Monday, 5 January 2015

সুন্দরবনের গল্প (মোবাইল ভাঃ): বৈকুণ্ঠ বাউলে


ধছেঁড়া একটা পাল খাটিয়ে শামিয়ানা তৈরি হয়েছে। তলায় জনাকয়েক জোয়ান-মর্দ মানুষ ভক্তিভরে জোড়-হাতে বসেছেলে-বুড়োও রয়েছে কিছু। সন্ধে রাত্তিরে বনবিবির থানে টিমটিম করে পিদিম জ্বলছে। ধূপধুনোর গন্ধ। বাদায় মাছ ধরতে যাওয়ার আগে মালোপাড়ায় পুজো হচ্ছে মা বনবিবির।
গাঁয়ের পুরোহিতের পাশে জোড়-হাতে বসে আছে বুড়ো বৈকুণ্ঠ বাউলে। বয়স তিন কুড়ির উপর হলেও মেদবিহীন শরীর। সদ্য স্নান সেরে এসেছে। পরনে পরিষ্কার ধুতি। খালি গা। এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছে পুরোহিতের সামনে। পুজো শেষ হলেই শুরু হবে মায়ের পাঁচালি পড়ার পালা। এ-কাজটা বৈকুণ্ঠ বাউলের। লেখাপড়া না জানলেও মা বনবিবির গোটা পাঁচালি তার কণ্ঠস্থ। সুর করে পুরো পাঁচালিটাই তখন বলে যাবে বুড়োপ্রথমে মা বনবিবির বন্দনা। তারপর দুখের কথা। গরিব অন্ধ বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে দুখে পেটের দায়ে গিয়েছিল বাদাবনে। তারপর মা বনবিবির কৃপায় কী ভাবে বাঘের মুখ থেকে বাঁচল, অনেক ধনরত্ন পেয়ে দিন ফিরল, সেই কাহিনি।
বনবিবি হলেন বাদাবনের দেবী। বাদার জঙ্গলে যাবার আগে তাই পুজো দিতে হয় তাঁর থানে। যে যেমন পারে। পাঁচ পয়সার পুজোতেও তিনি তুষ্ট। তা-ও না জুটলে একটা গরান পাতার অঞ্জলি। আজকের মতো বড় আয়োজনও হয় কখনও। আজ রাতে ভাটার টান শুরু হলেই কুম ঘিরে মাছ ধরতে বেরোবে মালোপাড়ার একদল। গোনা দ্বীপের দক্ষিণে বড় গাঙের মুখে। বৈকুণ্ঠ বাউলেও যাবে সঙ্গে। বুড়ো দলের সাঁইদার
বাদায় কুম ঘিরে মাছ-ধরা সব সময় হয় না। বছরে মাত্র একবার। তাই আয়োজনটাও অন্য রকম।
বৈশাখের শেষে বড় গাঙের মোহনায় জঙ্গল থেকে ডালপালা কেটে এনে জায়গায়-জায়গায় জলে পুঁতে রাখা হয়। এগুলোকেই বলে কুম। আষাঢ় শ্রাবণ মাসে বর্ষার জল যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে, কুমের ডালপালার গায়ে জমা শ্যাওলা খেতে আসে হরেক জাতের ছোট-বড় মাছ। আবার এই সব মাছ শিকারে কুমের ভিতর এসে আস্তানা গাড়ে বাদা জলের বড়-বড় বাঘা ভেটকি। দশ বারো কেজি করে ওজন এক-একটার। ভালো দাম পাওয়া যায়। বর্ষা শুরু হলে জেলেরা নৌকোয় দল বেঁধে ফের আসে মাস কয়েক আগে তৈরি করে যাওয়া এই কুমের কাছে। একটা করে কুম জাল দিয়ে ঘিরে ভিতরের ডালপালা তুলে সাফ করে ফেলা হয়। ধরা পড়ে মাছগুলোবড়-বড় চিংড়ি, পারশে, পায়রাচাঁদা, দাঁতনে, পাঙাশ, ভাঙন, নোচে, কানমাগুর। এ-ছাড়া বাদা জলের বাঘা ভেটকি।
কুম ঘেরার কাজ হয় সেই মোহনার কাছে। গা গঞ্জের আড়ত থেকে কয়েক দিনের পথ। অত দিন মাছ টাটকা থাকার কথা নয়। তাই প্রত্যেক নৌকোয় থাকে হাপরের ব্যবস্থা। ধরা মাছ জিইয়ে রাখা হয় তার ভিতর। থাকে বেশ কয়েক দিন।
একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে থামল রসুল মিয়া। আমি বললাম, ‘হাপর কী জিনিস চাচা?’
বুড়ো রসুল মিয়া তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না। নিঃশব্দে গুম হয়ে রইল। সম্ভবত গল্পটা সাজিয়ে নিল ভিতরে। তারপর বড় একটা দম ছেড়ে বলল, ‘এ-গল্পে ওই হাপরের ব্যাপার একটু আছে ভাই। তাই যথাসময়ে আসবে আবার। বরং আগের কথা শোনেন।
‘কোথায় সাতজেলিয়ার আবাদ আর কোথায় বড় গাঙের মোহনায় গোনাদ্বীপ। প্রায় চার ভাটার পথ। সেই রাত্তিরে যথাসময়ে নৌকো ছেড়ে পরদিন গোসাবা গাঙ ধরে চামটার দক্ষিণে ভোলাখালির কাছ যখন ওরা পৌঁছোল, পশ্চিম আকাশে গাঙের জলে একরাশ রাঙা আবীর ছড়িয়ে সূর্য তখন ডুবুডুবু। মিঠে হাওয়ায় সন্ধেটা আজ বড় মনোরম। সুন্দরবনের কুখ্যাত দ্বীপ চামটার কাছে হলেও জায়গাটা খুব পছন্দ বৈকুণ্ঠ বাউলের। সুবিশাল গোসাবা গাঙ এখানে হঠাৎ বাঁক নিয়েছে পুবে। ডানদিকে মায়াদ্বীপ খাল। নামে খাল হলেও আকারে নদীই। দুধারে থমথমে জঙ্গল। গোনাদ্বীপ এখান থেকে আর এক ভাটির পথ মাত্র। একটানা দাঁড় টেনে সবাই বেশ ক্লান্ত। ঠিক হল রাতে এখানেই থাকা হবে।
‘দলে নৌকো মোট তিনটে। ভেড়ানো হল পাড় থেকে খানিকটা দূরেই। শুরু হয়ে গেল রান্নার তোড়জোড়। তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়বে সবাই। শেষ রাত্তিরে ভাটায় নৌকো ছেড়ে দেওয়া হবে আবার।
‘কিন্তু রান্নার তোড়জোড় করতে গিয়ে মালুম হল তিনটে নৌকোতেই জ্বালানি কাঠ রয়েছে সামান্যই। আজকে চলে গেলেও আগামী কাল কাটতেই হবে। দলে রান্নার কাজ বৃন্দাবনের। লম্বা চওড়া ডাকাবুকো জোয়ান। একটু পেটুকও বটে। বলল, বাউলেদা, বেলা যখন রয়েছে ঝপ করে চড়ায় নেমে কাঠ আর সেই সঙ্গে দুখ্যাপলা জাল ফেলে ভোলাখালির সরেস চিংড়ি কিছু ধরে আনি। ঝাল দিয়ে চিংড়ি হবে রাতে।
‘বৃন্দাবনের প্রস্তাবে সায় দিল সবাই। এ-সময় ভোলাখালিতে চাপড়া চিংড়ির রমরমা। তার স্বাদই আলাদা। দুপুরে শুধু ডাল-ভাত হয়েছে। এরপর একবার কুম ঘেরার কাজ শুরু হলে সারাদিন মাছের আঁশটে গন্ধে ও বস্তুটি মুখে তোলা যাবেশুধু তেঁতুল দিয়ে ডাল। নয়তো, বাদার কেওড়া ফলের অম্বল।
‘চামটার জঙ্গল এমনিতেই ভয়ানক। তার উপর আলো কমে আসছে। নৌকো থেকে পাড়ে জঙ্গলের অবস্থা মোটেই বোঝা যাচ্ছে না। এ-অবস্থায় জঙ্গলে নামার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না বৈকুণ্ঠ বাউলের। কিন্তু সবার ইচ্ছে দেখে আর না। করতে পারল না।
‘তিনটে নৌকোর মধ্যে সবচেয়ে ছোটটায় বৈকুণ্ঠ বাউলের ঠাঁই। গেরাপী মানে নোঙ্গর তুলে পাড়ের দিকে রওনা হয়ে পড়লবৃন্দাবন ছাড়া নৌকোয় তৃতীয় আর কাউকে নেওয়া হয়নি। নদীর চড়ায় অল্প জলে বড়-বড় চাপড়া চিংড়ি আর পারশের ঝাঁক কিলবিল করছে। নৌকো চড়ায় ভিড়িয়েই হাতে খ্যাপলা জাল নিয়ে তৈরি হয়ে গেছে বৃন্দাবন। নামবে এবার। অদূরে চড়ার কাদা, ঝোপঝাড় কোটরাগত দুই চোখে ফালাফালা করে কাটারি হাতে নামার জন্য তৈরি হচ্ছিল বাউলেও। হঠাৎ ভারী গলায় চেঁচিয়ে উঠল, হেই বৃন্দাবন। সামাল।
‘বলতে-বলতে দাঁড়ের এক গুঁতোয় নৌকো ফের দূরে ঠেলে দিল বুড়োব্যাপারটা কী হল বুঝে ওঠার আগেই অদূরে নদীর চড়ায় ছোট হেঁতাল ঝোপটার দিকে চোখ পড়তে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল বৃন্দাবনের। ঝোপের ভিতর থেকে মাথা বের করে ওদের পানে তাকিয়ে আছে বাদাবনের বাঘ। হাঁড়ির মতো মস্ত মাথা। দুই চোখে আগুন ঝরানো দৃষ্টি। জিব দিয়ে লালা ঝরছে টপটপ করে। অথচ একটু আগেও ওই হালকা-পাতলা ঝোপের দিকে তাকিয়ে কিছুই নজরে পড়েনি।
‘সাধের শিকার ফসকে যেতে বাঘটা ইতিমধ্যে হেঁতাল ঝোপ থেকে বেরিয়ে জিব চাটতে-চাটতে গজেন্দ্র গমনে চলতে শুরু করেছে অদূরে জঙ্গলের পানে। হাঁ করে দেখছিল বৃন্দাবন। তা দেখে বাউলে বলল, শিকার ফসকে সুমুন্দির রোখটা দেখেছিস? রাত্তিরে একটু হুঁশিয়ার থাকিস বাপু।
‘বাঘটা যে পাকা নরখাদক, সে-বিষয়ে তখন আর সন্দেহ নেই কারও। নদীতে জেলে নৌকো দেখেই ঘাপটি মেরে ছিল হেঁতাল ঝোপের ভিতর। অভিজ্ঞ নরখাদক ঠিকই বুঝেছিল, কাঠ কাটতে বা মাছ ধরতে কেউ আসবেই এদিকে। সুতরাং শিকার ফসকে যেতে রোখ যে আরও বাড়বে তাতে আর সন্দেহ কি? বাদাবনের নরখাদক যখন কোনও শিকার ধরবে বলে স্থির করে, তখন প্রয়োজনে দিনের-পর-দিন লেগে থাকে পিছনে। জল বা ডাঙা, মানে না কিছুই।
‘মাত্র গত কালই বাড়ি থেকে বের হয়েছে। আর আজই এই ব্যাপার! ভাগ্যিস, বাউলে সঙ্গে ছিল! নইলে এক্ষুনি হয়ে যেত কিছু। মনটা খারাপ হয়ে গেল সবার। তিনটে নৌকোতেই থমথমে ভাব। বাউলে অবশ্য ভরসা দিল সবাইকে, ঘাবড়াসনি বাপু। মা বনবিবির পুজো দিয়ে শুদ্ধ মনে যখন বেরিয়েছিস, তিনিই রক্ষা করবেন সবাইকে।
‘রাত্তিরে কোনও মতে পেটে কিছু দিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল সবাই। পরিশ্রান্ত মানুষগুলো ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল একটু পরেই। ঘুম নেই শুধু বৈকুণ্ঠ বাউলের চোখে। বাদায় বাউলের দায় বড় কঠিন। এই মানুষগুলোকে নিরাপদে গাঁয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েই বের হয়েছে সে। চোখে তাই ঘুম আসে কেমন করে? সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে উঠে বসল ওর ছোট নৌকোর ছইয়ের উপর। গভীর রাতে টপটপ করে হিম পড়তে শুরু করল। গোলপাতার টোকাটা মাথায় দিয়ে নিল বুড়োতারপর শেষ রাত্তিরে ভাটা শুরু হতেই ডেকে তুলে দিল সবাইকে। নৌকো ছাড়ার সময় হয়েছে।
‘পরদিন সকালেই বোঝা গেল বিপদ এবার অনেক। ভোলাখালি থেকে গোনা এক ভাটার পথ। তখন গোনা দ্বীপের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে ওরা। সকালের মিঠে রোদে ঝলমল করছে চারদিক। গাঙ এখানে দুদিকে ছড়িয়ে গেছে অনেক দূর। বড়-বড় ঢেউয়ের মাথায় সোনালি রোদের খেলা। নদীর দুধারে রাতের শিশির ভেজা গাঢ় সবুজ বনানী ছুঁয়ে আসা বাতাসে চমৎকার এক আমেজ। রাত্তিরে নরখাদক বাঘটা নৌকোয় আর হামলা করতে আসেনি। এজন্য সবাই একটু খোশমেজাজে। ভাটার টান তো আছেই, দাঁড়ও পড়ছে ঝপ-ঝপ করে। তরতর করে ছুটছে তিনটে নৌকো। হঠাৎ নজরে পড়ল মোহনার দিক থেকে উজানে দুটো নৌকো আসছে। মোহনার কাছে প্রবল স্রোত ঠেলে এভাবে সাধারণত নৌকো বায় না কেউভয়ানক পরিশ্রম ওতে।
‘অভিজ্ঞ চোখে দূর থেকে দেখেই খটকা লাগল। দুটোই মাছ ধরার নৌকো। দুদিকে বাঁধা বড়বড় হাপর। ওদের মতোই মোহনায় এসেছিল কূম ঘিরে মাছ ধরতে। চেনা গেল কাছে আসতেই। কুমিরমারির গিরীশ বাউলের দল। কাছে আসতেই একসাথে সবাই হাউমাউ করে উঠল। দুচার কথাতেই বোঝা গেল ব্যাপারটা। সর্বনাশ হয়ে গেছে। ওদের। বুড়ো গিরীশ বৈকুণ্ঠরই সমবয়সি। ভেঙে পড়েছে একেবারে। বাদায় বাউলে চারপেয়ে শয়তানের সঙ্গে লড়াই করতে পিছপা হয় না। কিন্তু দুপেয়ে শয়তানের কাছে একেবারেই অসহায়। গিরীশ বাউলেদের নৌকোয় ডাকাত পড়েছিল গত রাত্তিরে। সীমান্তে হরিণভাঙা নদীর ওপার থেকে আসা আসগর আলির দলবল। জাল, হাপর ভরতি মাছ, খোরাকির চাল–ডাল, নগদ টাকা যা ছিল সব কেড়ে গিয়ে গেছে।
‘বাদার মানুষের কাছে এ বড় নিদারুণ ব্যাপার। গাঙের মোহনায় মাছ ধরতে আসার খরচ কম নয়। নৌকো, জাল সবই ভাড়া করা। দশ বারোজন মানুষের দিন পনেরোর চাল-ডাল। ঘরে তাদের পরিবারের খোরাকি। আনুষঙ্গিক আরও সব খরচ। এ সবই জোগাড় হয় মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে। মাছ যদি আশানুরূপ মেলে তবেই খরচা বাদ দিয়ে দুপয়সা ঘরে তুলতে পারবেকদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের দাম। এই অবস্থায় তাই গিরীশ বাউলেদের ভিটেমাটি বেচে পথে নামা ছাড়া গতি নেই।
 ‘খানিক বাক্যালাপের পর চলে গেল গিরীশ বাউলেদের নৌকো। আর ওরা তিন নৌকোর বারোজন মানুষ দাঁড় ফেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পরস্পরের পানে। আসগর আলি বাদার ডাকসাইটে ডাকাত। বাড়ি সীমানার ওপারে। ডাকাতি করে এপারে এসেপুলিশের তাড়া খেলেই সীমান্তে হরিণভাঙা নদী পেরিয়ে সটকান দেয় ওপারে। কোনও দয়া-মায়া নেই। লোকটার হাতে বাদার কত মানুষ যে সর্বস্বান্ত হয়েছে তার লেখাজোখা নেই। সেই আসগর আলি তার দলবল নিয়ে এই মরশুমে ঘাঁটি গেড়েছে গোনাদ্বীপের কাছে। এ অবস্থায় ওদিকে এগোনো মানেই হাড়িকাঠে মাথাটা গলিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া আর যা বাকি থাকে তা হল পত্রপাঠ ফের গায়ে ফিরে যাওয়া। কিন্তু তা হলে সংসার চলবে কেমন করে? পেটের খিদে যে আরও ভয়ানক! তা ছাড়া চড়া সুদে টাকা ধার নেওয়া হয়েছে মহাজনের কাছ থেকে। তার অনেকটাই খরচ হয়ে গেছে।
‘বৈকুণ্ঠ বাউলে গুম হয়ে রয়েছে সেই থেকে। কোনও কথা নেই মুখে। দেখে সবাই এক সাথে বলল, বাউলেদাগো কিছু বলো
‘ওরা বলল বটে, কিন্তু উত্তরটা জানে সবাইতবু জিজ্ঞাসা, যদি কোনও আশার আলো দেখাতে পারে মানুষটা। তা সেই পথই বাতলাল বুড়োমুখ তুলে ফস করে বলল, এত দূর এসে শেষে ফিরে যাবি? বরং আজকের দিনটা দেখাই যাক, কী বলিস? আর অল্পই তো পথ।
‘যথাস্থানে পৌছে কুম ঘেরা শুরু হয়ে গেল দুপুরের আগেই। কাজ চলতে লাগল যন্ত্রের মতোসন্ধের মধ্যেই ধরা পড়ল মন তিনেক মাছ। বৈকুণ্ঠ বাউলের ছোট নৌকোর দু'পাশে ঝুলছে দুটো পেল্লায় হাপর। জিনিসটা বাঁশের বাখারি দিয়ে তৈরি চৌকোনা মস্ত খাঁচা। নৌকোর দু'ধারে এমন ভাবে ঝোলানো হয় যে, তার বেশির ভাগটাই জলে ডুবে থাকে। শুধু মুখের দিকের একটু জেগে থাকে জলের উপর। মাছ ধরে জ্যান্ত ছেড়ে দেওয়া হয় তার মধ্যে। বড় নৌকোর দুই দিকে চারটে পর্যন্ত হাপর বাঁধা থাকে।
‘বাউলের নৌকো ছোট। দুদিকে দুটোই মাত্র হাপর। সেই দুই হাপরই ভরতি হয়ে গেল মাছে। একটায় শুধু বড়-বড় পাঁচ ছয় সের ওজনের ভেটকি। দিন শেষে নৌকো ঢুকিয়ে দেওয়া হল কাছেই এক শিষখালের ভিতর। রাতে ডাকাতের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে একটু আড়ালে থাকাই ভাল।
‘বাউলের নির্দেশে আজ আর আলো জ্বালা হল না। সন্ধের মধ্যেই সেরে নেওয়া হল রান্না খাওয়া। চারপাশে অন্ধকার ঘন হয়ে আসতে শোয়ার আয়োজন চলছে। বৈকুণ্ঠ বাউলের সঙ্গে ছোট নৌকোয় আরও দুজন শোয়বাউলে তাদের বলল, আজ রাতে এখানে আর থাকার দরকার নেই তোদের।
তুমি তাহলে একলাই থাকবে নৌকোয়? অবাক হয়ে বলল একজন।
‘বিড়ির জ্বলন্ত মাথা হাতের তালুর ভিতর আড়াল করে মউজে টানছিল বুড়োধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে বলল, না রে বাপু, এ নৌকোয় আজ শোয়ার দরকার নেইতোরা বড় নৌকোড যা। বিড়িটা শেষ করে আমিও যাচ্ছি।
সাঁইদারের আদেশ।| কথা না বাড়িয়ে চলে গেল ওরা। একটু-একটু করে রাত বাড়ল। কাছেই জঙ্গলে আতঙ্কিত গলায় একটা হরিণ ডেকে উঠল টাউটাউ শব্দে। হাতের বিড়ি শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বৈকুণ্ঠ বাউলে উঠল এবার। হাপরের ভিতর বড় ভেটকি মাছগুলো ঘাই মারছে খলবল করে। পা টিপে এগিয়ে গেল সেটার মুখের কাছে। হাপরের মুখ বাখারির পাটি দিয়ে আটকানোবাউলে সন্তর্পণে খুলে দিল মুখটা। অন্ধকারে সেরে ফেলল আরও গোটা কয়েক কাজ। তারপর নিঃশব্দে ফিরে গেল অন্য নৌকোয়। সারাদিনের পরিশ্রমের পরে সবাই ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের পাশে একটু জায়গা করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। বাইরে নিশুতি রাতে তখন শুধু কলকল জলস্রোতের শব্দ। এছাড়া হাপরের ভিতর ভেটকি মাছের খলবল আওয়াজ। সদ্য ধরা পড়েছে মাছগুলোদুএকটা দিন এখন চলবে এই রকম। তারপর ঠান্ডা মেরে যাবে।
‘একটানা সেই আওয়াজ শুনতে-শুনতে একটু তন্দ্রামতো এসেছিল বৈকুণ্ঠ বাউলের। হঠাৎ ছোট নৌকোর কাছে একটা আওয়াজে জেগে উঠল। বেশ জোরালো আওয়াজঝপাং শব্দে জলে কিছু পড়ল। ততক্ষণে বাকি সবাই জেগে উঠেছে। ঘন অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। শুধু হাপরের ভিতর ভেটকি মাছের খলবল আওয়াজ। বড় ঘাই মারছে সমানে।
বাউলেদা, কীসের যেন আওয়াজ শুনলাম! ব্যাপার কী বলো দেখি?
বৈকুণ্ঠ বাউলে চোখ কচলে উঠে পড়েছে ইতিমধ্যে। বলল, কিছু নয় রে বাপু। শুনতে পাচ্ছিসনি হাপরে ঘাই মারছে মাছে জোরাল ঢেউয়ের তোড়ে সুমুন্দিগুলোর বড্ড তেল বেড়েছে দেখছি! তবু বলছিস যখন, গিয়ে দেখেই আসি।
‘নোঙ্গর করা ছোট নৌকোটা ততক্ষণে সরে গেছে খানিক। দুলছেও বেশ। লগি দিয়ে কাছে এনে সেটায় লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বুড়োবাউলের চোখ অন্ধকার মানে না। ছইয়ের ভিতর উঁকি মেরে দেখে নিল আগেময়লা কাঁথার বিছানাটা লন্ডভন্ড হয়ে রয়েছে। চারপাশে আর একবার চোখ বুলিয়ে নিল ভাল করে। তারপর হাপরের খোলা মুখটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, কিছু নয় রে বাপু। হাপরে মাছের কম্ম। তা বাকি রাতটা এই নৌকোতেই শুয়ে পড়ছি আমি। তোরাও মিছে জাগিসনি
‘পরদিন বিকেল পর্যন্ত মাছ ধরা চলল জোর কদমে। সবাই যখন ভাবতে শুরু করেছে আজকের দিনটাও ভালোয় ভালোয় পার হল বুঝি, তখনই ঘটল ব্যাপারটা। বড় গাঙে মাছ ধরা শেষ করে নৌকো তখন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রাত কাটানো হবে সেই আগের দিনের জায়গায়। এমন সময় পাশের পুঁতিখালের ভিতর থেকে বেগে বের হয়ে এল একটা নৌকো। সাঁ করে এসে ভিড়ল ওদের পাশে। ছইয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে এক ষণ্ডা চেহারার মানুষ। মুখ ভরতি অসংখ্য কাটাছেঁড়ার দাগ। বড় খোঁচা দাড়ি। পানের ছোপ ধরা নোংরা দাঁত বের করে ক্রুর হেসে বলল, গটে বিড়ি হবে গো কত্তা?
‘লোকটার সেই আপাত নিরীহ কথায় ওদের বুকের রক্ত প্রায় হিম হবার জোগাড়। এভাবে বিড়ি চাওয়ার অর্থ অজানা নেই কারও। ডাকাত আসগর আলিকে ওরা কেউই দেখেনি আগে। নামই শুনেছে। কিন্তু বুঝতে কারও বাকি রইল না, স্বয়ং আসগর আলিই এই মুহূর্তে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। তিন নৌকো মানুষ, কারও মুখে কথা সরল না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।।
‘ইতিমধ্যে ডাকাতের নৌকো থেকে বেরিয়ে এসেছে আরও জনা দশেক মানষ। হাতে সড়কি, রামদা। একজনের হাতে বন্দুকও রয়েছে। সর্দারের আদেশ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। তবে সেই আদেশ যে এক্ষুনি আসবে না, তাও জানে ওরা। শিকারি বেড়াল যেমন আহারের আগে থাবায় ধরা ইঁদুর বেচারাকে খেলায়, সেই ভাবে খেলাবে কিছুক্ষণ। বিশেষত এই বাদাবনের মোহনায়, যেখানে ধারেকাছে পুলিশের বোট বা নিদেন পক্ষে আর একটা জেলে বা কাঠুরে নৌকো নেই।
‘ডাকাতের হাতে বৈকুণ্ঠ বাউলে আগেও পড়েছে। অভিজ্ঞতা আছে কিছু। তবু ঘটনার আকস্মিকতায় গোড়ায় অন্যদের সঙ্গে নিজেও হকচকিয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, আজ্ঞে চাচা হবে। শুধু একটা অনুরোধ খুনখারাপি কোরনি।
‘শুনে খ্যাখ্যা করে হাসল আসগর আলি তা ভাল, ঝামেলা না করলে আসগর আলি বেকার খুনখারাপিতে যায়। তা বাপু সঙ্গে যা আছে চটপট নৌকোয় তুলে দে দেখি। দেরি করিসনি। আর দেখিস বাপু, ফাঁকি দেবার চেষ্টা করিসনি আবার। কেটেকুটে গাঙে ভাসিয়ে দে যাব তাহলে।
‘সঙ্গে মালপত্র বলতে বারোজন মানুষের দিন পনেরোর খোরাকির চালডাল। এ–ছাড়া গোটা কয়েক জাল আর খুচরো টাকা। সঙ্গীসাথী নিয়ে বাউলে নিজেই সব তুলে দিল আসগর আলির নৌকোয়।
‘দাঁড়িয়ে শ্যেন দৃষ্টিতে সব পর্যবেক্ষণ করছিল আসগর আলি। বলল, তা বাউলের পো, আর কিছু নেই নৌকোয়?
আজ্ঞে, আছে চাচা। হাত কচলে বৈকুণ্ঠ বাউলের উত্তর মাছ। গতকালই এসেছি কিনাসবে দুটো হাপর ভরতি হয়েছে।
তা বেশ জাঁদরেল সাইজের মাছ পেয়েছিস মনে হচ্ছে!
জুলজুল করে ভেটকি মাছের হাপরটার দিকে তাকাল আসগর আলি। মস্ত হাপরের ভিতর সমানে ঘাই মারছে মাছগুলো
‘উত্তরে বাউলে বলল, হেঁ-হেঁ চাচা, গোটা তিরিশ ভেটকি। সবে ধরা পড়েছে কিনা! এখনও তেজ মরেনি।
তা বেশ। এবার চটপট নৌকোয় তুলে দে দেখি মাছগুলোমৃদু ধমকে আসগর আলি বলল।
আপনার নৌকোটারে তাহলে একটু কাছে আনেন চাচা। বেজায় বড় হাপর কিনা। মাছে ভরতি। তুলতে বেগ পেতে হবে।
‘বৈকুণ্ঠ বাউলের কথা সত্যি। সময় নষ্ট না করে আসগর আলির নৌকো এসে ভিড়ল ছোট নৌকোটার গায়ে।
‘বৈকুণ্ঠ বাউলে তৎক্ষণাৎ কয়েকজনকে জলে নামিয়ে দিল হাপর তুলে দেবার জন্য। গোটা দুই বাঁশ দিয়ে নৌকোর সঙ্গে মজবুত করে বাঁধা হাপর। বাউলে চটপট খুলে ফেলল সেগুলোতুলে দিল হাপরের মুখের ঢাকনাও। তারপর জলের মানুষগুলোকে ঠেলে তুলে দিতে বলল হাপরটা। নিমেষে হেঁইও বলে সবাই মস্ত হাপরটা এক ঠেলায় তুলে উলটে দিল কাছে আসগর আলির নৌকোয়।
‘‘ঘা-আঁ-আঁ-উঁশব্দে রক্ত জল করা গর্জনে হাপরের খোলা মুখ দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে লাফিয়ে বেরিয়ে এল বাদাবনের ক্ষুধার্ত এক নরখাদক। সোজা এসে পড়ল সামনে দাঁড়ানো আসগর আলির উপর। মুহুর্তে মুখে তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। তারপর অদূরে নদীর চড়ায় উঠে গজেন্দ্র গমনে ঢুকে পড়ল বনের গভীরে।
‘ব্যাপারটা ঘটে গেল প্রায় চোখের নিমেষে। ইতিমধ্যে ওই ভীষণ কাণ্ড দেখে আসগর আলির সাগরেদরা হাতের অস্ত্র ফেলেচাচারেবলে ঝাঁপ দিয়েছে নদীতে। তারপর কেউ ডাঙায় উঠে দিগবিদিক ভুলে দৌড় লাগাল সেই বাঘের জঙ্গলে। কেউ সাঁতার লাগাল উলটো দিকে।’
প্রায় দম বন্ধ করে শুনছিলাম এতক্ষণ। রসুল মিয়া থামতেই বললাম, ‘ব্যাপারটা কী হল চাচা? মাছের হাপরের ভিতর থেকে বাঘ বের হল কেমন করে? ভেলকিবাজি নাকি?’
ফিক করে হাসল বুড়োবলল, ‘ভেলকিবাজি নয়। আসলে গল্পের মজাটা ধরে রাখার জন্য মাঝখানের একটু আর ইচ্ছে করেই বলিনি। বাদার নরখাদক বাঘের মুখ থেকে কপাল জোরে শিকার একবার বেঁচে গেলেও তার যে আর রেহাই নেই, সে তো আগেই বলেছি। ভোলাখালিতে সেই ঘটনার পরে বৈকুণ্ঠ বাউলেও তাই জানত, রাতে নরখাদকটা সুযোগ পেলে ফের হানা দেবার চেষ্টা করবে। তা বাঘটা সেই রাতে এসেও ছিল আবারকিন্তু বাউলে সারা রাত ছইয়ের উপর জেগে বসে থাকায় নৌকোয় উঠতে সাহস পায়নি। এই ব্যাপারটাই পরে কাজে লাগিয়েছিল ও। জল থেকে ছোট নৌকোয় ওঠাই বাঘের পক্ষে সবচেয়ে সুবিধে। বাউলে তাই বুঝেছিল বাঘটা সাঁতরে আগে ওর নৌকোতেই উঠবে। সেই কারণে ভেটকি মাছের মস্ত হাপরটার মুখের ঢাকনা খুলে সামান্য কারিকুরি করে রেখেছিল। ছইয়ের ভিতর এমনভাবে বিছানা পেতে রেখেছিল যে, দেখে মনে হবে কেউ শুয়ে আছে সেখানে। রাতে বাঘটা যথাসময়েই এসেছিল নৌকোয়। তারপর যখন বুঝল বিছানায় কেউ নেই, সব ফাঁকি, তখন অন্য নৌকো দুটো ঢেউয়ে খানিক দূরে সরে গেছে। তাতে পৌঁছোতে হলে ফের জলে নামতে হবে। তখনই ক্ষুধার্ত বাঘটার নজর পড়ল হাপরের উপরভিতরে লাফালাফি করছে বড়-বড় মাছ। মত পালটে বাঘটা এবার পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল হাপরের দিকে। বাদার বাঘ মাছেরও বড় ভক্ত। তাই মাছের লোভে হাপরের খোলা মুখ দিয়ে মাথাটা গলিয়ে দিল ভিতরে। আর সাথে সাথেই বৈকুণ্ঠ বাউলের তৈরি ফাঁদে আটকে ঝপাং করে পড়ে গেল হাপরের ভিতর। তারপরের ব্যাপারটা তো আগেই বলেছি। বৈকুণ্ঠ বাউলে অবশ্য এরপর দলের কারও কাছে গোপন রাখেনি ব্যাপারটা। তাহলে আসল সময়ে কাজটা ঠিকভাবে করা সম্ভব হত না যে।’ *
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত
*লেখকের জলে কুমির ডাঙায় বাঘ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত
সন্দেশ: অগ্রহায়ন ১৪০০


1 comment: