Monday, 3 March 2014

গল্প (মোবাইল ভাঃ) : ভজনের কপাল


জন বেলপাহাড়ির মানুষ নয়। ওর বাড়ি ঝাড়গ্রামের ওদিকে। জমিজমা নেই। জঙ্গলে পাতা কুড়িয়ে নয়তো বাবুইঘাসের দড়ি পাকিয়ে দিন চলে। ওকে প্রতি বছর বেলপাহাড়িতে আসতে হয় অন্য এক কাজে। কলকাতার এক টুরিস্ট কোম্পানির বেলপাহাড়িতে ছোট এক হলিডে হোম আছে। বাজার থেকে মাইল কয়েক ভিতরে। চারপাশে মহুয়া, পিয়াল, সোনাঝুরি আর ঝাউয়ের মেলা। আর রয়েছে শালবন। নির্জন অরণ্য পরিবেশ। দিন কয়েক ছুটি কাটাবার জন্য চমৎকার। আসলে একসময় এটা ছোট এক বাংলো বাড়ি ছিল। হাতবদল হয়ে এখন হলিডে হোম। বাড়িটা সারা বছর প্রায় বন্ধই থাকে। মানুষের আনাগোনা শুরু হয় পুজোর সময় থেকে কয়েকটা মাস। ভজন এই সময় এখানে মালির কাজ করে। কোম্পানি থেকে একজন কেয়ারটেকারও আসে।
পুজোর দিন কয়েক আগেই তাই চলে আসতে হয় ভজনকে। ঘরদোর সাফ করে গুছিয়ে ফেলতে হয়। টুরিস্ট কোম্পানির মালিক চৌধুরী সাহেব প্রতিবছর সপরিবারে পুজোর ছুটির কয়েকটা দিন এখানে নিরিবিলিতে কাটিয়ে যান। উনি অবশ্য দিন সাতেকের বেশি থাকেন না। তিনি চলে যাওয়ার পর একে-একে অনেকেই আসতে থাকে এরপর। সারা বছরের মধ্যে এই কয়েকটা মাসই ভজনের খুশির সময়। কিছু না হোক, দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায়। এছাড়া মাইনে বাবদ পাঁচশো টাকা আর চৌধুরী সাহেবের দেওয়া একটা কাপড়। গরম পড়তে শুরু করলেই টুরিস্ট কমে আসতে থাকে। সাধারণত মার্চের মাঝামাঝি তালা পড়ে যায় হলিডে হোমে। ভজনের কাজও শেষ। গোছগাছ করে সেও যাত্রা করে বাড়ির দিকে।
সেবার তেমন টুরিস্ট না থাকায় ফেব্রুয়ারি পড়তে না পড়তেই হলিডে হোম বন্ধ হয়ে গেল। কেয়ারটেকার আগের দিনই চলে গেছে। কিন্তু ভজনের উপায় নেই। এরপর মাস কয়েক বন্ধ থাকবে বাড়ি। তাই তখনও তার অনেক কাজ। সব গুছিয়ে পরদিন ভোরের প্রথম বাস ধরবে। সব কাজ শেষ করে সেই রাত্তিরেই নিজের জিনিসপত্রগুলোও গুছিয়ে ফেলল ও। জিনিসপত্র বলতে চৌধুরী সাহেবের দেওয়া সেই নতুন ধুতি আর কিছু পুরোনো জামাকাপড়।
এগুলো বেড়াতে আসা মেমসাহেবরা ফেরার সময় দিয়ে গেছেন। কিছু বকশিশও পাওয়া যায় ওঁদের কাছ থেকে। গত কয়েক মাস ধরে ভজন সযত্নে জমিয়েছে এগুলো। এছাড়া ভাঁড়ার ঘরে শেষ সময়ে পড়ে থাকা কিছু ঝড়তিপড়তি খাবার। বাসি রুটি আর কেকের টুকরো। এছাড়া ভাঙা কিছু বিস্কুট। বাড়ির বউ ছেলেমেয়েরা এই সামান্য জিনিসগুলোর জন্য পথ চেয়ে থাকে। ভজনের কাছে তাই এসবের মূল্যও অনেক।
ভাড়ার জন্য কিছু খুচরো আলাদা করে বাকি টাকাগুলো নতুন ধুতির ভাঁজের ভিতর রেখে সাবধানে মুড়ে একটা পুঁটলি করল ভজন। খাবারগুলো আগেই ছোট এক পুঁটলিতে বেঁধে নিয়েছিল। এরপর দুটো পুঁটলি একসাথে করে বাদবাকি পুরোনো জামাকাপড়গুলো তার উপর পেঁচিয়ে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। সঙ্গে ব্যাগ নেই। জিনিসটা বগলদাবা করে নেবার পক্ষে চমৎকার। পরদিন ভোরেই বেরিয়ে পড়ল ও। পুব আকাশে সূর্য তখন ভাল করে দেখা দেয়নি। হলিডে হোমের পাশ দিয়ে সোজা পথ চলে গেছে বাজারের দিকে। দু'ধারে মহুয়া পিয়াল আর শালের বন। এই ভোরে পথে জনমানুষের চিহ্ন নেই। নির্জন পথে শুধু ভোরের পাখির কূজন।
কাপড়ের পুঁটলিটা সাবধানে বগলে চেপে বাড়ির কথা ভাবতে ভাবতে দ্রুত পথ চলছিল ভজন। হঠাৎ কাছেই ঘোঁত্ করে একটা শব্দ শুনে চমকে পাশ ফিরে তাকাল। পথের পাশে বাঁ দিকে মস্ত এক সোনাঝুরি গাছ। আওয়াজটা সেই দিকে। কিন্তু তাকিয়ে জমাট অন্ধকার ছাড়া কিছুই নজরে পড়ে না ওর। তবু খটকা যায় না। ভালুক নয়তো? আওয়াজ সেই রকম। কিন্তু এদিকে ভালুক আছে বলে শোনা যায় না। তবে এই ফাল্গুন মাস পড়লে কাছে বাঁশপাহাড়ি নয়তো কাঁকড়াঝোরের জঙ্গল থেকে মহুয়ার লোভে দু’একটা ভালুক চলে আসে কখনও। কিন্তু ফাল্গুন মাস পড়ে গেলেও এদিকে মহুয়া ফুলের মরসুম এখনও শুরু হয়নি। সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতে আরও কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ থপথপ শব্দে পিছন ফিরে তাকিয়ে যা দেখল তাতে তার আক্কেল গুড়ুম হবার জোগাড়!
আলো তখনও তেমন ফোটেনি। ফিকে অন্ধকারে ভজন পরিষ্কার দেখতে পেল কালো রঙের বিশাল এক ভালুক সেই সোনাঝুরি গাছের নীচে অন্ধকার ফুঁড়ে দু’পায়ে থপ্–থপ্ করে এগিয়ে আসছে তার দিকে। ভালুকটার ছুরির ফলার মতো দু’সার হিংস্র দাঁত আর বাড়িয়ে দেওয়া সামনের দুই পায়ের বড়বড় নখগুলো আধো অন্ধকারেও ঝকঝক করছে।
শালপাতা, কাঠ নয়তো বাবুইঘাসের খোঁজে জঙ্গলে যেতেই হয় ওদের। কিন্তু এভাবে ভালুকের সামনে কখনও পড়তে হয়নি। তাই নির্জন পথে হঠাৎ ওই দৃশ্য দেখে ভজন এমন ভয়ানক ঘাবড়ে গেল যে, ছুটে পালাবার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলল। নিথর হয়ে তাকিয়ে রইল প্রাণীটার দিকে।
এদিকে ঘোঁত্‌-ঘোঁত্‌ শব্দে ভালুকটা ততক্ষণে দু’পায়ে তার কাছে এসে পড়েছে। লম্বা নখওয়ালা নুলো দুটো যে ভাবে সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে তাতে আর একটু এগিয়ে এলেই ভজনের সঙ্গে শেষ কোলাকুলিটা সেরে ফেলতে পারবে। দারুণ আতঙ্কে ভজনের সারা শরীর হঠাৎ ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করল। দু’হাতে তুলে অন্তিম আর্তনাদ বেরিয়ে এল গলা দিয়ে।
সেই আর্তনাদ নির্জন বনপথে কিছুমাত্র আলোড়ন না তুললেও একটা ব্যাপার ঘটল। হাত উপরে তুলতেই ভজনের বগলে সেই কাপড়ের পুঁটলিটা ধুপ করে পড়ে রাস্তার ঢাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে গেল। আর মুহূর্তে ভালুকটা ভজনের সঙ্গে কোলাকুলি মুলতুবি রেখে উবু হয়ে মাটিতে পড়ে চার পায়ে বোঁ করে ছুটে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেই পুঁটলির উপর। চার পা আর মুখ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা পুঁটলিটা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ওই কাণ্ড দেখে হঠাৎ যেন ভজনের সংবিৎ ফিরে এল। মুহূর্তে পিছন ফিরে পড়ি কী মরি করে দৌড় লাগাল বাজারের দিকে। ভালুকটা অবশ্য ফিরেও তাকাল না। সে তখন নিবিষ্ট মনে পুঁটলি খুলতে ব্যস্ত। আর ভজন সেই দু’মাইল পথ এক দমে দৌড়ে হাউমাউ করে এসে পড়ল বেলপাহাড়ির বাজারের কাছে।
সেই সকালে বাজারে দু’চারজন যারা ছিল ছুটে এল। কাঁদতে কাঁদতে ভজন যা ব্যক্ত করল শুনে সকলেই বলল, কপাল জোরে আজ দারুণ বেঁচে গেছে ও! ভাগ্যিস, পুঁটলির মধ্যে খাবারগুলো ছিল। গন্ধ পেয়ে ভালুকটা তাই পুঁটলি খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। নইলে আর দেখতে হত না। গাঁয়ের মোড়ল শালকু মাঝি সেই সময় পথ দিয়ে যাচ্ছিল। অভিজ্ঞ মানুষ। শুনে মাথা নেড়ে বলল, ‘তা নয় রে বাপু। আসলে ভালুকের ওই এক অদ্ভুত অভ্যেস। সামনে কোনও কাপড়ের পুঁটলি দেখলে যতক্ষণ না সেটা ছিঁড়ে খুলতে পারছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই ওদের। ভজনের বগল থেকে পুঁটলিটা পড়ে যেতে তাই সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। নইলে ভালুকটা যে ওকে আক্রমণ করতেই আসছিল, তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। সঙ্গে পুঁটলিটা ছিল বলেই ভজন আজ কপাল জোরে বেঁচে গেছে।
কিন্তু ভজনকে সেকথা বোঝাবে কে? বেচারা পুঁটলির শোকে তখন পাগলের মতো সমানে কপাল চাপড়াচ্ছে।
ছবি: প্রশান্ত মুখোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ: সন্দেশ আষাঢ় ১৩৮৮

1 comment: