Sunday, 9 March 2014

ছেলেবেলার ভাললাগা গল্প (মোঃ ভাঃ): আরোগ্য (অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত)


ছেলেবেলার ভাললাগা গল্প (মোবাইল ভার্শন)

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কেউ কেউ দিব্যি লাফিয়ে ডিঙিয়ে পালিয়ে যেতে পারল। কেউ কেউ পারল না।
সরল কী করে পারবে? একে সে রুগী, তায় তার হাতে আবার জিনিসপত্র। জিনিসপত্র না থাকত কিংবা জিনিসপত্র পারত ছুঁড়ে ফেলে দিতে, তবে একবার না হয় চেষ্টা করত ছুটতে, ছিটকে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু হাত থেকে জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া যা, নিশ্বাসের সঙ্গে প্রাণটা ফেলে দেওয়াও তাই।
তা ছাড়া একটা কনস্টেবল বিশেষ করে ওকেই তাড়া করেছে। কতক্ষণ ছুটবে! জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে সারা গা।
‘হাতে কী ওসব? ম্যাজিস্ট্রেট জিগগেস করল।
বাড়িয়ে ধরল সরল। জিনিসপত্রই বটে। জিনিসের মধ্যে একটা দাগ আঁটা ওষুধের খালি শিশি। আর পত্র বলতে একটা হাসপাতালের আউটডোরের টিকিট একখানা।
‘কিন্তু ট্রেনের টিকিট কই? রুখে উঠল ম্যাজিস্ট্রেট।
‘কোথেকে কিনব? ছেড়া শার্টটা তুলে বুকের জিরজিরে কখানা পাঁজর। দেখাল সরল।
ওদিকে না তাকিয়ে মুখের দিকে তাকাল ম্যাজিস্ট্রেট। বললে, এই তো সামান্য বয়েস। কত আর হবে ? বড় জোর চোদ্দ-পনেরো। এরই মধ্যে চুরি করতে শুরু করেছিস?
‘চুরি' সরল যেন আকাশ থেকে পড়ল।
‘চুরি নয় তো কি! চুরি-জোচ্চুরি একসঙ্গে।' বললে ম্যাজিস্ট্রেট, ট্রেনের টিকিট না কেটে কোম্পানিকে ঠকিয়ে তোমার দেশবিদেশ বেড়াবার জন্যেই রেলগাড়ি করা হয়েছে—তাই না? বলে কিনা কোথেকে কিনব। কেনবার পয়সা না থাকে হেঁটে আয়। বলি, আসছিস কোত্থেকে?
‘চন্দনপুর থেকে।'
‘জায়গার নামের তো দেখি বাহার আছে। কিন্তু চন্দনপুরের লোক চন্দন না হয়ে হয়েছে দেখি কন্টিকারি।' হাসল ম্যাজিস্ট্রেট। উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে। বললে, চন্দনপুর ক মাইল হবে এখান থেকে?
‘ছ সাত মাইল।
‘ছ সাত মাইল হাঁটতে পারিস না? ম্যাজিস্ট্রেট সরলের দিকে আবার তিরস্কারের তীর ছুঁড়ল।
‘কী করে হাঁটব? হাঁটতে গেলে, পরিশ্রম করতে গেলেই কাশি ওঠে, আর কাশি উঠলেই—'
একটা কাশি আসছিল, অনেক কষ্টে তাকে যেন দমন করল সরল।
‘তা না হলে হাসপাতালে যাব কি করে? কি করে তবে রোগের চিকিৎসা হবে? দেখছেন না আউটডোরের এই টিকিট? সাত দিন অন্তর যেতে হয়। তা না হলে চলবে কেন? রোগ ভালো করতে হবে তো? কতদিন থেকে লেখাপড়া বন্ধ।’ হতাশায় মুখ ম্লান করল সরল। ‘কিন্তু কতদিন ধরেই তো যাওয়া-আসা করছি কিছুই উপকার হচ্ছে না।'
‘অসুখ হলে তো উপকার হবে। এ তো সুখ।’ কাষ্ঠমুখে মুচকে হাসল ম্যাজিস্ট্রেট। “দিব্যি বিনা টিকিটে রেলগাড়িতে হাওয়া খাওয়া।’
একটা বিচ্ছিরি কাশি উঠল সরলের। হন্তদন্ত ক্লান্ত হয়ে এক দলা গয়ার ফেলল মাটিতে। যখনই অমনি ফেলে, সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে, ঠিক দেখবে সেই সুস্পষ্টকে, অবধারিতকে। হ্যা, এখনো তাই দেখল। গয়ারের মধ্যে ঠিক রক্তের চিহ্ন।
ভীষণ বিরক্ত হল ম্যাজিস্ট্রেট। খসখস করে কাগজে তখুনি অর্ডার লিখে দিল। ‘দুই টাকা জরিমানা নয়ত এক সপ্তাহ বিন শ্রম জেল।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কোর্ট বসেছে। বিনা টিকিটে যারা রেলভ্রমণ করছে তাদের ধরে বিচার করার কোর্ট। হয় বাড়তি সমেত রেলভাড়া দিয়ে দাও, নয়তো শাস্তি ভোগ করো।
সরল কঁদ কাঁদ মুখে বললে, ‘জেলে গেলে আমি মরে যাব।’
‘বেশ, যেও না জেলে। জরিমানা দিয়ে দাও।
‘কোথায় টাকা! টাকাই যদি থাকবে, তাহলে এই দশা হবে কেন?’
ম্যাজিস্ট্রেট পরের নম্বর আসামীকে নিয়ে পড়ল। ‘তুমি কোত্থেকে?’
যতক্ষণ কোর্ট চলল আতঙ্কে মুখ কালো করে চুপচাপ বসে রইল সরল। কে তার জরিমানার টাকা দিয়ে দেবে? কেউ নেই তার আপনার লোক। এমনও কেউ নেই যে বাড়িতে গিয়ে খবর দিতে পারে তার বাবা-মাকে।
কোর্ট গুটিয়ে উঠে পড়বার আগে ম্যাজিস্ট্রেট বললে, “দ্যাখ, আমি তোকে ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু আমাকে কথা দে, আর কোন দিন বিনা টিকিটে চড়বি না ট্রেন। কি, রাজী?’ আগের অর্ডার প্রায় নাকচ করে ম্যাজিস্ট্রেট।
‘তা কি করে কথা দিই। আমাকে যে সাত দিন পর পর চিকিৎসার জন্যে আসতে হবে হাসপাতালে রেলভাড়া কি যোগাড় হবে সব দিন?’ সরলতার প্রতিমুর্তি হয়ে বললে সরল।
‘তবে গোল্লায় যা।’
কনস্টেবল সরলকে জেলে জিম্মা করে দিয়ে গেল।
সারা রাত কেশেছে, কেঁদেছে, জ্বরের ঘোরে ছটফট করেছে সরল। সকাল বেলায় ডাক্তারের কাছে খবর গেল।
ওষুধের শূন্য শিশিটা ছেড়ে আসতে হয়েছে, কিন্তু হাসপাতালের সেই টিকিটটা সরল ছাড়েনি। তাই সে বাড়িয়ে ধরল ডাক্তারের দিকে।
এক নজরেই সব বুঝতে পেরেছে ডাক্তার। জিগগেস করলে, কদ্দিনের মেয়াদ ?”
‘সাত দিন।‘
‘মোটে সাত দিন?’ মুখ বিমর্ষ করল ডাক্তার। ‘সাত দিনে কী হবে?’
তবু, সাত দিন, তার একদিনই বা ফেলা যায় কেন? ডাক্তার সরলকে জেলের হাসপাতালে ঢুকিয়ে দিল। দামী দামী ওষুধ, ইনজেকশান আর পথ্যের বন্দোবস্ত করল। ‘হ্যাঁ, যত পারিস খাবি। এ অসুখে জ্বরের মধ্যেও খেতে হয়। আর দিল শোবার জন্যে আলাদা বিছানা। ‘হ্যা, সমস্তক্ষণ শুয়ে থাকবি, বিশ্রাম করবি, একদম হাঁটাচলা করবিনে।’
সাত দিন—যেন সাত রঙে আঁকা স্বপ্নের এক রামধনু। মিলিয়ে গেল দেখতেদেখতে।
‘যাই ডাক্তারবাবু।' ছাড়া পেয়ে হাসিমুখে বললে সরল।
ডাক্তারের মুখ বিশেষ উজ্জ্বল হল না। বললে, “কেমন আছিস?’
‘দেখুন না জ্বর আর প্রায় নেই।’ হাত বাড়িয়ে দিল সরল। ‘কাশিটাও কম পড়েছে। যা ইনজেকশান দিচ্ছিলেন না, জ্বর-কাশি ভয় পেয়ে গেছে—’
‘কিন্তু সাত দিনে কী হবে?’ হতাশমুখে বললে ডাক্তার।
‘যখন একবার কমের দিকে গেছে তখন আস্তে-আস্তে সেরে উঠব এবার।’ যেন ডাক্তারকেই প্রবোধ দিচ্ছে এমনি ভাবে সরল বললে, ‘এতদিন তো ভুলেও কমের দিকে। যায়নি কখনো।’
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘কিন্তু এ কি সাত দিনের লড়াই?’
আবার বিনা টিকিটে রেলভ্রমণের দায়ে ধরা পড়েছে সরল। ‘কোখেকে আসছিস ? জিগগেস করল ম্যাজিস্ট্রেট।
‘সত্যি বলছি চন্দনপুর থেকে।’ বললে সরল।
‘দুটাকা জরিমানা নয়তো সাত দিনের অশ্ৰম জেল।’ সঙ্গে সঙ্গেই অর্ডার দিল ম্যাজিস্ট্রেট।
‘এ আমার দ্বিতীয় অপরাধ স্যার।’ হাতজোড় করল সরল। ‘সুতরাং আমার শান্তি বেশী হওয়া উচিত। প্রথমবারে আমার মোটে সাত দিনের জেল হয়েছিল। এবার অন্তত একমাসের হলে ঠিক হয়।’
হাসল ম্যাজিস্ট্রেট। বললে, ‘শাস্তির প্রকৃতি ও পরিমাণ আসামীর কথামত হবে না। কোর্ট ঠিক করবে। কম-বেশি কোর্ট বুঝবে।’
জেলে ডাক্তারকে প্রণাম করল সরল। বললে, ‘আরো সাত দিনের জন্যে এলাম।
‘মোটে সাত দিন।’ ডাক্তার উদাসীনের মত বললে, ‘সাত দিনে কী হবে।'
তবু যতটুকু হয়! যতটা ইনজেকশান দেওয়া যায়, খাওয়ানো যায় দুধ ঘি, মাছ-মাংস, আপেল-বেদানা। যতক্ষণ রাখা যায় শুইয়ে।
‘কেমন আছিস?’ ছাড়া পেয়ে যখন চলে যাচ্ছে ডাকিয়ে জিগগেস করলেন ডাক্তার।
‘জ্বর আর নেই। হয় না। শুধু কাশিটা।’
‘এ কি সাত দিনের ব্যাপার?’ অন্যদিকে মুখ ফেরাল ডাক্তার।
বিনাটিকিটে তৃতীয়বার যখন ধরা পড়ল তখন ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশ্নের উত্তরে সরল বললে, তেহট্ট থেকে আসছি। এখান থেকে তেহট্ট প্রায় তেরো মাইল, চন্দনপুর থেকে আরো ছ সাত মাইল। তবে এবার শাস্তি বেশী না দিয়ে যাও কোথা?
শান্তি বেশী হল বৈ কি। চার টাকা জরিমানা নয়তো দুই সপ্তাহের অশ্রম জেল।
‘এবার কদিন?’ জিগগেস করল ডাক্তার। ‘এবার চৌদ্দ দিন।’ সরল বীরের মত বললে।
‘এবার বাড়ল কী করে মেয়াদ ?
‘বেড়ানোর দৌড়টা বাড়িয়ে দিলাম। ছ-সাত মাইলে সাত দিন করে হচ্ছিল। এবার তেরো মাইল করে দিলাম।’ খুব একটা কৃতিত্ব করেছে এমনি ভাব দেখিয়ে, প্রায় বুক ফুলিয়ে বললে সরল। ‘আগে-আগে চন্দনপুর থেকে আসছিলাম আজ আসছি তেহট্ট থেকে।’ বলে হাসতে লাগল মুখ লুকিয়ে।
কিন্তু সে হাসির লেশটুকুও রইল না যখন দেখতে দেখতে কেটে গেল চৌদ্দ দিন।
ডাক্তার বললে, ‘খুচরো-খাচরা করে চিকিৎসা করলে কি চলে! চাই লম্বা একটানা চিকিৎসা। আর সেই সঙ্গে ঢালা বিশ্রাম। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ঘোরাঘুরি করবি, ওষুধ পথ্য আর চলবে না, যেটুকু এ ক'দিনে উন্নতি করেছিলি সব নস্যাৎ হয়ে যাবে। আবার যে রোগ সেই রোগ।
‘তবে এর উপায় কী?’ দুই চোখে অন্ধকার পুরে জিগগেস করল সরল।
‘উপায় বড়লোক কাউকে ধরে কোনো হাসপাতালে ঢুকে পড়া।’
তেমন লোক কোথায় পাব বলুন। আজকাল ভগবানও গরিবকে ছেড়েছে। আর সরকারী হাসপাতালের নমুনা তো দেখছেন, এই অসুখেও ফিভার মিকশ্চারের বেশী ব্যবস্থা নেই।’
ডাক্তার হাসল। বললে, ‘নইলে, আরেক উপায়, জেলে চলে আসা। এখানে দেখতে তো পেলে কেমন ব্যবস্থা।’
‘তাই তো দেখলাম। নিরপরাধ রুগীর চেয়ে অপরাধী রুগীর খাতির বেশী। যে পাপ করেছে সে বাঁচবে, যে পাপ করেনি সেই মরবে তিলে তিলে।' কান্না–ছলছল মুখে বেরিয়ে গেল সরল।
কিন্তু তার মুখ গর্বে ভরে গেল যখন সে দেখল ট্রেনের কামরায় প্যাসেঞ্জারের জামার পকেট থেকে মনিব্যাগটা দিব্যি সে সরাতে পেরেছে। ভেবেছিল পারবে না কিছুতেই, হাতের আঙুল আড়ষ্ট হয়ে থাকবে। কিন্তু না পারলে চলবে কেন ? তাকে রোগমুক্ত হতে হবে। আর সেই রোগমুক্তির সম্ভাবনা একমাত্র জেলে গেলে।
আনাড়ি, তাই সহজেই ধরা পড়ল সরল।
‘তুই নিয়েছিস ব্যাগ?’
সরল কোনো কথা বলল না, ব্যাগটা বার করে দিল।
কেউ কেউ মারতে লাগল সরলকে। সরল বললে, ‘ব্যাগ তো বার করে দিয়েছি, তবে আর মারছেন কেন! পুলিসে ধরিয়ে দিন। কেস করুন।’
তাতে কি আর মার থামে!
কেউ-কেউ মারের বিপক্ষে দাঁড়াল। ‘ছেলেটা তো বোকা, প্রায় সেধে ধরা দিল। নইলে ও তো হাত থেকে নীচে ফেলে দিতে পারত ব্যাগটা, এমন কি, জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দিতে পারত বাইরে।’
মার খাওয়া করুণ মুখে, তাকাল সরল। ‘আমি তো ধরা পড়তেই চাই। ধরা না পড়লে আমি জেলে যাই কী করে!’
পরের স্টেশনে পুলিসের হাতে পৌছে গেল সরল। আর এবার তার বিচার হল খোলা প্ল্যাটফর্মে নয়, পাকা ধর্মঘরে, আদালতে। শাস্তি হল তিন মাস সশ্রম কারাদণ্ড।
আনন্দে মুখ উজ্জ্বল করে, জেলে, ডাক্তারকে সরল প্রণাম করলে। বললে, ‘এবারে লম্বা মেয়াদ—তিন মাস।’
‘খুব ভালো। খুব ভালো।’ সরলের পিঠ ঠুকে দিল ডাক্তার।
‘কিন্তু এবার সশ্রম।’
‘রুগীর আবার অশ্রম সশ্রম কী! রুগী রুগী। নে, শুয়ে পড়। বিছানা তো রিজার্ভ করাই আছে। লক্ষী ছেলে।’
তিন মাসের চিকিৎসায় অনেক উন্নতি হল সরলের। ফুসফুসের ফোটো তোলা। হয়েছে, তাই তাকে বোঝাতে এল ডাক্তার। ‘এই দ্যাখ, কতটা ঘা শুকিয়ে গিয়েছে, আর শুধু এই একটুখানি আছে।’
‘আরো একটুখানি আছে! কই আমি তো কিছু বুঝি না।’
‘কী বুঝিস না?
‘যে আমার কোনো অসুখ। জ্বর নেই কাশি নেই, কেমন সুন্দর ফিরেছে শরীরটা, ওজনে বেড়েছি, হাতে-পায়ে এখন কত জোর—’
‘ভিতরের ক্ষতিটা সব সময়ে বোঝা যায় না বাইরে থেকে।’ ছেলেটার উপর কী রকম মায়া পড়ে গেছে ডাক্তারের, বললে, ‘যদি আর কটা মাস সময় পেতুম!’
ছাড়া পেয়ে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখন সরলকে ডাক্তার জিগগেস করলে, ‘কিরে, আর ক’মাসের জন্যে আসতে পারবি?
ম্লান হেসে সরল বললে, ‘দেখি।’
বাবা মা ওর চেহারা দেখে ভারি খুশী। কিন্তু মুখ ভার করে সরল বললে, ‘ডাক্তার বলে দিয়েছে দোষ কাটেনি সম্পূর্ণ। আরেকবার যেতে হবে।’
বাবা মা প্রবোধ মানল। আশীর্বাদের ভঙ্গীতে বললে, ‘ডাক্তারবাবু যখন বলেছেন তখন উপায় কি, শুনতেই হবে। যেতেই হবে তার কাছে।’
কিন্তু ধরা পড়লেই প্রথমে এক চোট মার খেতে হয়। আর যদি মারধোর এড়াতে চাও তা হলে আর ডাক্তারের কাছে পৌঁছনো হয় না।
স্টেশনে ট্রেন এসে দাড়িয়েছে, প্যাসেঞ্জাররা নামছে, তখন একজনের পকেট থেকে পার্সটা তুলে নিল সরল।
মুহূর্তে ভদ্রলোক পার্স সুদ্ধ সরলের হাত খপ করে ধরে ফেলল। সবাই মন্তব্য করল, ‘ছোঁড়াটা বোকা, হাত পাকেনি এখনো, নইলে অমনি করে ধরা পড়ে! হাত যখন ধরল তখন কে আর পার্সটা মুঠোর মধ্যে রেখে দেয়? মুঠোটা আলগা করলেই তো পড়ে যায় মাটিতে। আমি নিয়েছি তার প্রমাণ কী, নামতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে মাটিতে—এমনি কিছু বলা যায় তো স্বপক্ষে। একটা কোলাহল তো তোলা যায়!
ছেলেটা পেঁয়ো, অজবুক।
প্ল্যাটফর্মে পুলিস ছিল বলে মারটা এবার বিস্তারিত হতে পারল না। কিন্তু বিচারে শাস্তিটা গুরুতর হল। দাগী প্রমাণ হল বলে এবার জেল ছ মাস।
জেলে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সরল।
‘ভাগ্যিস দাগী ছিলি।’ ডাক্তার তাকে সংবর্ধনা করলে। বললে, ‘ও সব দাগ। দাগ নয়। তুই তো আর ইচ্ছে করে ওসব করছিস না, রোগ সারাবার উপায় হিসাবে ওসব করছিস। যখন রোগ চলে যাবে তখন ওসব দাগও চলে যাবে।’
ছয় মাস পরে দিব্যি পরিচ্ছন্ন সার্টিফিকেট দিল ডাক্তার— ‘সেরে গিয়েছিস। এই দ্যাখ ছবি।’ বাকী ঘাটুকু শুকিয়ে গিয়েছে।
‘এইবারেই তোর সম্পূর্ণ মুক্তি।’ শেষ চলে যাবার সময় ডাক্তার আবার তাকে সংবর্ধনা করল।
কিন্তু ট্রেনে উঠে ভিড়ের মধ্যে সরলের হাত নিসপিস করে উঠল। সে আনাড়ি, সে অজবুক, সে আহাম্মক। তার হাত পাকেনি, বোকা না হলে অমনি করে কি কেউ ধরা দেয়!
কই ধরুক দেখি না এখন। দিব্যি আলগোছে একজনের পকেট সে হালকা করেছে। স্টেশনে ট্রেনটা ভিড়বার আগেই নামতে পেরেছে লাফ দিয়ে।
অনেক সয়েছে সে অপবাদ। সে অপবাদের থেকেও মুক্তি চাই।
ব্যাগের মধ্যে অনেক টাকা আর কিছু কাগজপত্র। নোটে রেজকিতে মোট কত টাকা গুনতে বড় লোভ হল সরলের। আলোর একটা নিরিবিলি পোষ্ট পেয়ে তার নীচে দাড়াল।
নোটগুলো হাতে নিয়ে গুনতে যাবে অমনি একটা কাসি উঠল। মুখ কালো হয়ে গেল আতঙ্কে। কতদিন কাশির তন্তুমাত্রও ছিল না, বাষ্পমাত্রও না। তবে আবার এ এল কেন? আশ্চর্য, কাশতে কাশতে শ্লেষ্ম উঠে এল! খুক করে ফেলল মাটির উপর।
যেমন আগে–আগে দেখেছে তেমনি বুঝি আবার দেখবে সেই সুস্পষ্টকে, অবধারিতকে। সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকাল সরল। কিন্তু, না, রক্তের ছিটে ফোটাও নেই। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সরল। সত্যিই তার অসুখ সেরে গিয়েছে। সত্যিই আর তার ব্যাধি নেই।
নেই? সেরে গিয়েছে?
চুরি করা মনিব্যাগটার দিকে তাকাল সরল। এ আরেক নতুন ব্যাধি কি তাকে ধরল না? এক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে পড়ল না কি আরেক ব্যাধির কবলে? এ নতুন ব্যাধি থেকে কে তাকে ত্রাণ করবে ?
আবার কি একটা কাশি উঠছে?
না, কাশি নয়, কিছু নয়। তার সব রোগ নির্মূল হয়ে গিয়েছে।
ব্যাগের কাগজ পত্রের মধ্যে মালিকের ঠিকানা পেল। পরদিন সমস্ত টাকাটা মালিকের নামে মনিঅর্ডার করে দিল। কুপনে লিখল: ধন্যবাদ। আমার আর চুরি করার প্রয়োজন নেই।
ছবি: প্রতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (সৌজন্য: দেব সাহিত্য কুটির)

1 comment: