Monday, 5 January 2015

গল্প (মোবাইল ভাঃ): লিকলিকে সেই পা দুটো


লিকলিকে সেই পা দুটো
শিশির বিশ্বাস
গল্পটা বিনুমামার দারুণ মানুষ ছিলেন আমরা ছোটরা হাঁ করে থাকতাম, কবে উনি আসবেন কিন্তু সে ভাগ্য হত কালেভদ্রে আসলে বিনুমামার কর্মক্ষেত্র ছিল অনেক দূরে নেফা অর্থাৎ আজকের অরুণাচল রাজ্যে তাই দৈবাৎ কোনও দরকারে কলকাতায় এলে তবেই তাঁর দেখা মিলত মায়ের কাছে শুনেছি, আর পাঁচজন বাঙালির মতো দশটাপাঁচটার চাকরি পোষায়নি তাঁর কাজের ধন্দায় ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা ভারত জুড়ে কোনও কাজে কখনো আপত্তি হয়নি
 সেই টানেই চলে গিয়েছিলেন নেফা সার্ভিসে পোস্টিং পাশিঘাটে নেফা মানে আজকের অরুণাচল প্রদেশের নামে তখন আঁতকে উঠত অনেকেই আসামের সমতলভূমি ছাড়ালেই মাইলের পর মাইল শুধু পাহাড় আর হিংস্র শ্বাপদে ভরা ঘন অরণ্য তেমন রাস্তাঘাট নেই সামান্য বৃষ্টি হলেই জেঁকের উপদ্রব মশা আর রক্তখেকো খুদে ডামডিম পোকা আর পাশিঘাট তো নামেই শহর দিনের বেলাতেও কখনও ভালুক নয়তো চিতাবাঘ ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত রাতে ঘরের বাইরে হামেশাই হরিণের আনাগোনা যাই হোক, পাশিঘাটেও তিনি বেশি দিন থাকেননি ১৯৬২র চিন যুদ্ধে তাওয়াং, দিরাং, বমডিলা সব তছনছ টনক নড়তে শুরু হল সারা নেফা জুড়ে রাস্তাঘাট তৈরির তোড়জোড় বিনুমামা চলে এলেন সেই দপ্তরে
তবু পাশিঘাট ছিল শহর এবারের কর্মক্ষেত্র একেবারে জঙ্গলের ভিতর গায়ে কাঁটা দেওয়া ওই সময়ের কত গল্প যে শুনেছি তার কাছে! আর জমিয়ে গল্প বলতে বিনুমামার জুড়ি ছিল না একেবারে মাত করে দিতে পারতেন বিনুমামার এই গল্পটা অবশ্য নেফার নয় কিন্তু মনে আছে এখনও
সেবার দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে বিনুমামা বাড়ি এসেছিলেন ফেরার পথে কলকাতায় আমাদের বাড়িতে এক দিন ঘুরে যাবেন বিনুমামা আসছেন, খবর পেয়ে আমরা সবাই হাঁ করে অপেক্ষা করছি কিন্তু দুর্ভাগ্য কলকাতায় কিছু কাজ সেরে যখন তিনি আমাদের বাড়িতে এলেন, রাত প্রায় ন'টা মা পইপই করে বারণ করে দিয়েছিলেন, ওঁকে বিরক্ত না করতে সারাদিন ঘুরতে হয়েছে নানা কাজে আগামী কালও সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হবে তাই ভোরেই বের হয়ে যাবেন কিন্তু তাই বলে এক রাতের জন্য বাড়িতে পেয়ে বিনুমামার গল্প মিস করা যায় না রাতের খাওয়া শেষ হতেই আমরা ঘিরে ধরেছি ওঁকে টুলটুলি বলল, ‘মামা, এবার জঙ্গল নয়, একটা ভূতের গল্প শোনাও
মা ধমকে উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বিনুমামাই তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুই থাম তো দিদি টুলি সামান্য এক ভূতের গল্প শুনতে চাইছে, বাগড়া দিচ্ছিস কেন?’
মা আর কিছু বললেন না আসলে তিনিও তখন মোড়া টেনে অদূরে বসে পড়েছেন আমি বললাম, ‘তাহলে আজ ভূতের গল্পই হোক মামা
বিনুমামা বললেন, ‘সেবার বেজায় এক ভূতের খপ্পরে পড়েছিলাম রে শোন সেই গল্প
টুলটুলি বলল, ‘নেফার জঙ্গলে বুঝি?’
না রে নেফার জঙ্গলে নয় সেগল্প পরে একদিন হবে এটা একেবারেই এদিকের সেবার দাদুদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম ঘটেছিল তখনই
সে কী রে! দাদুর ওখানে গিয়ে তুই ভূতের পাল্লায় পড়েছিলি! শুনিনি তো!' বিনুমামার কথায় অদূরে মোড়ায় বসে মা প্রায় ধড়মড়িয়ে উঠলেন
 শুনবি কী করে?’ হাসলেন বিনুমামা, ‘বলেছি নাকি কাউকে বাপরে যা ঝামেলা হয়েছিল সেদিন! তা জানিস তো ছেলেবেলায় গ্রামে দাদুদের ওখানে যাওয়ার সুযোগ হত দেড় দুবছর অন্তর একবার শহরের ইট আর কংক্রিটের জঙ্গল থেকে পালিয়ে কী মজাটাই না হত বল! মাথার উপর মস্ত নীল আকাশ ফসলভরা খেত, কাঁচা ঘাস আর মাটির গন্ধ তার উপর ফাউ ছিল দাদু আর দিদার আদর কয়টা দিন যে কোথা দিয়ে কেটে যেত তা সেই সময়ই ঘটেছিল ব্যাপারটা
অল্প থামলেন বিনুমামা আমাদের উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে শুরু করলেন আবার, ‘সেবার দাদুদের বাড়িতে গিয়ে জোগাড় হল আধছেঁড়া এক ঢাউস ঘুড়ি ওড়াবার জন্য বান্ডিল কয়েক পাটের দড়িও সামান্য মেরামত হলেই ওড়ানো যায় দরকার আঠার কিন্তু এ কি আর কলকাতা, যে দোকানে গিয়ে পয়সা ফেললেই আঠা মিলবে? তা গ্রামের ছেলেরা তখন আঠার কাজ মেটাত পাকাবাওলা ফলের রস দিয়ে গাছে ছোট কুলের মতো থোকায় ফল হত পেকে হালকা কমলা রং ধরলেই রসে টসটসে হয়ে উঠত দারুণ আঠার কাজ হত সেই রসে তা মাঝেমধ্যে গ্রামে যাওয়ার সুবাদে জানা ছিল সেটা কিন্তু চাইলেই কী আর সবসময় মেলে সবকিছু? গ্রামে বাওলা গাছের অভাব নেই থোকা-থোকা ফলও ধরেছে কিন্তু জুতসই পাকা ফল আর মেলে না
সেদিন এক ঝিম-ধরা দুপুরে বেরিয়েছিলাম ওইবাওলাফলের খোঁজে হঠাৎ দেখি দূরে মাঠের মাঝে কাদের একটা নাদাপেটা ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে দেখেই মাথার পোকাটা নড়ে উঠল ছুটলাম সেদিকে গ্রামের এই ছোটখাটো আকৃতির ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ছোটা তখন ডানপিটে ছেলেদের কাছে এক রোমাঞ্চকর খেলা বয়সে নেহাত নাবালক হলেও এমন দারুণ খেলায় বার কয়েক তাদের সঙ্গী হয়েছি আমিও কতক বেশ ঠাণ্ডা স্বভাবের আমার মতো শহুরে আনাড়িরও অসুবিধা হয় না কিন্তু নাদাপেটা হলেও এটা যে আদপেই সে জাতের নয় বুঝিনি সামনের দুই পায়ে দড়ি-বাঁধা ঘোড়াটা দিব্যি কায়দায় লাফিয়ে-লাফিয়ে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছিল কাছে গিয়ে খুলে দিতেও নড়ল না সঙ্গীসাথী কেউ নেই তবু সাহস করে লাফিয়ে উঠলাম পিঠের উপর তারপর পায়ের গোড়ালি দিয়ে পেটে জম্পেশ এক পুঁতো ব্যস, আর যায় কোথা! চিঁহিঁ-হিঁ-হিঁ শব্দে আচমকা গগন বিদারী চিৎকারে সেই নাদাপেটা মাঠঘাট ভেঙে ছুটল প্রায় পক্ষীরাজের গতিতে আনাড়ি সওয়ার সুতরাং খানিক বাদেই ছিটকে পড়লাম মাটিতে ধুলো ঝেড়ে যখন উঠে দাঁড়ালাম নাদাপেটা পক্ষীরাজ ততক্ষণে ধরাছোঁয়ার বাইরে
মনে-মনে হতভাগার মুণ্ডুপাত করতে-করতে ফেরবার পথ ধরেছি, চোখ পড়ল অদূরে মাঠের পাশে বারুইদের বাগানের দিকে হতচ্ছাড়া ঘোড়ার পাল্লায় পড়ে ভুলেই গিয়েছিলামবাওলা ফলের কথা কাছে বাগান দেখেই ফের মনে পড়ল সেটা চেনা থাকলেও আগে এই বাগানে আসিনি তবু সাত-পাঁচ ভেবে ঢুকে পড়লাম
মস্ত বাগান চারপাশে হরেক জাতের গাছ জনমানুষের সাড়াশব্দ নেই শুধু ঝিঁঝির কোরাস এই দুপুরে ফাঁকা মাঠও প্রায় জনমানবশূন্য তাতে অসুবিধে হয়নি কিছু কিন্তু ঝিমঝিম করা সেই নির্জন বাগানের ভিতর খানিক এগোতেই গা কেমন ছমছম করে উঠল এই দিনদুপুরেও ভিতরে কী অন্ধকার রে বাবা! হঠাৎ মনে পড়ল, গাঁয়ে কার কাছে যেন শুনেছিলাম, জায়গাটা নাকি তেমন ভাল নয় এই ভরদুপুরে এখানে নাকি গেছোভূতের আড্ডা বসে ডালে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে মজলিশ জমায় তেঁনারা বলতে নেই, ব্যাপারটা মনে পড়তে গায়ে হঠাৎ কাঁটা দিয়ে উঠল
হয়তো ফিরেই যেতাম, হঠাৎ নজরে পড়ল অদূরে মস্ত এক বাওলা গাছ হালকা কমলা রঙের কয়েক থোকা পাকা ফল ঝুলছে ওর গোটাকয়েক হলেই ঘুড়িটা জুড়ে ফেলা যায় সুতরাং ফেরা হল না ভয় ঝেড়ে ঝোপঝাড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম আরও কয়েক পা আর তারপরেই ধড়াস করে উঠল বুকের ভিতর বোঁ করে ঘুরে উঠল মাথা -ও কী! আধো অন্ধকারে সেই বাওলা গাছের ডাল থেকে ঝুলছে এক জোড়া লম্বা লিকলিকে পা চিমড়ে সরু আঙুলে বড়-বড় নোংরা নখ তবু গোড়ায় মনে হয়েছিল চোখের ভুল বুঝি কিন্তু হঠাৎ নড়ে উঠল পা দুটো রীতিমতো দুলতে শুরু করল
অ্যাঁ!’ বিনুমামার কথা শেষ হবার আগেই টুলটুলি বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মামার গায়ের সঙ্গে আরও লেপটে গেল
হ্যাঁ রে, তাই আর ভয় যা পেয়েছিলাম, জীবনে অমন ভয় কমই পেয়েছি চিৎকার করে বলতে গেলাম, কে-কে!
কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হল না শুকিয়ে কাঠ তবে ওই অবস্থার মধ্যেই একটা কাজ করে ফেললাম আগে বলিনি, বাগানে ঢুকে গা ছমছম করে উঠতেই হাতে জম্পেশ একটা মাটির ঢেলা তুলে নিয়েছিলাম আর সেই ছেলেবেলায় ঢিল ছোঁড়ায় জুড়ি ছিল না আমার বদমায়েশির জন্য বাড়িতে চড়-চাপড় জুটত হামেশাই অন্য রকমও হয়েছে পাড়ার সতুপিসে সেবার তার ছেলে ভজাকে নিয়ে হামলে পড়েছিল জ্যাঠার কাছে, আমি নাকি ভজাকে ঢিল ছুঁড়ে আর একটু হলে প্রায় মেরেই ফেলেছিলাম নেহাত কপালজোরে গায়ে লাগেনি
শুনে জ্যাঠা সতুপিসের উপর প্রায় তেড়ে উঠেছিলেন, বাজে কথা বলিসনি সতু বিনু ঢিল ছুঁড়েছে, আর তোর ছেলের মাথা ফাটেনি তাই হয়! ও অন্য কেউ
গল্পটা মার কাছে শুনেছি আমরা মিথ্যে নয় এক বিন্দু তাড়াতাড়ি বললাম, ‘কিন্তু ঢিল ছুঁড়ে ভুত তাড়ানো যায় নাকি? ভূতই তো ওই রকম দুপুরে ঢিল ছুঁড়ে ভয় দেখায়!’
ঠিকই বলেছিস বিনুমামা চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘তবে সেই ছেলেবেলায় এই ব্যাপারে আমিও কিছু কম ছিলাম না রে! তবু ঘটনা হল, জীবনে সেই প্রথম লক্ষ্যভেদ হল না আসলে তখন রীতিমতো হাত-পা কাঁপতে লেগেছে ছোঁড়া ঢিলটা গেছো ভূতের পাশ দিয়ে পাতার ঝোপ ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল আর তারপরেই সেই ভীষণ ব্যাপার!
আঁউ!
পিলে চমকানো পৈশাচিক চিকারে লিকলিকে সেই পা দুটো এরপর হঠাৎ লাফিয়ে নামল গাছ থেকে কুচকুচে কালো সিড়িঙ্গে চেহারা একমুখ খোঁচা দাড়ি-গোঁফের মাঝে ভাঁটার মতো চোখ মুলোর মতো একরাশ দাঁত বার করে সেই গেছোভূত এবার ধেয়ে এলো আমার দিকে পিছনে ভয়ানক গোঁগোঁ শব্দে কালো মেঘের মতো আরও কী সব!
হায় ভগবান! সামান্য বাওলা আঠার খোঁজে এসে ভূতের হাতে প্রাণটাই গেল এবার! মুহূর্তে দুলে উঠল মাথা, সারা পৃথিবী তারপর আর কিচ্ছুটি মনে নেই
ওই ভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না তারপর জ্ঞান ফিরতে দেখি বাগানের মাঝে পড়ে আছি চিতপাত হয়ে শরীরে কুটোর আঁচড়টিও লাগেনি এক বার মনে হল বেঁচে আছি তো? নাকি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন! কিন্তু খানিক ধাতস্থ হতে বুঝলাম বেঁচেই আছি স্বপ্নও নয় চারপাশে তাকিয়ে ভয়ানক সেই ভূতটার চিহ্নমাত্রও পেলাম না নির্জন বাগানে ঝিঁঝির কোরাসের মাঝে কোথাও এক জোড়া শালিক শুধু ক্যাঁচম্যাচ শব্দে ঝগড়া করে চলেছে ভয়ে-ভয়ে উঠে বসলাম চারপাশে সন্তর্পণে আর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে পড়ি কী মরি করে বাগান থেকে বের হয়ে দে ছুট
এক দৌড়ে মাঠ পার হয়ে গাঁয়ে ঢুকতেই দেখি সামনে বোসেদের বাড়িতে লোকজনের ভিড় বোসবাড়ির ছোট ছেলে ডাক্তারি করেন কাছারিঘরের কোণে তাঁর ওষুধে ঠাসা মস্ত আলমারি ভিড়টা সেখানে পায়ে-পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে তো আক্কেল গুড়ুম হবার জোগাড় কী কাণ্ড! একমুখ খোঁচা দাড়ি সেই গেছোভূতটা চিত হয়ে পড়ে আছে বারান্দায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সারা শরীরে মৌমাছির হুল সাবধানে তোলা হচ্ছে সেগুলো তুলো ভিজিয়ে ওষুধ লাগানো হচ্ছে পাশে একজনকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন, ‘আরে, ও তো বারুইপাড়ার বদন মণ্ডল আস্ত গেছোপাগল দিনভর গাছে উঠে বসে থাকে কারো কথাই গ্রাহ্য করে না কোথায় গাছে উঠেছিল ডাঁশা মৌমাছি প্রায় চাষ করে ফেলেছে সারা শরীরে তবে পাগল হলেও ছুটে এসে উঠেছে একদম ঠিক জায়গায়!’
গল্প শেষ করে থামলেন বিনুমামা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এবার বল দিদি, একথা কাউকে বলা যায় কী যে ভয়ে ভয়ে ছিলাম কয়েকটা দিন! ভাগ্যিস, লোকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিল দিন কয়েকের মধ্যেই
ছবি: সঞ্জীব পাল (সৌজন্য: কিশোর ভারতী)
প্রথম প্রকাশ: কিশোর ভারতী বইমেলা সংখ্যা ২০১৪

1 comment: