Wednesday, 5 March 2014

ঐতিহাসিক নিবন্ধ (মোবাইল ভাঃ): দিল্লির অশোকস্তম্ভ এবং অনুশাসন


ঐতিহাসিক নিবন্ধ (মোবাইল ভার্শন):
দিল্লির অশোকস্তম্ভ এবং অনুশাসন
শিশির বিশ্বাস
সুলতান ফিরোজ শা তুঘলকের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদশীর্ষে দিল্লি-তোপরা স্তম্ভ।
দিল্লি সুপ্রাচীন শহর। মুসলমান আমলে একটা সুদীর্ঘ সময় ছিল এদেশের রাজধানী। ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে কলকাতায় সরিয়ে আনা হলেও, ১৯১১ সাল থেকে রাজধানী ফের সেই দিল্লি। এই শহরে তাই দ্রষ্টব্য স্থানের অভাব নেই। দিল্লিতে এলে তার অনেকগুলিই ভ্রমণার্থীরা ঘুরে যান। কিন্তু প্রচারের অভাবে অনেকেই জানতে পারেন না, এই শহরে রয়েছে দুদুটি অশোকস্তম্ভ এবং একটি রক এডিক্ট বা অনুশাসন।  দিল্লির অশোকস্তম্ভ দুটির প্রথমটি দিল্লি-তোপরা স্তম্ভ নামে পরিচিত। অন্যটির নাম দিল্লি-মীরাট স্তম্ভ। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না, এদের কোনোটিই আগে দিল্লিতে ছিল না। আসলে স্তম্ভ দুটি দিল্লিতে নিয়ে আসেন সুলতান ফিরোজ শা তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮)
দিল্লি-তোপরা স্তম্ভ:
মহম্মদ বিন তুঘলকের উত্তরাধিকারী সুলতান ফিরোজ শা তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮) ফিরোজাবাদ নামে দিল্লিতে নতুন একটি নগরের পত্তন করেন ১৩৫৪ খ্রিঃ। তার আগে রাজধানী ছিল দিল্লির তুঘলকাবাদে। ফিরোজ শা তুঘলক বড়ো মাপের স্থপতি ছিলেন। যমুনা নদীর তীরে নতুন এই শহর গড়ে তুলেছিলেন মনের মতো করে। নানা মাপের বাড়ি, জমকালো রাজপ্রাসাদ, দর্শনীয় মসজিদ, মনোমুগ্ধকর বাগান, কোথাও ত্রুটি ছিল না। এই ফিরোজাবাদ নগরের ধ্বংসাবশেষের সামান্য কিছু নিদর্শন আজকের পুরোনো ও নতুন দিল্লির মাঝে বাহাদুর শা জাফর মার্গের কাছে দেখতে পাওয়া যায়।
নতুন এই নগরটিকে যখন গড়ে তোলার কাজ চলছে, সেই সময় এক সামরিক অভিযানকালে তিনি আম্বালার কাছে তোপার নামে এক স্থানে চমৎকার একটি স্তম্ভের খোঁজ পান। বেলে পাথরে তৈরি সুদীর্ঘ স্থম্ভটির পালিশ এতটাই উন্নত যে, হঠাৎ দেখলে সেটিকে ধাতুখণ্ড বলে মনে হয়। খবরটি কানে আসতে সুলতান আর দেরি করেননি। নিজেই ছুটে এসেছিলেন। স্থম্ভটি চর্মচোখে দেখে স্থপতিবিদ সুলতান বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। পাথরের গায়ে এমন উঁচু মানের পালিশ কী ভাবে সম্ভব, ভেবে পাননি। শুধু তাই নয়, স্তম্ভটিতে দুর্বোধ্য লিপিতে কয়েক লাইন লেখও রয়েছে। বিদ্যোৎসাহী সুলতান এদেশের কিছু হিন্দু পণ্ডিতকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, লিপিটি পাঠ করার জন্য। কিন্তু তাদের কেউই সেই লিপি পাঠ করতে পারেননি। কয়েকজন মত প্রকাশ করেছিলেন, স্তম্ভটি নাকি মধ্যম পাণ্ডব ভীমের গদা।
যাই হোক, সুলতান ঠিক করলেন দর্শনীয় নিদর্শনটি তিনি তার নতুন রাজধানীতে স্থাপন করবেন। সুলতানের আদেশে শুরু হল এক কঠিন কর্মকাণ্ড। মাটিতে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত ৪৩ ফুট দীর্ঘ স্তম্ভটি খুঁড়ে নির্বিঘ্নে নামানই ছিল এক কঠিন কাজ। এজন্য গোটা স্তম্ভটিকে তুলোয় ভরতি বস্তা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে অসাবধানে পড়ে গেলেও স্থম্ভটির কোনও ক্ষতি না হয়। সেকালের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এভাবে নিরাপদেই নামানো হয়েছিল স্তম্ভটিকে। তুলোর প্যাড খুলে এরপর স্তম্ভটিকে মোটা মোটা কাঁপা নলখাগড়া ঘাসে মুড়ে সযত্নে প্যাক করে চাপানো হয়েছিল ৪২ চাকার এক ঠেলাগাড়িতে। সেটি সাবধানে যমুনা নদীর ঘাট পর্যন্ত টেনে আনার জন্য কাজে লাগানো হয়েছিল ৮,৪০০ শ্রমিক। তারপর বড় এক বজরায় তুলে নদীপথে নিয়ে আসা হয়েছিল দিল্লিতে।
এই স্তম্ভটির কথা ভেবেই সুলতান ফিরোজাবাদে তার নবনির্মিত রাজপ্রাসাদে পাথরের খিলান সমন্বিত একটি মজবুত তিনতলা ইমারত তৈরি করিয়েছিলেন। বাড়িটির ছাদে একটি চতুষ্কোন বেদির উপর স্থাপন করা হয়েছিল স্তম্ভটিকে। বহুদূর থেকেও প্রাসাদশীর্ষে স্থাপিত স্তম্ভটিকে দেখতে পাওয়া যেত।
কালের পরিহাস, সুলতান ফিরোজ শা তুঘলকের সেই সাধের রাজধানীর প্রায় কিছুই আজ অবশিষ্ট নেই। পড়ে আছে কিছু ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর দেয়ালের অবশেষ। যে ইমারতের শীর্ষে স্তম্ভটিকে স্থাপন করা হয়েছিল তারও আজ জীর্ণ হতশ্রী দশা। ছাদের উপর স্তম্ভটি কিন্তু আজও আগের মতোই উজ্জ্বল। সুমসৃণ পালিশের জৌলুস এতটুকু ম্লান হয়নি।
দিল্লি-তোপরাস্তম্ভ নামে পরিচিত এই স্তম্ভের গায়ে খােদাই যে লিপি সুলতান ফিরোজ শা এদেশের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিদের দিয়ে চেষ্টা করেও পাঠোদ্ধার করাতে পারেননি, সেটি সম্ভব হল ১৮৩৭ খ্রিঃ ইংরেজ রাজকর্মচারি জেমস প্রিন্সেপ সাহেবের চেষ্টায়। কলকাতায় এসিয়াটিক সোসাইটির অফিসে। জানা গেল, খ্রি পূ ৩য় শতকের প্রাকৃত ভাষায় লিপিটিতে সম্রাট অশোকের ধর্ম সংক্রান্ত কিছু নির্দেশ ও বাণী তৎকালীন ব্রাক্ষ্মী হরফে খোদাই করা রয়েছে। একাধিকবার রয়েছে ধর্ম প্রচারার্থে নিয়ােজিত ধর্মমহামাত্র (ধংমমহামাতা) নামে রাজকর্মচারিদের কথা। সম্ভবত এখানে শুল্ক সংক্রান্ত কিছু নির্দেশও আছে। একই ধরণের অশোকস্তম্ভ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও পাওয়া গেছে। কৌতুহলী পাঠকের জন্য সেদিনের প্রাকৃত ভাষায় লেখা স্তম্ভলিপির সামান্য বিবৃত করা যেতে পারে।
দেবানং পিয় পিয়দসি লাজা হেবং আহা (দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা এরূপ আদেশ করছেন)ধম্মে সাধু (ধর্মই শ্রেষ্ট)। কিয়ং চু ধম্মে–তি (ধর্ম কী)? অপাসিনবে (পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা)। বহুকনায়ে (বহু কল্যাণকর কাজ)। দয়া দানে (দয়া ও দান)। সচে সোচয়ে (সত্যনিষ্টা ও সুচিতা রক্ষা)।…
স্তম্ভলিপির শেষ অংশে একটি কৌতুহলোদ্দীপক কথা আছে। এখানে অশোক আদেশ করছেন, যে সকল স্থানে এমন শিলাস্তম্ভ আছে, শিলাফলক আছে, সেখানে আমার এই ধর্মলিপি উৎকীর্ণ হোক, তাহলে ধর্মকথা চিরস্থায়ী হবে (ইয়ং ধংমলিবি অথ অতি সিলাথংভানি বা সিলাফলকানি তত কটবিয়া।…)
লিপির এই অংশটি সংগত কারণেই কৌতুহল সৃষ্টি করে, তবে কী স্তম্ভগুলি অশোক নির্মান করেননি? তার আগে নির্মিত? পুরোনো স্তম্ভগুলিতে তিনি তাঁর ধর্ম অনুশাসন লিপিবদ্ধ করেছিলেন মাত্র? সন্দেহের আরও কারণ আছে। আমরা জানি, কোনও শিল্পকলা হঠাৎ নয়, বহুদিন বহু মানুষের পরিশ্রমের ফসল। গুপ্ত সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় যে শিল্প শৈলি গড়ে উঠেছিল, গুপ্তযুগ অবসানের পরেও তা টিকে ছিল কয়েকশো বছর। অথচ অশোকস্তম্ভ এবং স্তম্ভশীর্ষের বৃষ, সিংহ প্রভৃতি শিল্পকলা সমৃদ্ধ মূর্তিগুলির অনুরূপ শিল্পসামগ্রী সারা দেশে সামান্যই পাওয়া গেছে। উদাহরণ স্বরুপ, গয়ার কাছে বরাবর গুহার দেয়ালের দুর্দান্ত পালিশ, পাটনার কাছে কুমরাহারে স্তম্ভগৃহের কয়েকটি ভগ্ন স্তম্ভ এবং দিদারগঞ্জের যক্ষীমুর্তির কথা উল্লেখ করা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত উঁচু মানের একটা শিল্পকলা কয়েকটি মাত্র শিল্প সৃষ্টির পর আমূল বিলীন হয়ে গেল, তাই কি সম্ভব? বিশেষজ্ঞদের বিচারে স্তম্ভ এবং স্তম্ভশীর্ষের মুর্তিগুলিতে পারসিক এবং গ্রিক শিল্পশৈলীর প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনই ভারতীয় শিল্পশৈলীর ছাপও বর্তমান। প্রাচীন পারস্যর সঙ্গে গ্রিসের যোগাযোগ বহুবিদিত। তাই পারসিক শিল্পকলায় গ্রিসের প্রভাব থাকা বিচিত্র নয়। খ্রিপূ ৫ম শতকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বড় একটা অংশ পারসিক শাসনাধীনে আসায় ওই সব অঞ্চলে সেই শিল্পকলা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পরে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের কারণে তা আরও বিস্তৃতি লাভ করে। সেই সময় মগধের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নন্দরাজা অথবা তাদের অব্যবহিত পরে মৌর্য সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকজন উঁচু মানের শিল্পীকে এদেশে আনা হয়েছিল। স্থানীয় কিছু শিল্পীর সহযোগিতায় চুনার থেকে সংগৃহীত উঁচু মানের বেলে পাথর খোদাই করে তারা এগুলি নির্মান করেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, শিল্পীরা চুনারে বসেই কাজগুলি সম্পূর্ণ করেছিলেন। কারণ চুনারে পাথরের খনির কাছে কয়েকটি অসম্পূর্ণ স্তম্ভের সন্ধান পাওয়া গেছে। স্তম্ভ এবং স্তম্ভশীর্ষগুলির কাজ এখানে সম্পূর্ণ হবার পরে সেগুলি স্থাপনের জন্য যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
দিদারগঞ্জের যক্ষীমূর্তি: 
প্রসঙ্গত বিহারের রামপূর্বার অশোকস্তম্ভর কথা উল্লেখ করা যায়। স্তম্ভশীর্ষে সিংহ মূর্তিসহ ঘণ্টাকৃতি যে বেদি ছিল (এটি বর্তমানে কলকাতার জাতীয় সংগ্রহশালায় রয়েছে), সেটিকে স্তম্ভের শীর্ষে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করার জন্য তলায় একটি মোটা তাম্ৰদণ্ড লাগানো হয়েছিল। এই তাম্রদণ্ডে মৌর্যকালীন খরোষ্টী হরফে থবে’ (স্তম্ভে) কথাটি লেখা আছে। এই লিপিকার তথা শিল্পী যে উত্তর-পশ্চিম ভারতের মানুষ, তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। কারণ ভারতের ওই অঞ্চলে তখন খরোষ্টী লিপিই প্রচলিত ছিল। ভারতের অন্য অংশে প্রচলিত ছিল ব্রাক্ষ্মী লিপি।
বর্তমান প্রতিবেদকের ধারণা, এই কাজের জন্য সম্ভবত খুব বেশি সংখ্যক শিল্পী এদেশে আসেননি। অন্য ব্যাপারে তারা স্থানীয় শিল্পীদের সাহায্য নিলেও পাথরে পালিশের কাজটি নিজেরাই করতেন। এটির কলাকৌশল স্থানীয় শিল্পীদের তারা জানতে দেননি। একান্তভাবেই গােপন রেখেছিলেন। আর তাই নন্দ আর মৌর্য শাসন অবসানের পরে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পটি এদেশে তেমন আর বিস্তার লাভ করতে পারেনি।
পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি আবার। জানা যায়, ফিরোজ শার সময়ে স্তম্ভ-শীর্ষে সাদা এবং কালোপাথরে অঙ্কিত একটি ফ্রেস্কো ছাড়াও স্তম্ভশীর্ষটি রং করা গম্বুজাকৃতি একটি তাম্র আচ্ছাদনে মোড়া ছিল। বর্তমানে এগুলির কোনও অস্তিত্ব নেই। তবে পরবর্তীকালে খোদাই করা একটি হস্তীচিত্র দেখা যায়। এছাড়া অশোকের অনুশাসনের নীচে পরবর্তীকালের দেবনাগরি অক্ষরে সংস্কৃত ভাষায় একটি লিপি খোদাই করা রয়েছে। তাতে চৌহান বংশের রাজা বিশালদেব-এর কোনও এক ম্লেচ্ছ (সম্ভবত মহম্মদ ঘোরি অথবা গজনভী) রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের কথা বলা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার, অনেক পরবর্তীকালের রাজা। বিশালদেবও তার যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব প্রচারের জন্য স্তম্ভটিকে বেছে নিয়েছিলেন।
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় মানুষ এখানে দৈত্য-দানো এবং অপদেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা জানাতে আসেন। তাদের বিশ্বাস, ভগ্ন এই প্রাসাদে অপদেবতাদের বাস। বিশ্বাসটি প্রাচীন।
দিল্লি মীরাট স্তম্ভ।
দিল্লিতে অবস্থিত দ্বিতীয় অশােকস্তম্ভটি দিল্লি-মীরাট স্তম্ভ নামে অভিহিত। দিল্লির সুলতান ফিরোজ শা তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮) এই স্তম্ভটি বর্তমান উত্তর প্রদেশের মীরাট অঞ্চল থেকে দিল্লিতে আনিয়েছিলেন। কাজটি খুব সহজ ছিল না। যেটুকু জানা যায় ৩৩ ফুট দীর্ঘ স্তম্ভটিকে ৪২ চাকার একটি গাড়িতে যমুনা নদী পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছিল। তারপর বড় একটি বজরায় চাপিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল দিল্লি নগরে। ফিরোজ শা এটিকে দিল্লির উত্তরে তার শিকারের জন্য নির্দিষ্ট প্রমোদ ভবনের কাছে স্থাপন করেছিলেন। স্থানটি বর্তমান দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় হিন্দু রাও হাসপাতালের কাছে।
দিল্লি-মীরাট স্তম্ভ।
দুর্ভাগ্য, মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ারের রাজত্বকালে (১৭১৩-১৯) এক বারুদ বিস্ফোরণে স্তম্ভটি ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছড়িয়ে থাকা স্তম্ভের খণ্ড–বিখণ্ড পাঁচটি টুকরো পরে ইংরেজ আমলে কলকাতার এসিয়াটিক সোসাইটিতে এনে রাখা হলেও পরে ১৮৬৬ খ্রিঃ ফের দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। পরে ১৮৮৭ খ্রিঃ খণ্ডগুলি জোড়া দিয়ে পুনঃস্থাপিত করা হয়।
১৭ শতকের গোড়ায় ঐতিহাসিক উইলিয়াম ফিঞ্চ স্তম্ভটির শীর্ষে অঙ্কিত একটি গোলক এবং অর্ধচন্দ্রের উপর খোদাই কিছু লিপি দেখতে পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।
অনুশাসন লিপি:
দিল্লিতে অশোক অনুশাসন সংবলিত শিলালিপিটির খোঁজ পাওয়া গেছে মাত্রই গত শতকের মধ্য পর্বে। সে ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসের কথা। দক্ষিণ দিল্লির বাহাপুর গ্রামের কাছে শ্রীনিবাসপুরি অঞ্চলে নতুন হাউসিং তৈরির বরাত পেয়েছিলেন এক ঠিকাদার। জমির মাঝে ছোট এক পাথুরে টিলা। জোর কদমে সেই পাথুরে টিলা ভাঙার কাজ চলছিল। অনেকটাই তখন ভেঙে ফেলা হয়েছে। কর্তব্যরত শ্রমিকদের হঠাৎই নজরে পড়ল টিলার মাথায় এক পাথরের গায়ে দুর্বোধ্য অক্ষরে কয়েক লাইনের এক লিপি। ভাঙতে ভাঙতে তারা তখন সেই লিপিযুক্ত পাথরটির প্রায় গায়ে পৌঁছে গেছে। ড্রিল চালিয়ে সেদিনই সেখানে ডিনামাইট স্টিক খুঁজে ব্লাস্ট করা হবে। তবু কৌতুহলী শ্রমিকের দল কাজ সাময়িক মুলতুবি রেখে উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের নজরে আনল ব্যাপারটা। সৌভাগ্যক্রমে স্থানটি দিল্লি নগর। তাই খবরটা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গোচরে আসতে দেরি হয়নি।
১৯৬৬ সালের ২৬শে মার্চ। দিল্লির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে এক অতি উল্লেখযোগ্য দিন। পাথরে খোদাই সেই লিপি দেখে সেদিন তাদের বুঝতে বাকি থাকেনি, সেটি সম্রাট অশোকের গৌন অনুশাসনগুলির (Minor rock edict) একটি।
অশোকের অনুশাসন-স্থান: দিল্লি (ছবিতেই বোঝা যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষের নজরে আসতে আর সামান্য দেরি হলেই ডিনামাইটে ধ্বংস হয়ে যেতে পারত অমূল্য নিদর্শনটি।)
ব্যাপক পর্যালোচনার পর দশ লাইনের লিপিটির পাঠ তারা প্রকাশ করলেন। সম্রাট অশোক তার এই অনুশাসনে জানাচ্ছেন, মাত্র আড়াই বছর হল তিনি উপাসক হয়েছেন। কিন্তু গোড়ার দিকে তেমন কিছু কাজ করে উঠতে পারেননি। তবে বছর খানেক হল তিনি এব্যাপারে অনেকটাই সক্রিয় হয়েছেন। এর পর শিলালিপিতে রয়েছে স্বধর্ম প্রচারে তার প্রচেষ্টার এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
প্রসঙ্গত বলা দরকার, অশোকের অনুশাসনগুলির কোনওটাই বিক্ষিপ্ত নয়। তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে লিখিত। অশোকের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের আড়াই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রচারিত তার এই অনুশাসন পাওয়া গেছে বিহারের সাসারামে, জব্বলপুরের কাছে রূপনাথ এবং রাজস্থানের জয়পুরের কাছে বৈরাট প্রভৃতি স্থানে। প্রতিটির ভাষা এবং বক্তব্য প্রায় এক।
জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রচারিত অশোকের এই অনুশাসনগুলির স্থান যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করেই নির্বাচিত হত। সন্দেহ নেই, সেই সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সদাব্যস্ত উত্তরাপথের (বর্তমান জিটি রোড) উপর এই স্থানটির যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। তাছাড়া স্থানটির গুরুত্ব ছিল অন্য একটি কারণেও। বর্তমানে জায়গাটি দিল্লির বিখ্যাত কালকাজী মন্দিরের কাছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, এই কালকা মন্দিরের কাছেই ছিল পাণ্ডবদের প্রতিষ্ঠিত একটি সুপ্রাচীন মন্দির। সেই কারণে পূণ্যার্থীদের সমাগম ছিল যথেষ্ট। স্থানটি নির্বাচনের পিছনে সম্ভবত সেটিও একটি কারণ।
ব্রাক্ষ্মীলিপি এবং প্রাকৃত ভাষা :
সব শেষে ব্রাক্ষ্মীলিপি এবং প্রাকৃত ভাষা নিয়ে দু'চার কথা। সুলতান ফিরোজ শা তুঘলক অনেক চেষ্টা করেও এদেশের পণ্ডিত ব্যক্তিদের দিয়ে যে ব্রাক্ষ্মীলিপির পাঠোদ্ধার করতে পারেননি, একসময় সেই লিপি এবং প্রাকৃত ভাষার প্রচলন ছিল সারা ভারত জুড়ে। এ দেশের সাধারণ মানুষ তখন প্রাকৃত ভাষাতেই কথা বলত। সংস্কৃত ছিল একান্তভাবেই শিক্ষিত শ্রেণীর ভাষা। এমনকী যে পরিবারে সংস্কৃত ভাষার চল ছিল, তারাও নিজেদের মধ্যেও কথা বলতে অনেক সময় অপেক্ষাকৃত সহজ প্রাকৃত ভাষাই ব্যবহার করতেন।
ব্রাহ্মী (Brahmi) হরফে প্রকৃত ভাষায় লেখা অশোকের স্তম্ভলিপি দিল্লি
এ ব্যাপারে কথাসরিৎ সাগর থেকে একটি কাহিনির সামান্য উল্লেখ করা যেতে পারে। বসন্ত উৎসব উপলক্ষে রাজা সাতবাহন রানিদের নিয়ে স্নান করছিলেন। রাজা অন্যদের গায়ে হঠাৎ জল ছেটাতে শুরু করলে এক রানি তাকে বললেন, ‘মাদোকং পরিতাড়য়।’ 
রাজা ভাবলেন, রানি মোদকং অর্থাৎ মিষ্টি খেতে চাইছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ভৃত্যদের পর্যাপ্ত মিষ্টি আনতে আদেশ করলেন। তাই শুনে রানি উপহাস করে বললেন, ‘মহারাজ আপনার দেখছি সামান্য ব্যাকরণ জ্ঞানও নেই। আপনি কি জানেন না যে, মা উদক সন্ধি করলে মোদক শব্দের উৎপত্তি হয়! আমি আপনাকে মা উদকং পরিতাড়য়অর্থাৎ আর জল ছেটাবেন না, বলতে চেয়েছিলাম। রানির এই কথায় সবার সামনে রাজা সাতবাহনের অবস্থা কি হয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়। অঞ্চলভেদে প্রাকৃত ভাষায় কিছু পরিবর্তন তথা ভিন্ন রূপ অবশ্যই ছিল। হয়তো স্থানীয় সেই প্রাকৃতর অন্য নামও ছিল। যেমন বৌদ্ধ সাহিত্যের পালি ভাষা। দুটি ভাষার মধ্যে যথেষ্টই মিল বর্তমান। যিনি পালি ভাষা জানতেন, তিনি প্রাকৃতও বুঝতে পারতেন। সম্রাট অশোক তাই তার ধর্মলিপির ব্যপক প্রচারের জন্য প্রাকৃত ভাষাই বেছে নিয়েছিলেন।
খ্রীপু ৪র্থ-৩য় শতকে প্রাকৃত ভাষায় লেখা জৈন গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা। বর্তমান গ্রন্থটি ১৬ শতকে দেবনাগরী হরফে পুনর্লিখিত।
প্রাকৃত ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত থেকেই। কথ্য ভাষা সময়ের সঙ্গে অবিরাম পরিবর্তীত হয়ে চলে। প্রাকৃতও ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে এদেশের অধিকাংশ ভাষার উৎপত্তি এই প্রাকৃত ভাষা থেকেই। মূল ভাষাটি কিন্তু প্রায় বিলুপ্ত। সৌভাগ্য, প্রাচীন জৈন ধর্মগ্রন্থের অধিকাংশ প্রাকৃত ভাষায় রচিত হওয়ায় ভাষাটি একেবারে হারিয়ে যায়নি।
সংস্কৃত ভাষা যে আজও স্বমহিমায় বর্তমান, তার কারণ, এটি মূলত সাহিত্যের ভাষা। বেদ, পুরাণ, উপনিষদ থেকে শুরু করে দুদুটি মহাকাব্য এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এই ভাষাতেই লেখা। মহাকবি কালিদাস এই ভাষাতেই তার অমর কাব্য রচনা করে গেছেন। নাট্যকার ভাস, শূদ্রক, বিশাখদত্তর মতো বিদ্বজ্জনেরা এই ভাষাতেই রচনা করে গেছেন তাদের কাল-উত্তীর্ণ নাটকাবলী। গুপ্তযুগে এক সুদীর্ঘ সময় এই ভাষা শাসকবৃন্দের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। তার উপর খ্রিঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দীতে বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ পাণিনি তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী' রচনা করে ভাষাটিকে যে শক্ত ভিতের উপর স্থাপন করেছিলেন তা আজও বর্তমান। সংস্কৃত সাহিত্যে তার এই ব্যাকরন বইটি আজও প্রামাণ্য। ভাষাটি তাই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় অবিকৃত অবস্থায়। হারিয়ে যায়নি।
তবে কী গুটি কয়েক জৈন্য গ্রন্থ ছাড়া প্রাকৃত ভাষা সুধীজনের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি? তেমন কোনও সাহিত্যও রচনা হয়নি? অনুসন্ধানের জন্য আমাদের ওই সংস্কৃত সাহিত্যের দিকে নজর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওই সংস্কৃত সাহিত্য থেকেই আমরা পাই মহাকবি গুণাঢ্য-র নাম। অনুমানিক খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে বর্তমান মহাকবি গুণাঢ্য তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বৃহৎকথা’ রচনা করেছিলেন পিশাচ’ ভাষায়। হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টর লেখা থেকে জানা যায়, সেকালে উজ্জয়িনীর মানুষ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতির সঙ্গে এই বৃহৎকথাও সাগ্রহে পাঠ করতেন। এব্যাপারে আরও ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। সুদূর কম্বােজ তথা আজকের কম্বােডিয়ায় সংস্কৃতে লেখা এক শিলালিপিতে গুনাঢ্যর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়েছে।
এতবড় একজন কবি কেন সংস্কৃত ছেড়ে পিশাচ ভাষায় তার সাহিত্য রচনা করেছিলেন? কারণ হিসেবে বলা হয়, সংস্কৃত ভাষায় যথেষ্ট জ্ঞান থাকা সত্বেও তিনি সর্ত রক্ষার খাতিরে পিশাচ ভাষায় কাব্য রচনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, কাহিনিটি একেবারেই বিশ্বাসযােগ্য নয়। সম্ভবত তাঁর রচিত গ্রন্থ যাতে সাধারণের মধ্যে জনপ্রীয় হয়, তাই দুর্বোদ্ধ সংস্কৃত ছেড়ে তিনি সাধারণের বােধগম্য অধিক প্রচলিত কোনও ভাষায় তার গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। আর সেই ভাষাটি ‘প্রাকৃতহওয়া সম্ভব। কারণ প্রাকৃতই তখন ছিল আম জনতার কথ্য ভাষা।
নাক উঁচু উচ্চ বর্ণের সুধী সমাজ আমজনতার এই কথ্য ভাষাকে ঘৃণার চোখে দেখতেন, সন্দেহ নেই। তাই হয়তাে তার নাম দিয়েছিলেন পিশাচ ভাষা। সে যাই হােক, গুনাঢ্যের অনুমান বৃথা যায়নি। তাঁর রচিত বৃহকথা তখন সাধারণের মধ্যে এত জনপ্রীয় হয়েছিল যে, সুধী সমাজের প্রয়ােজন মেটাতে অচিরে সংস্কৃত ভাষাতেও তার অনুবাদ হল। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, রাজা সাতবাহনের আদেশে কাজটি সম্পূর্ণ হয়েছিল। তিনি বৃহৎকথার উৎসাহী স্রোতা ছিলেন।
দুর্ভাগ্য, লক্ষ শ্লোক বিশিষ্ট গুনাঢ্যের বৃহৎকথা গ্রন্থটির কোনও সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি। না পিশাচ তথা প্রাকৃত ভাষায় লেখা মূল গ্রন্থ, না তার সংস্কৃত অনুবাদ। সম্ভবত গ্রন্থটির বিশাল আকার আকৃতিই তার অন্যতম কারণ। নেপালের রাজদরবারে বৃহৎকথাশ্লোকসংগ্রহনামে বৃহৎকথার একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ পাওয়া গেছে। সেই গ্রন্থ পাঠে মূলের স্বাদ মেলে না। বরং বৃহৎকথা টিকে রয়েছে অন্য দুটি গ্রন্থে। গ্রন্থটির বিপুল আকৃতি এবং জনপ্রীয়তার কথা বিবেচনা করে খ্রীস্টীয় একাদশ শতকের শেষার্ধে মূল বৃহকথা অবলম্বনে কাশ্মীরে দুটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। পণ্ডিত ক্ষেমেন্দ্র রচনা করেছিলেন বৃহৎকথামঞ্জরীএবং কাশ্মীররাজের সভাকবি সোমদেবভট্ট রচনা করেছিলেন কথাসরিৎসাগর। দুটির মধ্যে কথাসরিৎসাগর-এর পরিচিতি বেশি। দুটি গ্রন্থে সাদৃশ্য যেমন রয়েছে, বৈশাদৃশ্যও বর্তমান। তাই অনুমান করা হয়, দুই কবিই মূল গ্রন্থ অনুসরণে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার প্রয়াস করেছিলেন। তৎকালীন প্রচলিত নানা কাহিনি তথা লোককথা, জীবনযাত্রা, তাঁদের গ্রন্থে স্থান পেয়েছিল।
কাগজের পুঁথিতে খরোষ্ঠী লিপি। ২-৫ শতক। প্রাপ্তিস্থান: মধ্য এশিয়া।
নতুন এই গ্রন্থ দুটি রচিত হওয়ার পরে বিপুল আকারের পুরোনো বৃহকথার পাঠক আরও কমে গিয়েছিল সন্দেহ নেই। তবু যে গ্রন্থ কাশ্মীরে একাদশ শতকের শেষ দিকেও বর্তমান ছিল, তা এই অল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এমন বিশ্বাস করা কঠিন। অনেকেই মনে করেন বিদেশী বর্বর হানাদারের হাতে নালন্দা বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অযথা ধ্বংস না হলে শুধু বৃহৎকথাই নয় আরও বহু অমূল্য গ্রন্থের কপি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এ দেশের শিল্প সংস্কৃতি তথা ইতিহাস রচনায় বড়ো ক্ষতি হয়ে গেছে সেদিন।
তবু  বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই বিশ্বাস, অবিকৃত মূল বৃহকথা একদিন হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। এজন্য তারা মধ্য এশিয়ার উষর মরুভূমির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। মধ্য এশিয়ার ওইসব অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতি একসময় বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বালির নীচে সমাধির ভিতর, ভগ্ন বৌদ্ধ বিহারের গোপন কুঠুরিতে নির্ভেজাল সংস্কৃত প্রাকৃত ও পালি ভাষায় লেখা প্রচুর ভারতীয় পুঁথির সন্ধান মিলেছে। হয়তো কোনও একদিন একখণ্ড বৃহৎকথাও পাওয়া যাবে। আর সেই গ্রন্থটি যদি প্রাকৃত ভাষায় লেখা হয়, প্রমাণ করা যাবে, আদিতে বৃহৎকথা ওই ভাষাতেই লেখা হয়েছিল।
পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে গেছে প্রাকৃত ভাষা। কিন্তু ব্রাক্ষ্মী হরফের ক্ষেত্রে কারণটা ভিন্ন। ইউরোপে রোমান অক্ষরের বিবর্তন খুব বেশি হয়নি। তাই সুপ্রচীন গ্রিক লিপি বা প্রায় দু'হাজার বছর আগে গান্ধার অঞ্চলে ব্যাকট্রিয় রাজাদের মুদ্রার অক্ষর আমাদের কাছে নিতান্ত অপরিচিত মনে হয় না। দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশে তেমনটা ঘটেনি। তাই আজ এদেশের বিভিন্ন ভাষায় প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন লিপি। মূল ব্রাক্ষ্মী লিপি থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়েই বর্তমান বিভিন্ন ভাষার অক্ষরগুলি রূপ পেয়েছে। হারিয়ে গেছে মূল ব্রাক্ষ্মী লিপিগুলি।
দুর্ভাগ্য, সংস্কৃত ভাষার কোনও নির্দিষ্ট লিপি ছিল না। উত্তর ভারতে সংস্কৃত লেখা হত ব্রাম্মী লিপিতে। আবার গান্ধার বা বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলে ব্যবহার হত খরোষ্ঠী লিপি। যে লিপি লেখা হত বর্তমান আরবি বা উর্দুর মত ডান থেকে বাম দিকে। তক্ষশীলার কাছে জৌলিয়ান বৌদ্ধ বিহারে যে খণ্ডিত সংস্কৃত পুঁথির পাতা পাওয়া গিয়েছে, তা এই খরোষ্ঠীতে লেখা। যে মধ্য এশিয়ার কথা বলা হল, সেখানেও যে সব সংস্কৃত পুঁথি আবিস্কৃত হয়েছে, তার অধিকাংশই লেখা খরোষ্ঠী হরফে। বাংলায় পাল এবং সেন আমলের যে সব সংস্কৃত লিপি পাওয়া গেছে তা প্রাচীন বাংলা হরফে লেখা। আর তাই সংস্কৃত ভাষা টিকে গেলেও মূল ব্রাক্ষ্মী লিপি হারিয়ে গেছে।
জৌলিয়ান বিহারে বুদ্ধমূর্তির নীচে খরোষ্ঠী লিপি। ৫ম শতক।
উনবিংশ শতকের গোড়ায় হারিয়ে যাওয়া খরোষ্ঠী আর ব্রাক্ষ্মী হরফ চেনার সূচনা করেছিলেন জেমস প্রিন্সেপ সাহেব। প্রথম পাঠ করেছিলেন প্রাকৃত ভাষায় লেখা ব্রাক্ষ্মী লিপি। তারপর সময় ও স্থান ভেদে ব্রাক্ষ্মী লিপির বিভিন্ন রূপের সন্ধান মিলছে, যেগুলি অশোকের সময়ের লিপি থেকে অনেকটাই আলাদা। বিশেষজ্ঞদের সেই প্রচেষ্টা তাই থেমে নেই। আজও চলছে।
ফোটো: বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সৌজন্যে

2 comments: