Thursday, 22 January 2015

সুন্দরবনের গল্প (মোবাইল ভার্শন): গর্জনের দিন




গল্পটি বর্তমানে ব্লগ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। আগ্রহী পাঠক গল্পটি পাবেন ‘মায়াকানন’ প্রকাশিত (বইমেলা ২০২০) লেখকের ‘জল জঙ্গল নরখাদক সমগ্র (১ম খণ্ড)’ গ্রন্থে। দাম: ২০০ টাকা (ভারত)।


প্রথম প্রকাশ: ‘কিশোর ভারতী’ মার্চ ২০০

Wednesday, 21 January 2015

চেনা মাটি অচেনা মানুষ : সাতসকালে সুতোর খোঁজে




চেনা মাটি অচেনা মানুষ (মোবাইল ভার্শন) : বেলপাহাড়ির পথে

চেনা মাটি অচেনা মানুষের কথা:
বেলপাহাড়ির পথে
শিশির বিশ্বাস
 পাহাড় ঘেরা বেলপাহাড়ি। শুধু মাত্র পুব দিক ছাড়া যেদিকে তাকাও নজর আটকে যাবে দিগন্তের সীমারেখার কাছে ধুসর রঙের পাহাড়ে। পাহাড় আর জঙ্গল। অবশ্য বেলপাহাড়িতে পাহাড় নেই। উঁচু–নিচু ঢিপি আর বনবিভাগের তৈরি হালকা–পাতলা একটু জঙ্গল। লাল মোরামের রুখো মাটির দেশ।
বেলপাহাড়িতে প্রথম গিয়েছিলাম সেই আটের দশকের মাঝামাঝি। ফরেস্ট বাংলো বুক করে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়া। তবু তাল কেটে গেল গোড়াতেই। ঝাড়গ্রাম থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার পথ। অথচ বিকেলের মধ্যে ঝাড়গ্রাম পৌঁছেও এই পথটুকু পাড়ি দিতে লেগে গিয়েছিল সাত ঘণ্টার উপর। অনিয়মিত বাস তখন এই পথে রোজকার ব্যাপার। সন্ধের পরে বাস যদিবা একটা পাওয়া গেল, ঝাড়গ্রামের চৌহদ্দি পেরোতেই হঠাৎ করুণ আর্তনাদে ব্রেকডাউন। কাছেই এক গ্যারেজ থেকে মিস্ত্রি ডেকে শুরু হল মেরামতির কাজ। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে আটটার ঘর ছুঁতে চলেছে, কখন বাস চালু হবে ঠিক নেই। পথের দুই ধারে শুধু ফাঁকা মাঠ। তারই মাঝে দু’একটা বড় আকারের শাল–মহুলের গাছ। সেখানে গা ছমছম করা আরও জমাট অন্ধকার। এছাড়া নিশুতি রাতের অন্ধকারে চারপাশে শুধু ঝিঁঝির কোরাস। অন্ধকারে সেই পথের মাঝে কপালে যখন চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে, নজরে পড়ল এক কোনে বাসের টিমটিমে আলোয় নানা বয়সের কয়েকটি আদিবাসী কচিকাঁচা মুখ। সবচেয়ে ছোটটির বয়স বছর ছয়েকের বেশি নয়। কাঁধে বই–খাতার ব্যাগ। সেই সকালে বাস ধরে ঝাড়গ্রামের স্কুলে পড়তে এসেছে ওরা। এখনও ঘরে ফেরা হয়নি। বোধহয় খাওয়াও জোটেনি তারপর। কিন্তু কারও মুখে ক্ষোভ–অভিযোগ নেই। দিব্যি নিশ্চিন্তে গল্প জুড়েছে। চলছে সেদিনের ক্লাসের পড়া নিয়ে আলোচনা। সত্যি, ওদের সেই মুখগুলো সেদিন কিছুটা হলেও স্বস্তি যুগিয়েছিল। প্রসঙ্গত এর দু’দিন পরে ফেরার পথের কথাও এই ফাঁকে সামান্য না বলে পারা গেল না। দু’দিন পরে রবিবার দুপুরে বাস ধরে ঝাড়গ্রাম ফিরছি। বিনপুর থেকে বছর চৌদ্দ বয়সের একটি ছেলে উঠল। পাশে এসে দাঁড়তে সরে সামান্য জায়গা করে দিয়েছিলাম। তারপরেই আলাপ। জানাল, বিকেলে ঝাড়গ্রামে ডিসট্রিক্ট টুর্নামেন্টের ফুটবল ম্যাচ। তাই দেখতে চলেছে। বিনপুর থেকে ঝাড়গ্রামের দূরত্ব কম নয়। আসবার দিনের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়তে বললাম, ‘খেলা দেখে কখন বাড়ি ফিরবে?’
ছেলেটি অম্লান বদনে বলল, ‘এদিকে বাসের অবস্থা ভাল নয় সার। রাত দশটা–এগারোটাও হয়ে যেতে পারে। তেমন হলে ঝাড়গ্রাম স্টেশনেও রাত কাটাতে হতে পারে।’
সামান্য ডিসট্রিক্ট টুর্নামেন্টের ম্যাচ। তাই দেখতে এমন ঝুঁকি! অবাক হয়ে সেই কথা বলতে ছেলেটি অম্লান বদনে বলল, ‘এসব ম্যাচ না দেখলে কী করে শিখব সার।’
ছেলেটি যে ফুটবল অন্ত প্রাণ, প্রকাশ পেতে দেরি হয়নি তারপর। খুব ইচ্ছে কলকাতার কোনও ফুটবল ক্লাবে খেলার। ওদের এদিকে ফুটবলারের খোঁজে কলকাতা থেকে কখনও স্পটার আসেন। যদি তাঁদের নজরে পড়া যায়, ছেলেটির চোখে সেই স্বপ্ন।
আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি আবার। সেদিন আমরাও বেলপাহাড়ি পৌঁছেছিলাম রাত প্রায় বারোটা নাগাদ। নিশুতি রাতে বাস থেকে নেমে অন্ধকার নির্জন বনপথ ধরে ফরেস্ট বাংলোর দিকে হাঁটার সময় নাকে আসছিল শুধু ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধ। বেলপাহাড়ির বাতাসে ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধই শুধু নয়, অন্য এক গন্ধও পাওয়া যায় কখনও। ব্যাপারটা জানা গিয়েছিল বৃদ্ধ বনমালি সোরেনের কাছে। ‘আর কদিন পরেই চৈত মাসে বাতাসে অন্য এক গন্ধ দিবে বাবু। সিটো মহুয়া ফুলের সময় বটে।’
বেলপাহাড়িতে মহুয়া গাছের অভাব নেই। চৈত্র মাস পড়লেই তাই গ্রামে গ্রামে সাড়া পড়ে যায়। প্রতিটি গাছের তলা ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয়। মহুয়া ফুলের আয়ু মাত্র একটি রাত। সন্ধেয় ফোটা ফুল সকালেই ঝরে যায়। তখন কুড়িয়ে নেবার পালা। মহুয়া ফুলের লোভে কাছে বাঁশপাহাড়ি আর কাঁকড়াঝোরের জঙ্গল থেকে তখন দু’একটা ভালুকও নাকি চলে আসে কখনও। 
মহুয়া, ইউক্যালিপ্টাস ছাড়াও বেলপাহাড়িতে আর রয়েছে সোনাঝুরি। এছাড়া শাল, সেগুন আর পিয়াল। এখানে ওখানে ডাঁই করা কাঠের পাহাড়। ভোর সকালে বাজারে এলেই নজরে পড়বে কাঠ বোঝাই হয়ে সার সার গরুর গাড়ি আসছে পাহাড়ের ওদিকে জঙ্গলের দিকে থেকে। জমা হচ্ছে মহাজনের গুদামে। আর রয়েছে বনমালি সোরেনদের গ্রামগুলো।
বনমালি সোরেনরা কালো মানুষ। অথচ ওদের ঝকঝকে ঘরবাড়িগুলো চোখে পড়ার মতো। নিখুঁতভাবে নিকানো মাটির দেয়াল, উঠোন মায় গোয়ালঘরটি পর্যন্ত। এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বোধ হয় ওদের মজ্জাগত। রবিবার ছুটির দিন। বেলপাহাড়ি আদিবাসী আবাসিক স্কুলের মেয়েদের দেখলাম হাতে ঝাঁটা, ঝুড়ি আর বালতি নিয়ে কাজে নেমে পড়েছে। শুধু স্কুলবাড়িই নয়, পরিষ্কার করে ফেলছে আশপাশের জমা জঞ্জালও। কলকাতা শহরেও হয়তো এমন দৃশ্য দেখা যায় কখনও। নামি কোনও স্কুল বা সংস্থার ছেলেমেয়েরা ঝকঝকে পোষাকে বুকে ব্যাজ আর হাতে পোস্টার, ব্যানার নিয়ে সহর সাফাইয়ে বের হয়। খবর দিয়ে আনা হয় রিপোর্টার আর ক্যামেরা ম্যান। পরের দিন দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয় সেই ছবি। দেখানো হয় টিভির চ্যানেলে। সঙ্গে চটকদার ভাষ্য।
বেলপাহাড়ির গ্রামের পথে হাঁটলেই নজরে পড়বে উঁচু লম্বা গলা আর বেজায় লম্বা পায়ের কিছু অন্য জাতের মুরগি। চরে বেড়াচ্ছে গ্রামের পথে। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলে জানা যাবে লাল মাটির এই অঞ্চলের এক অতি জনপ্রিয় খেলা মোরগের লড়াইয়ের কথা। লম্বা গলা আর পা ওয়ালা এই জাতের মোরগ দারুণ লড়িয়ে। এদের কদর তাই এখানে ঘরে ঘরে। শীত পড়লেই শুরু হয় মোরগের লড়াই। হাটে, বাজারে কিংবা মাঠে–ময়দানে তখন সমানে চলবে এই খেলা। দুটো মোরগের লম্বা পায়ে তীক্ষ্ণ ছুরি বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হবে। চারপাশে হরেক দর্শকের হইহই ভিড়। লড়াইয়ের হাল দেখে ওঠানামা করবে বাজির দর। লড়াই শেষে পরাজিত মোরগটি হবে বিজয়ী মোরগের মালিকের সম্পত্তি। এছাড়া মোট বাজির টাকার কিছু অংশ। এছাড়া বাজিতে যাদের জিত হল তাদের সহর্ষ জয়গান আর সাধুবাদ বাড়তি প্রাপ্য। আর যে মোরগের হার হল, তার মালিক লজ্জায় মুখ লুকোবেন। বাজিতে যাদের হার হয়েছে, তাদের টিটকিরি আর কটু কথা তো আছেই।
ঝাড়গ্রামের অদূরে কুসুমডাঙার মেলা এই মোরগের লড়াইয়ের জন্য বিখ্যাত। মেলার পাঁচদিন সমানে চলে মোরগের লড়াই। দূর থেকে আদিবাসী মানুষেরা তাদের সেরা মোরগ নিয়ে আসে। মোরগের লড়াই এই অঞ্চলে প্রায় জাতীয় উৎসবের মতো।
বেলপাহাড়ির কেন্দ্রবিন্দু সড়কের পাশে ছোট এক বাজার। দু’ধারে মাটির ঘর। তারই মাঝে গোটা কয়েক পাকা বাড়ি। ষ্টেশনারী, মুদি আর কাঁচা আনাজের দোকান। জলখাবারের দোকানে ভোর সকালেই ব্যস্ততা। কাঁচা শালপাতার ঠোঙায় গরম তেলেভাজা আর মুড়ি। সকালের জলযোগ। ভিতরে ঢুকলে তীব্র ঝাঁঝালো আর মিষ্টি অন্য এক গন্ধও নাকে আসবে। মহুয়ার দেশি মদের খদ্দের জুটে গেছে এই ভোর সকালেই। হাতে হাতে কাঁচা শালপাতার ঠোঙায় সেই পানীয়। পেটে কয়েক ঢোঁক চালান দিয়ে শুরু হবে দিনের কাজ। শেষ বিকেলে ঘরে ফেরার পথে ফের আর এক প্রস্থ।
বাজারের পিছনে পুরনো দিনের নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। নীল ভেজাবার জন্য তিন ধাপে ছয় সারিতে আঠারোটা ভাঙাচোরা চৌবাচ্চা সেই পুরনো দিনের সাক্ষ্য বহন করে টিকে আছে এখনও। বৃদ্ধ বনমালি সোরেনের কথায়, ‘ইখানে ত বাবু এক সময় জঙ্গল ছিল। ইয়ার পর সাহেবরা জঙ্গল সাফ করল। ক্ষেতি বানাইল। কুঠি হইল। শুরু হইল নীল চাষ। মোদের কপালটাও পুড়ল।’
সাহেবরা এখন আর নেই। নীলচাষও হয় না। তবে তাতে বনমালি সোরেনদের কপাল ফেরেনি। সাহেবরা বিদায় নিলেও ওদের সেই সবুজ অরণ্য আর ফিরে আসেনি। রয়ে গেছে সেই খেত। লালমাটির রুক্ষ এক ফসলি জমি। ওই বর্ষার সময় সামান্য ধান ছাড়া সেই মাটি বনমালিদের আর কিছু দিতে পারে না। বেলপাহাড়ির চারপাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সবুজের কোনও চিহ্ন আমার নজরে পড়েনি। সবে ফাল্গুন মাস। গোটা কয়েক পুকুরে শেষ তলানি লালচে খানিকটা জল টিকে আছে কোনওমতে। কদিন পরে এটুকুও থাকবে না।
বাজারে আনাজ বলতে শুকনো বাঁধাকপি, বেগুন, চালানি আলু আর মার্বেল সাইজের আধপাকা টম্যাটো। সকালের রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বৃদ্ধ বনমালি সোরেন বাজারের এক কোণে বাঁধাকপি পাতার গোটা কয়েক ছোট আঁটি সাজিয়ে বসে আছে। ঘন সবুজ রঙের বাতিল পাতা। কলকাতার বাজারে ছুঁড়ে ফেলা হয় ডাস্টবিনে।
‘এগুলো বিক্রি হয় এদিকে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করতে আরও অবাক হয়ে বৃদ্ধ মানুষটি বলল, ‘কেনে গো বাবু! খুব মিঠা ত!’

আমার সামনেই গোটা কয়েক আঁটি বিক্রি হয়ে গেল। নাহ্‌, নিজের দেশটার প্রায় কিছুই জেনে উঠতে পারিনি এখনও।

চেনা মাটি অচেনা মানুষ : বীজ


Wednesday, 7 January 2015

ফেসবুক থেকে নিবন্ধ (মোবাইল ভার্শন): খাম্বা বাবা

ফেসবুক থেকে: নিবন্ধ (মোবাইল ভার্শন)
খাম্বাবাবা
শিশির বিশ্বাস
হেলিওডোরস স্তম্ভ
ল্পটা পুরোনো মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলায় ছোট এক জনপদ বেশনগর বিশেষজ্ঞদের অনুমান এখানেই ছিল সুপ্রাচীন বিদিশা নগরী স্থানটি বিশ্ববিখ্যাত সাঁচি স্তূপ থেকে মাত্রই পাঁচ মাইল দূরে পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বেশ নদী অদূরেই এক আশ্রম কয়েকজন সাধুর বাস আশ্রমের চত্বরে গাড় সিঁদুর লেপা একটি একশিলা স্তম্ভ লম্বায় সাড়ে ছয় মিটারের মতো স্থানীয় মানুষের কাছে স্তম্ভটি অতি জাগ্রত দেবতা খাম্বা বাবা প্রতিদিন পুজো হয় আর জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় খাম্বা বাবার উৎসবের মাসে পূণ্যার্থী আসে দূরদূরান্ত থেকে সৌভাগ্য এবং পুত্র লাভের আশায় বলি পড়ে স্তম্ভের গায়ে তেলসিঁদুর চড়ানো হয় বিশ্বাস খাম্বা অর্থাৎ স্তম্ভ রূপধারী বাবা স্বয়ং মহাদেব তাঁর কৃপায় কোনও আশাই অপূর্ণ থাকে না
প্রবাদ বহুকাল আগে হীরাপুরী নামে এক সাধু এখানে বাস করতেন হঠাৎই একদিন তাঁর আশ্রমে অতিথি হয়ে এলেন জটাজুটধারী এক যোগীপুরুষ হীরাপুরী সেই যোগীপুরুষকে দেখেই চিনতে পারলেন। আগন্তুক আর কেউ নয় স্বয়ং মহাদেব তিনি সেই যোগীপুরুষকে তাঁর আশ্রমেই অবস্থান করতে অনুরোধ করলেন হীরাপুরীর সেবায় যোগীপুরুষ তুষ্ট হয়েছিলেন তিনি তাঁকে নিরাশ করলেন না খাম্বার রূপ ধরে আশ্রম প্রাঙ্গণে রয়ে গেলেন খাম্বা বাবার মাহাত্ম্য চারপাশে ছড়িয়ে পড়েতে এরপর আর দেরি হয়নি
চলছিল এই ভাবেই ১৮৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে স্তম্ভটি নজরে আসে আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম সাহেবের কোম্পানির শাসন অবসানের পরে তিনি তখন এদেশে আর্কিওলজিক্যাল দপ্তরের ডিরেক্টর জেনারেল হয়ে এসেছেন উৎসাহী মানুষটি প্রাচীন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের খোঁজে চষে ফেলছেন সারা দেশ আশ্রমের চত্বরে যখন তিনি স্তম্ভটি দেখেন সর্বত্র তেলসিঁদুরের গাঢ় প্রলেপ অনেক কিছুই ঢাকা পড়ে গেছে তবু জহুরির চোখে জহরত চিনতে ভুল হয়নি স্তম্ভটি দেখার পরে তিনি তাঁর রিপোর্টে লিখছেন 'perhaps the most curious and novel discoveries that I have ever made'একশিলা স্তম্ভটির গঠনশৈলী পর্যালোচনা করে তিনি এটিকে গুপ্তযুগের বলে সনাক্ত করেছিলেন সুপ্রাচীন স্তম্ভের গায়ে কিছু লিপি থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে কিন্তু তেলসিঁদুরের পুরু আস্তরণ থাকায় ক্যানিংহাম সাহেব তেমন কিছু খুঁজে পাননি আশ্রমের অনুমতি না মেলায় রং তুলে ফেলাও সম্ভব হয়নি
হেলিওডোরাস স্তম্ভের নিম্নভাগে ব্রাহ্মী লিপি
অগত্যা অপেক্ষা করতে হল আরও তিরিশটি বছর ১৯০৯ সালে গোয়ালিয়র রাজ্যের সুপারিন্টেডিং ইঞ্জিনিয়ার মি. লেকের নির্দেশে স্তম্ভের গোড়ার দিকে কিছু অংশের সিঁদুর তুলে ফেলা হতে প্রথম লিপির সন্ধান পাওয়া গেল কিন্তু সবটা নয় লিপির অনেকটাই তখনো ইটপাথরে গাঁথা স্তম্ভের বেদীর তলায় রয়ে গেছে এর বেশি তখন আর এগোনো সম্ভব হয়নি বলা যায় প্রকৃত অনুসন্ধান শুরু হয় এর পাঁচ বছর পরে প্রত্নতাত্ত্বিক ড. ভাণ্ডারকারের তত্ত্বাবধানে পুরো দশ দিন লেগেছিল স্তম্ভের রং  পরিষ্কার করতে পুরোনো ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে ফেলে নতুন করে বসান হল স্তম্ভটিকে খ্রিপূ সময়ের ব্রাহ্মী হরফে লিখিত লিপিগুলি উদ্ধার হতে জানা গেল গুপ্তযুগ নয় স্তম্ভটি আরও কয়েকশো বছরের পুরোনো খ্রিপূ ১ম শতকের শুঙ্গ বংশীয় রাজা কাশীপুত্র ভগভদ্রর বিদিশার রাজসভায় তক্ষশীলার ইন্দো-গ্রীক রাজা অ্যান্টিয়ালকিডাসের দূত ছিলেন হেলিওডোরস গ্রীক রাজদূত হেলিওডোরস বিদিশায় বাসুদেব মন্দির প্রাঙ্গণে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে এক গড়ুর স্তম্ভ স্থাপনা করেছিলেন খাম্বা বাবা সেই স্তম্ভ স্তম্ভলিপিতে হেলিওডোরস তাঁর আরাধ্য বাসুদেবকে দেবাদিদেব বলে স্তুতি করেছেন
কৌতূহলী পাঠকের জন্য প্রথম সাতটি লাইন বিবৃত করা যেতে পারে:
১) দেবদেবস বাসুদেবস গরুড়ধ্বজ অয়ং।
২) কারিতে ইয় হেলিওদোরেণ ভাগ।
৩) বতেন দিয়স পুত্রেণ তখসিলাকেন।
৪) যোন দূতেন আগতেন মহারাজাস।
৫) অন্তলিকিতস উপতা সকারু রজো।
৬) কাসী পুত্র ভাগভদ্রস ত্রাতারস।
৭) বসেন চতু দশেন রাজেন বধমানস।
অর্থাৎ দেবাদিদেব বাসুদেবের এই গড়ুরধ্বজা তক্ষশিলা নিবাসী ডিয়ন পুত্র ভাগবত অনুরাগী হেলিওডোরাস কর্তৃক স্থাপিত যিনি গ্রিক রাজা অ্যান্টিয়ালকিডাসের রাজদূত রূপে কাশীপুত্র ভগভদ্রের রাজত্বকালের চর্তুদশ বছরে তাঁর বিদিশার রাজ দরবারে আগমন করেন
মূল রহস্যের সমাধান হলেও প্রশ্ন রয়ে গেল বাসুদেবের সেই মন্দির নিয়ে কোথায় গেল সেটি? তবে কী স্তম্ভটি অন্য কোনও স্থান থেকে আনা হয়েছিল স্থানটি পর্যবেক্ষণের পরে অনুমান করা গিয়েছিল বর্তমান আশ্রমটি হয়তো সেই মন্দিরের স্থানেই নির্মিত ১৯৬৩৬৫ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক এম.ডি খারে সেই আশ্রম-বাড়িটি ভেঙে সরিয়ে দিয়ে খনন কাজ শুরু করতেই বের হয়ে পড়ল খ্রিপূ ৩য় শতকে নির্মিত উপবৃত্তাকার বিশাল এক মন্দিরের ভিত এযাবত কাল জ্ঞাত এইটিই ভগবান বাসুদেবের প্রাচীনতম মন্দির         
                                       

তক্ষশীলার গ্রিক রাজা অ্যান্টিয়ালকিডাসের রৌপ্যমুদ্রা

মন্দিরের গর্ভগৃহের ক্ষেত্রফল ছিল ৮.১৩ বর্গ মিটার প্রদক্ষিণ পথ আড়াই মিটার চওড়া এছাড়া বড় আকারের সভামণ্ডপ তথা দর্শন গৃহ  পাওয়া গেছে সভামণ্ডপের এক কাঠের দরজার অস্তিত্ব শুধু বর্তমান স্তম্ভটি নয় মন্দিরের পুব দিকে উত্তরদক্ষিণ বরাবর আরও সাতটি স্তম্ভ ছিল হেলিওডোরাস স্তম্ভটি অষ্টম বিভিন্ন সময়ে ভক্তবৃন্দ মঙ্গল কামনায় এগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু বর্তমান স্তম্ভটি ছাড়া আর কোনটিরই সন্ধান মেলেনি
অনুমান করা যায় বাসুদেবের মন্দিরের প্রাঙ্গণে হেলিওডোরসের স্তম্ভ সহ যে আটটি স্তম্ভ ছিল কালের প্রভাব এবং পরবর্তীকালে কালাপাহাড়ি তাণ্ডবে মন্দিরের সঙ্গে সেগুলিও ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল বর্তমান হেলিওডোরস স্তম্ভটিও অর্ধ ভগ্ন স্তম্ভ শীর্ষের গড়ুর মূর্তিটি বিনষ্ট হয়ে গেছে সন্দেহ নেই ভগ্ন মন্দির প্রাঙ্গনে ভগ্ন অর্ধভগ্ন স্তম্ভগুলি হেলায় পড়ে ছিল পাথরগুলি যে যার মতো তুলে নিয়ে কাজে লাগিয়েছে এইভাবেই এই সেদিন ১৭৯৪ সালে কাশীর রাজা চৈত সিংয়ের দেওয়ান জগত সিং সম্রাট অশোক নির্মিত সারনাথের বিখ্যাত ধর্মরাজিকা স্তূপ থেকে ইটপাথর নিয়ে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন বিখ্যাত স্তূপটি ওই সময় পর্যন্ত মোটামুটি ভাল অবস্থাতেই ছিল আজ এই স্তূপের ভিত্তিটুকু ছাড়া আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই
যাই হোক সম্ভবত ওই সময় আশ্রমের সাধু হীরাপুরী অনাদরে পড়ে থাকা একটি স্তম্ভকে শিবজ্ঞানে ফের স্থাপনা করে পূজা শুরু করায় রক্ষা পেয়ে গেছে হেলিওডোরাস স্তম্ভটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের অন্তত একটি ছেঁড়া পাতা উদ্ধার করা গেছে অঞ্চলটিতে ব্যাপক অনুসন্ধান হলে ভগ্ন দুএকটি স্তম্ভও হয়তো খুঁজে পাওয়া সম্ভব কিন্তু তা আর হয়নি এ দেশের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের আরও কয়েকটি পাতা চাপা পড়ে রয়েছে ওই অঞ্চলের মাটির তলায় হয়তো কোনও দিন উদ্ধার করা যাবে
স্থানটির কিছু পূর্ব দিকে খ্রিপূ ৩য় শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে স্তূপটি সাঁচি স্তূপের পূর্ববর্তী
প্রসঙ্গত আর একটি কথা বলতেই হয় হেলিওডোরসের এই গড়ুর স্তম্ভটির কল্যাণে বাংলা সাহিত্যে সংযোজিত হয়েছে একটি অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক গল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই স্তম্ভটিকে নিয়েই লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত স্বপ্ন-বাসুদেবগল্পটি বিষয়টি তাঁকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত গল্পটি তিনি বার কয়েক ফিরে লিখেছিলেন প্রায় দুই হাজার বছর আগে সেদিনের বিদিশা নগরী তথা আজকের বেশনগরের এক চমৎকার ছবি আঁকা আছে এই গল্পে

আলোকচিত্র: বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সৌজন্যে।
১৬/১২/২০১৫