আমাকে প্রায় ছিটকে ফেলে হুড়মুড় করে ছুটে বের হলেন
ওফ্‌! মাকুমামার ওই নাড়ুগোপাল মার্কা শরীরে এত শক্তি কে জানত! এক ধাক্কায় প্রায় চিৎপটাং কোনোক্রমে উঠে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বাইরে বের হতেই ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে গুহার ভিতর থেকে দাঁত খিঁচিয়ে তাড়া করে এল মস্ত এক ভালুক কী সর্বনাশ! এক ভালুকের তাড়ায় পালিয়ে এসে আর একটার প্রায় কোলে গিয়ে উঠেছিলাম!
ওদিকে মাকুমামা ততক্ষণে বনবাদাড় ফুঁড়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছেন পড়ি কী মরি করে আমিও ছুটলাম পিছনে কিন্তু ঝোপঝাড় ফুঁড়ে ওইভাবে কতক্ষণ আর দৌড়নো যায়? পিছনে ভালুকটা সমানে তাড়া করে আসছে ব্যাপার বুঝে মাকুমামা হঠাৎ সামনে একটা গাছ পেয়ে তড়বড়িয়ে উঠতে শুরু করলেন
ফুচে, তুইও উঠে পড় শিগগির কুইক্
ততক্ষণে মাকুমামা প্রায় মগডালে উঠে পড়েছেন এদিকে প্রায় পোস্টের মতো লম্বা ইউক্যালিপ্টাস গাছ তার মসৃণ গুঁড়ি বেয়ে মাকুমামা কাঠবেড়ালির মতো নিমেষে মগডালে পৌঁছে গেলেও আমার গাছে ওঠা অভ্যাস নেই গুঁড়ির অর্ধেক উঠতেই হেদিয়ে গেলাম হাত-পায়ে খিল ধরে এল ছালটাল উঠে একাকার এমন সময় মাকুমামা উপর থেকে কোঁ-কোঁ করে উঠলেন, ‘ফুচেরে, তাড়াতাড়ি এসে আমায় একটু চেপে ধর বাবা আমার হাত-পা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছেমামার গলা প্রায় মৃগী রোগীর মতো শোনাল
উপরে তাকিয়ে দেখি মাকুমামার হাতে তখনও বন্দুকটা সেই ভাবেই ধরা চেঁচিয়ে বললাম, ‘মামা, গুলি, গুলি চালাও এখুনি
খেপেছিস!’ কোঁকাতে-কোঁকাতে বললেন তিনি, ‘হেভি বোরের বিলিতি জিনিস এসব মাটিতে দাঁড়িয়ে ছুঁড়লেই শরীরের হাড়গোড় সব আলাদা হয়ে যেতে চায়, আর গাছে বসে! বাঁটের এক গুঁতোয় কোথায় ছিটকে ফেলবে ঠিক আছে! হতচ্ছাড়াটাকে সেই থেকে ফেলতেও পারছি না আঙুলগুলো কেমন এঁটে গেছে দ্যাখ!’
আমি হেঁচড়ে-পেঁচড়ে ফের উঠবার চেষ্টা করতে গিয়ে উলটে খানিক পিছলে গিয়ে খাবি খেয়ে বললাম, ‘মামাগো, আমি উঠতে পারছি না
উপর থেকে মাকুমামা হঠাৎ ভেউ-ভেউ করে কেঁদে উঠলেন ওই সময়, ‘ফুচে রে, ওটা যে গাছ বেয়ে উঠতে লেগেছে তাড়াতাড়ি এসে আমায় একটু চেপে ধর বাবা নির্ঘাত আমার সাথে কোলাকুলিটা সেরেই ফেলবে এবার অন্ধকারে তখনই নুলো বের করেছিল আমি পালিয়ে এলুম
এরপর আর শুধু মাকুমামাই নয়, সত্যিকারের হাহাকার আমার গলা দিয়েও বেরিয়ে এল ভালুকটা গাছ বেয়ে উঠছে মানেই মামা নয়, তার আগে বারোটা বাজবে আমারই মুহূর্তে মাথা ভোঁ-ভোঁ করে উঠল বোধ হয় পড়েই যেতাম হঠাৎ দূর থেকে পরিচিত গলায় চিৎকার শুনে ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল, ঝগডু সিং
তাকিয়ে দেখি হাতে মস্ত এক লাঠি নিয়ে প্রায় একটা ভালুকের মতোই ছুটে আসছে সে হাতের লাঠিখানা বন্‌–বন্করে ঘোরাতে-ঘোরাতে বিকট শব্দে চিৎকার করছে, ‘হা-লে-লে-হু-র্‌-র্-হা
চিৎকার তো নয়, যেন গোটা কয়েক জেট ইঞ্জিনের গর্জন! ঝগড়ুর সেই চিৎকারের গুনেই হোক, অথবা লাঠির দৌলতে, হঠাৎ দেখি ভালুকটা গাছ থেকে নেমে পালাচ্ছে সাহস বটে লোকটার! স্রেফ লাঠি হাতেই এবার সে তাড়া করল জানোয়ারটাকে ততক্ষণে গাছপালা ভেঙে ভালুকটা ভোঁ দৌড় আপদটাকে বিদেয় করে একটু বাদেই ফিরে এল ঝগডু হাত বাড়িয়ে প্রায় চ্যাংদোলা করে নামিয়ে আনল আমাকে, ‘বহুৎ বাঁচিয়ে গেছেন বাবু লেকিন আপনেরা হামাকে দেখিয়ে ভাগলেন কেনো? হামি তখুন মোর্গা লিয়ে আসতেছিলম তো!’
আমি কিছু বলার আগেই উপর থেকে মাকুমামার গলা শোনা গেল, ‘অ্যা! জঙ্গলের ভিতর দিয়ে তুই আসছিলি তখন?’
খইনি টেপা দাতে একগাল হাসল ঝগড়ু, ‘জি হাঁ সাহাব বহুত বঁড়িয়া চিজ মিলিয়েছে আজ বিলকুল জংলি মোর্গা নামিয়ে আসেন ঝটপট
কিন্তু গাছ থেকে নেমে আসার কোনও লক্ষণই দেখালেন না মাকুমামা কাঁপা গলায় শুধু বললেন, ‘ঝগড়ুরে, লক্ষ্মী বাপ আমার স্ট্যান্ডে গিয়ে একবার খোঁজ নিয়ে আয় তো বিকেলে রাঁচি ফেরবার কোনও গাড়ি-টাড়ি আছে কিনা
ছবি: দিলীপ দাস
প্রথম প্রকাশ: ‘শুকতারা’ পৌষ ১৩৯০

নিবন্ধ : বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার অ্যান্টন চেখফ

              মূল Misery গল্পটির লিঙ্ক: http://www.eldritchpress.org/ac/jr/045.htm

গল্প (মোবাইল ভার্শান): কষ্ট

পুরো তিনটে দিন পরে আজ টাঙা নিয়ে বের হয়েছিল ছোটকু তারপর কখন চকবাজারে পথের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ঘাড় গুঁজে ঢুলতে শুরু করেছে হুঁশ নেই হঠাৎ কানের কাছে এক যাত্রীর আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে এ ধড়মড়িয়ে উঠে দুচোখের কোলে গড়িয়ে নামা জলের ধারা মুছে নিল গামছায় টাঙার পাশে দাঁড়িয়ে ধোপদুস্ত পোষাকে এক যাত্রী সঙ্গে বড় এক বেডিং চোখ তুলতেই বিরক্তি ভরা গলায় বললকেমনধারা টাঙাওয়ালা হে! সাতসকালে ঘুমোতে লেগেছ!’
গলা ঝেড়ে কাচুমাচু মুখে ছোটকু বললকোথায় যাবেন বাবু?’
স্টেশন টার ট্রেন ধরিয়ে দেওয়া চাই
পথের পাশে বাজার কমিটির ঘড়িঘরের দিকে ঘাড় ফেরাল ছোটকু ঘড়ি খারাপ হয়ে গেছে অনেক দিন তবু টাওয়ারের ছায়া দেখে সময় বেশ বুঝে নিতে পারে কিন্তু আজ শূণ্য দৃষ্টিতে সেদিকে খানিক তাকিয়ে শেষে ঘাড় নামিয়ে বলেকটা বাজে বাবু?’
সোয়া আটটারীতিমত উঠকণ্ঠিত গলায় উত্তর এলঘুম থেকে উঠতেই দেরি হয়ে গেছে এই সকালে এদিকে যে ট্যাক্সি মেলে না কে জানত! একটু টেনে চলিস বাপুউত্তরের অপেক্ষা না করেই সঙ্গের মালপত্র নিয়ে তিনি উঠে বসলেন টাঙায়
স্টেশন কাছে নয় সময় খুবই কম বুড়ো মাদী ঘোড়াটারও বয়স হয়েছে তেমন আর ছুটতে পারে না তবু ভদ্রলোক গাড়িতে উঠে বসতে ছোটকু আর দ্বিরুক্তি করল না ঘোড়ার বলগার দড়ি হাতে তুলে নিল ছোটখাট শীর্ণ মাদি ঘোড়াটাও সেই থেকে দাঁড়িয়ে ধুকছিল ইঙ্গিত পেয়ে অল্প মাথা তুলে নড়ে উঠল তারপর প্রায় কাঠির মতো সরু পায়ে চলতে শুরু করল
আরে আরে!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক কীভাবে চলছে তোর ঘোড়া! কষে চাবকা ট্রেন ধরতে না পারলে সর্বনাশ!
ভাববেন না বাবুছোটকু বলেআসলে গত কয়টা দিন একদম যত্ন হয়নি ঘোড়াটার ঠিকমতো খাবারটাও দেওয়া হয়নি
সেকী রে!’
কী আর করব বলুন বাবু কদিন মনের ভিতর বড্ড কষ্টধরা গলা ছোটকুর
কেন রে?’
তাও আপনি জিগগেস করলেন বাবুদুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ছোটকুরজানেন বাবু গত পরশু আমার একমাত্র জোয়ান ছেলেটা হঠাৎ মরে গেল
সেকী! কী হয়েছিল?’
কী জানি বাবুগাড়ি চালাতে চালাতেই ছোটকু আগ্রহে ভদ্রলোকের দিকে তাকালজ্বর হয়েছিল তো তিনদিন বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল হাসপাতালে তারপর....
আরে আরে মেরে ফেলবি নাকি!’ কথার মাঝেই খেঁকিয়ে উঠলেন ভদ্রলোকআর একটু হলেই গাড়ি যে ফুটপাতে তুলে দিচ্ছিলি আর যেভাবে গপ্প শুরু করেছিস ট্রেন নির্ঘাত ফেল করাবি তোর গদাই লসকর ঘোড়া আর গড়ির দিকে নজর দে তাড়াতাড়ি
ছোটকুরই ভুল খেয়াল না থাকায় গাড়ি কখন ফুটপাত ঘেঁসে এসেছে ফের সোজা হয়ে বসে টাঙা ঠিক পথে আনতে সময় লাগে একটু তারপর অল্প ঘাড় ফিরিয়ে ফের ভদ্রলোকের দিকে তাকাতেই তিনি খরখরে গলায় বলেনবগবগ ছেড়ে এবার ঠিকমতো গাড়ি চালা দেখি মনে রাখিস ট্রেনটা কিন্তু ধরিয়ে দিতে হবে
ঘোড়া জোরেই ছুটছে এখন তবু মানুষটিকে খুশি করার জন্য ছোটকু বার কয়েক চাবুক হাঁকায় তারপর আড় চোখে ঘন ঘন তাকাতে থাকে ভদ্রলোকের দিকে কিন্তু পথ শেষ হয়ে আসতে থাকে সাহস হয়ে ওঠে না গাড়ি আরও জোরে ছোটাবার জন্য সমানে তাগাদা লাগাচ্ছেন তিনি
স্টেশনে পৌঁছোতে আর দেরি করেননি ভদ্রলোক ট্রেনের ঘণ্টা পড়েনি তখনও ভাড়া মিটিয়ে ছুটেছেন কাউন্টারের দিকে মুখ ভরতি ফেনা জীর্ণশীর্ণ ঘোড়াটা হাঁপাচ্ছে তখন
অনেকটা সময় কেটে গেছে তারপর নয়টার ট্রেনই শুধু নয় কখন যে সাড়ে এগারোটার ট্রেনও বেরিয়ে গেছে হুঁশ নেই ছোটকুর যথাস্থানে বসে ঘাড় গুঁজে সেই আগের মতোই ঝিমোচ্ছে শেষ পর্যন্ত নতুন এক যাত্রীই ফের হুঁশ ফেরাল ওর
হেই ময়দান যাবে গো বুড়ো?’
হুঁশ ফিরতে ফের সোজা হয়ে বসে ছোটকু চড়া রোদে ইতিমধ্যে ঝামা হয়ে উঠেছে চারদিক পুড়ে যাচ্ছে শরীর সেই রোদে ঘোড়াটা সমানে পা ঠুকে চলেছে তাড়াতাড়ি চোখ দুটো মুছে নিয়ে বলেময়দানমিটিনমাঠেযাবেন বাবু?’
হ্যাঁ ওই মিটিং ময়দানমাথা নাড়েন ভদ্রলোক তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে লাফিয়ে টাঙায় উঠে বসেন ছোটকুর ইঙ্গিত পেয়ে ঘোড়া চলতে শুরু করে
রোদ চড়া হলেও অল্প হাওয়া আছে ছুটন্ত গাড়িতে বসে কিছু আরাম বোধ হয় অল্প সময় পরে ছোটকু ঘাড় ফেরায় সামান্য রুমাল দিয়ে বাবুটি মুখের ঘাম মুছছিলেন ওকে তাকাতে দেখে বললেনতোর পক্ষীরাজের বাচ্চাকে একটু জোরে ছোটা দেখি যা রোদ তবু একটু হাওয়া মিলবে
আমার ছেলেটাও বাবু ওর নাম দিয়েছিল পক্ষীরাজচোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ছোটকুর
সে তো বটেইমুখ বেঁকিয়ে হাসলেন ভদ্রলোকযেমন তোর ঘোড়া তেমন সুপুত্তুর ছেলে
তা ছিল বাবু বড় ভাল ছিল ছেলেটা
সে তো বুঝতেই পারছি এবার কথা বন্ধ করে গাড়িটা একটু জোরে চালা
ছোটকু অবশ্য থামল না সামান্য উসখুস করে বললজানেন বাবু তিন দিন আগে আমার সেই জোয়ান ছেলেটা হঠাৎ মরে গেছে
হ্যাঁ গো বাবুআগ্রহে ঝুঁকে পড়ল ছোটকুওই একমাত্র ছেলে ছিল আমার এই বুড়ো বয়সে…
তা ঠিক তবে শুধু ছেলের কথা বলছিস কেন? কতবড় একজন মানুষ মারা গেলেন বল!
কে! কে মারা গেলেন বাবু?’
সেকী রে! শুনিসনি! অথচ তোদের কথা দেশের কথা ভেবে সারা জীবন কাজ করে গেছেন ঘরসংসার করার সময়টুকুও মেলেনি তবু তো তোর ঘরসংসার আছে ঘরে ফিরলেই বউ ভাতের থালা ধরে দেবে মানুষটির তেমন ভাগ্যও হয়নি রে
বুক থেকে ফের চাপা নিঃশ্বাস বের হয়ে এল ছোটকুর মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনের অনেক কথা সত্যিই ঘরসংসার ছিল ওর কিন্তু সে–সব কবেই শেষ হয়ে গেছে! বউ মারা গেছে অনেক বছর আগে ছেলে রতনের বয়স তখন মাত্র দুই বছর নতুন করে বাঁচবার জন্য বুকেপিঠে করে মানুষ করেছিল তাকে সাধ ছিল বিয়ে দেবে রতনের সংসারের ভার দিয়ে অবসর নেবে তারপর মাত্র কদিন আগে শেষ হয়ে গেছে সব সাধ‚ আশা সেকথা বলতে গিয়েও কী ভেবে আর এগোল না ঢোঁক গিয়ে বললসে ঠিক কথা বাবু মুখ্যু মানুষ কী বা জানি খুব বড় মানুষ ছিলেন বুঝি?’
ছিলেন রে! মানুষটার মৃত্যুতে কী যে ক্ষতি হয়ে গেল দেশের সেই মানুষটার কথা তোদের বলব বলেই ভোরে বের হয়েছি বিকেলে ময়দানে তাঁর স্মরণসভায় আসিস সব জানতে পারবি
যাব তাহলে ঠিক কথা বাবু মৃত্যু বড় দুঃখের বড় কষ্টের সেই ছেলেবেলায় বাবামা মারা গেল তারপর একটু গুছিয়ে বসতে না বসতেই বউটা সেসব তবু সহ্য করেছি বয়স কম ছিল তো কিন্তু––
ছোটকুর কথার মাঝেই মৃদু ধমকে ওঠেন ভদ্রলোকথাম রে বাপু খানিক বাদে লম্বা লেকচার দিতে হবে একটু গুছিয়ে নিতে দে
ময়দানের মাঠ এসে গেল অল্প পরেই তারস্বরে লাউড স্পীকারে ঘোষণা চলেছ এই রোদেও বেশ ভিড় ভদ্রলোক গাড়ি থেমে নামতেই কয়েকজন ছুটে এল তাদের সঙ্গে চলে গেলেন তিনি খানিক অপেক্ষার পর একজন এসে ভাড়া বাবদ দশ টাকার একটা নোট ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল স্টেশন থেকে ময়দান মাঠ ভাড়া বিশ টাকার কম নয় অন্য দিন হলে হয়তো আপত্তি জানাত কিন্তু রতনের মৃত্যুর পরে মনের ভিতরটা একেবারেই শূণ্য হয়ে গেছে অথচ সেই কষ্টের কথা এই কদিনে বলতেও পারেনি কাউকে একটি মানুষও পায়নি যাকে ভিতরের কষ্টের কথা বলতে পারে রতন কত ভালবাসত ওকে বাবা বলতে অজ্ঞান ছিল ছেলেটা কত আশা ছিল ওকে নিয়ে
এসব বলে ভিতরের কষ্টের বোঝা একটু হালকা করতে চায় ও কিন্তু কেউ শুনতে চায় না প্রতিবেশিরা ওরই মতো গরীবগুর্বো সারাদিন ছুটে বেড়ায় পেটের দায়ে এসব শোনার সময় কারো নেই কদিন চেষ্টা তো কম করেনি
বেলা অনেক হয়েছে মাথার উপর গনগনে সূর্য ফুটিফাটা করে দিচ্ছে সকালে বেরোবার সময় পেটে কিছু দেওয় হয়নি মনেও আসেনি এখন জানান দিচ্ছে ডেরায় ফিরে রান্না চাপাতে হবে ঘোড়াটাকেও জাবনা দিতে হবে আগে রতনই করত এসব দুপুরে ঘরে ফিরলেই ছুটে আসত লেগে পড়ত ঘোড়াটার পরিচর্যায় ততক্ষণ ছোটকুর বিশ্রামের সময় তারপর খেতে বসত দুজন বাপছেলেতে কত গল্প হত এই কদিন আগের কথা কথায় কথায় বলে ফেলেছিল বুড়ো ঘোড়াটাকে বেচে দেবে এবার নতুন একটা ঘোড়া কিনবে শুনে হাঁহাঁ করে উঠেছিল রতননানা বাবা অমন কাজ করো না সেই জন্ম থেকে দেখছি ওকে যতদিন বাঁচে এখানেই থাকবে
কথা শোনো ছেলের!’ রতনের কথায় কপালে ভাঁজ পড়েছিল ছোটকুরদুটো ঘোড়ার খরচ চলবে কেমন করে?’
সে তুমি ভেবনা বাবাঘাড় ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল রতনসকালে ঘরের কাজ সেরে মাঠ থেকে ঘাস নিয়ে আসব কিছু তো সুরাহা হবে
সেই রতনই চলে গেল রয়ে গেল ঘোড়াটা বুক ঠেলে বের হয়ে আসা উদগত কান্না কোনওক্রমে দমন করল ছোটকু মুখ তুলতে নজরে পড়ল অদূরে বাজারের দিকে যাবার মোড়ের কাছে মস্ত বোঝা মাথায় মাঝবয়েসি একজন ছোটকু নতুন যাত্রীর খোঁজে বাজারের দিকেই যাচ্ছিল কাছে আসতে চিনতে পারল ওদেরই পাড়ার হরেন দাস বাড়িতেই ছোট এক দোকান আছে সম্ভবত বাজারে মালপত্র কিনতে এসেছিল ফিরছে এখন গাড়ির গতি কমিয়ে সামান্য ইতস্তত করে ছোটকু বললকেমন আছেন দাদা?’
আরে ছোটকু তুই? কী ভাগ্যি!’ ঘাড় তুলে হরেন দাস বললবাড়ির দিকে যাচ্ছিস বুঝি? একটু তুলে নে না এই বয়সে আর পেরে উঠি না রে পয়সাও নেই যে মুটে নেব
মিথ্যে বলেনি হরেন দাস সংসারের অবস্থা মোটেই ভাল নয় ঘরে অনেকগুলো পুষ্যি বড় ছেলেটা অমানুষ প্রায়ই টাকাপয়সা চুরি করে কিছু বলতে গেলে উলটে বুড়ো বাপকে পেটায় ইচ্ছে ছিল ঘরে ফেরার আগে আর একটা যাত্রীর খোঁজ করবে তবু গাড়ি থামিয়ে বললউঠে আসেন দাদা
ভগবান তোর মঙ্গল করুনগাড়িতে মোট তুলে উঠে পড়ে হরেন দাসবেঁচে থাক
ওই আশীর্বাদ আর করবেন না দাদা যার বেঁচে থাকার কথা সেই যখন চলে গেল জানেন তো সব কয়টা দিন কী কষ্টে যে
বলতে বলতে থেমে গেল ছোটকু কোনও সাড়া নেই ওদিক থেকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল হরেন দাস চোখ বুঁজে ঢুলতে শরু করেছে ইতস্তত করে ছোটকু বললদাদা ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?’
অ্যাঁ!’ ধড়মড়িয়ে উঠল হরেন দাসহ্যাঁ রে বাবা গত রাতে ছেলের তাণ্ডবে দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি সকালে উঠেই বের হয়েছি কেনাকাটা সারতে বাড়ি পৌঁছেই ফের দোকানে বসতে হবে একটু…’ 
কথা শেষ না করেই ফের ঢুলতে শুরু করে হরেন দাস
ছোটকু কথা বাড়ায় না আর একটা আর্ত বোবা কান্না শুধু ওর বুক চিরে বেরিয়ে আসতে থাকে
একসময় ডেরায় ফিরে আসে মানুষটা খড়ভূষি মেখে খেতে দেয় ঘোড়াটাকে শীর্ণ পরিশ্রান্ত ঘোড়াটার গায়েমাথায় হাত বুলিয়ে দেয় রতন এই সময় এভাবেই আদর করত ঘোড়াটাকে বিড়বিড় করে বলেনে মা খেয়ে নে বুড়ো হয়েছি আমি তোকে ভালমতো যত্ন করতে পারিনে যে পারত সে তো ছেড়ে চলে গেল কী করবি মা বল?’
ক্ষুধার্ত ঘোড়াটা মুখ ডুবিয়ে গোগ্রাসে খাচ্ছিল হঠাৎ মুখ তুলে চিবোতে চিবোতে বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে 
প্রায় যেন চমকে ওঠে ছোটকু তবে কি ঘোড়াটা ওর কথা ওর কষ্ট বুঝতে পেরেছে! মুহূর্তে ওর চোখের কোণে দুফোঁটা জল চিকচিক করে ওঠে বলেতোরা মায়ের জাত রে! দয়ামায়া আছে অন্যদের মতো নিষ্ঠুর নোস
তারপর ছোটকু ঘোড়াটার কানের কাছে মুখ নিয়ে বুকের ভিতর কদিনের জমে থাকা কষ্টের কথা তাকে শোনাতে শুরু করে*
*রুশ ছোটগল্পকারঅ্যান্টন চেখফরচিত ‘মিজারি’ গল্পের ছায়া অনুসরণে
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত