Thursday, 3 January 2019

ভাললাগা ভৌতিক গল্প (মো: ভা:): নমস্কার (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়)

ভাললাগা ভৌতিক গল্প (মোবাইল ভার্শন)
নমস্কার
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
নেক দিন বেকার বসে থাকবার পর চাকরী পেলাম। কিন্তু চাকরী যেখানে পেলাম—সে এক ভীষণ জায়গা। সহজে সেখানে বড়-একটা কেউ যায় না। আমার আগে যাঁরা গেছেন, সকলেই মরেছেন এবং সে এক আশ্চর্য মৃত্যু! রোগ নেই, ব্যাধি নেই, সারাদিন কাজকর্ম করে রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় শুয়েছেন, সকালে দেখা গেল, তিনি আর উঠছেন না, বিছানাতেই মরে পড়ে আছেন! মুখের চেহারা হয়ে গেছে কিম্ভুতকিমাকার বিশ্রী! মনে হয়, যেন মরবার সময় তিনি ভয় পেয়েছিলেন! কিন্তু কেন ভয় পেয়েছিলেন, কিসের ভয়—সে সব তখন কে আর বলবে?
আমার কিন্তু ভয় বলে কোন বস্তু ছেলেবেলা থেকেই নেই, তাই একটুখানি ভরসা হলো। ভাবলাম-চোর-ডাকাত যদি খুন করে দিয়ে যায়, সে কথা আলাদা, তাছাড়া আর-কিছুর ভয় করি না।
যাই হোক, মরি মরব; অর্থাভাবে দিনে দিনে তিলে তিলে মরার চেয়ে সে বরং ঢের ভালো।
চাকরী নিলাম। জায়গাটা বেশি দূরে নয়। বাংলা দেশের মধ্যেই। বড় একটা স্টেশনে গাড়ী বদল করে ছোট একটি ব্রাঞ্চ লাইনের ট্রেনে চড়লাম। কথা ছিল লাইন যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেইখানেই আমার কাজের জায়গা। সন্ধ্যার একটু পরেই আকাশে চাঁদ উঠেছে! শরৎকালের নীল নির্মল আকাশ। শুভ্র সুন্দর জ্যোৎস্নালোকে উদ্ভাসিত ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ ধানের মাঠ আর গাছপালার মাঝখান দিয়ে ছোট লাইনের ছোট্ট ট্রেনখানি আমাদের এগিয়ে চলেছে। দূরে দূরে একটি করে ষ্টেশন। টিমটিম করে দু'একটি কেরোসিনের বাতি জ্বলছে। দু'একজন লোক নামছে, দু'একজন উঠছে; লোকজনের কোলাহল নেই, গোলমাল নেই, দু-একটি ছোট-খাটো কথা, ইঞ্জিনের সাঁই সাঁই শব্দ আর গার্ড-সাহেবের হুইসেল।
জানালায় হাত রেখে বাইরের পানে তাকিয়ে ছিলাম। ট্রেনের যাত্রী নিয়ে গ্রামের পথে কোথাও-বা একটি গরুর গাড়ী চলেছে, কোথাও-বা আঁকাবাঁকা ছোট একটি শুকনো নদীর সাদা বালি চাঁদের আলোয় চিক চিক করছে! দুরের অস্পষ্ট গ্রাম ধোঁয়ার মত কুয়াশায় ঢেকে গেছে, লাইনের ধারে ধারে শুভ্র সুন্দর কাশের গুচ্ছ বাতাসে দুলছে, মাঝে-মাঝে দূরের গ্রাম থেকে কুকুরের ডাক।
গাড়ী আমাদের কখনও দাঁড়াচ্ছে, কখনও চলছে।
তারই মধ্যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম যখন ভাঙলো, চেয়ে দেখি, কামরা একেবারে ফাঁকা। যাঁরা ছিলেন, কখন যে তাঁরা নেমে গেছেন, কিছু বুঝতেই পারি নি। পেছনে পায়ের শব্দ হ'তেই ফিরে দেখলাম আপাদমস্তক সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে কালোমতো প্রকাণ্ড লম্বা এক ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। কেন আসছেন বুঝলাম না। সে রকম লম্বা মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। কাছে আসতেই আমি তাঁর মুখের পানে তাকালাম। কালো কিম্ভূতকিমাকার সে এক অদ্ভুত মুখ। মানুষের মুখে বলে মনে হয় না। ঠিক যেন ছাগলের মত। এক-একটা পাঁঠার যেমন দাড়ি থাকে তেমনি দাড়ি গোঁফগুলি একটি একটি করে গোনা যায়! আর সেই কালো মুখের ওপর অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল গোল-গোল সাদা দুটো চোখ!
চোখে ঘুমের ঘোর যদি-বা একটু ছিল, লোকটাকে আমার সমুখের বেঞ্চে বসতে দেখে সেটুকুও উড়ে গেল!
কারও মুখে কোনও কথা নেই! শেষে তিনিই আমায় দয়া করে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাওয়া হবে?
গলার আওয়াজও তেমনি! মনে হলো, যেন হাঁড়ির ভেতর থেকে বেরোচ্ছে। বললাম, শালবনি। তিনি বললেন, ‘চলুন, আমিও যাব!’
বাধিত হলাম।
চাকরির জায়গায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই এই!
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি শালবনিতেই থাকেন?’
ঘাড় নেড়ে জানালেন, 'না!’
কোথায় থাকা হয়, সেকথা জিজ্ঞাসা করবার সাহস হলো না। বললাম, ‘সিমসন, কোম্পানীর যে লোহার কারখানাটা তৈরি হচ্ছে, ষ্টেশন থেকে সেটা কত দূরে মশাই?’
‘কাছেই।’
শুনে আশ্বস্ত হলাম।
বললাম, ‘আচ্ছা বলতে পারেন মশাই, শুনছি নাকি তিন-চারজন লোক সেখানে মারা গেছে? কেন মারা গেছে, জানেন আপনি?’
তিনি তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েছেন। কোনও জবাব পেলাম না। সর্বনাশ! তবে কি এইখান থেকেই সঙ্গ নিলেন নাকি? শালবনি ষ্টেশন আর কত দূরে সেই কথাই ভাবতে লাগলাম।
দেখতে দেখতে ট্রেনের গতি মন্থর হয়ে এলো।
ভদ্রলোক এতক্ষণ পরে আমার দিকে মুখ ফেরালেন। বললেন, কারখানায় চাকরী নিয়ে এলেন বুঝি?
বললাম, ‘কি আর করি মশাই, পেটের দায়ে......দু'তিনটি ছেলেমেয়ে।’
তিনি বললেন, ‘যদি মারা যান?’
সেকথা নিজেও কতবার ভেবেছি, কিন্তু তাঁর মুখ থেকে হঠাৎ এই কথাটা শোনামাত্র বুকের ভেতরটা কেমন ধ্বক্ করে উঠলো। বললাম, ‘তাহলে না খেতে পেয়ে সবাই মারা যাবে।’
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলেমেয়ে ক’টি ?’
‘তিনটি। দুটি ছেলে, একটি মেয়ে।’
‘সংসারে আর কে আছে?’
‘বুড়ো বাবা, মা, পিসী, মাসী, ভাগনে, ভাগনী পোষ্যের অন্ত নেই মশাই!’
‘হুঁ’ বলে তিনি একবার বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে কি যেন দেখলেন! তারপর বললেন, ‘বুড়ো মা-বাপকে খেতে দেওয়া ভালো! আজকাল অনেকে দেয় না। আমিও বুড়ো হয়েছিলাম মশাই, কিন্তু এমনি পাজি ছেলে…’
বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন, ‘ষ্টেশন এসে গেছে।’
গাড়ী কিন্তু তখনও থামে নি। তাঁর জীবনের গল্পটা শোনার কৌতূহল হলো। বললাম, 'বসুন না! গাড়ী তো আর এগোবে না।’
পকেট থেকে একটা বিড়ি আর দেশলাইটা বের করে এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘খান।’
ভাবলাম, তাতেও যদি বসে তাঁর জীবনের গল্পটা বলেন! কিন্তু বিড়ি–দেশলাই তিনি হাত বাড়িয়ে নিলেন মাত্র, দেশলাই জ্বাললেন না, বিড়িও খেলেন না।
ইতিমধ্যে গাড়ী আমাদের ষ্টেশনে পৌঁছে যেতেই তিনি দরজা খুলে নেমে পড়লেন। যাবার সময় একটা নমস্কার করে বিদায় নেওয়া দূরে থাক, আমার দেশলাইটাও ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন না!
তৎক্ষণাৎ আমি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম। তিনি ঠিক কোন দিকে যান দেখবার উদ্দেশ্যও যে ছিল না, তা নয় তবে অন্য প্রয়োজনও ছিল। আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যাবার জন্যে কারখানা থেকে লোক আসবার কথা।
কিন্তু অবাক কাণ্ড! দরজার কাছে গিয়ে দেখি গাড়ীর গতি কমে এলেও তখনও প্ল্যাটফর্মে পৌঁছোয়নি! লোকটি কি তবে টিকিট করে নি? টিকিট দেবার ভয়ে তাড়াতাড়ি নেবে গেল? কিন্তু অত বড় লম্বা চেহারা সহজে তো চোখের আড়াল হবার যো নেই! জ্যোৎস্নার আলোয় চারিদিক, ঠিক দিনের মত স্পষ্ট পরিষ্কার, অথচ এদিক-ওদিক, তাকিয়ে কোনদিকেই তাঁকে দেখতে পেলাম না! মানুষ বলে মনে-মনে যদিই-বা একটুখানি সন্দেহ হয়েছিল, সেটুকুও এবার ঘুচে গেল। মানুষ কখনও এত সহজে চোখের সমুখ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না!
বুকের ভেতরটা কেমন করতে লাগল! একে আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত নতুন জায়গা, তায় আবার পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই এই অভিজ্ঞতা! পেটের দায়ে চাকরী করতে এসে কি যে অদৃষ্টে আছে কে জানে?
কারখানা থেকে দু’জন গোর্খা চাপরাশী এসেছে, আর একজন বাঙ্গালী ভদ্রলোক। গাড়ী থেকে আমার জিনিসপত্র তারাই নামালো।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে একবার চারিদিকে চেয়ে দেখলাম। যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু শালের জঙ্গল। ছোট কয়েকটি পাহাড়।
ট্রেনের লাইন এইখানে এসেই শেষ হয়েছে। গাড়ীতে ওঠবার সময় লক্ষ্য করি নি, এখন দেখলাম ট্রেনের দুই দিকে দুটো ইঞ্জিন লাগানো। একটা সামনে, একটা পিছনে। খানিক থেমেই গাড়ীটা যেদিক থেকে এসেছিল, হুস হুস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ফের সেই দিকেই চলে গেল।
চারিদিক নির্জন! মাঝখানে ইস্পাতের ঝকঝকে লাইন চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে, এপাশে ছোট্ট একটি স্টেশন, আর ওপাশে আমাদের কারখানা। কারখানা হ'তে তখনও অনেক দেরি। প্রকাণ্ড বড় বড় লোহার যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছেছে। অনেকটা জায়গা জুড়ে নানান রকমের লোহালক্কড় ইতস্ততঃ ছড়ানো, আর তারই একপাশে আমাদের থাকবার জন্যে টিনের ছোট কয়েকটি অস্থায়ী ঘর।
শুনলাম ওই টিনের ঘরেই নাকি আমার আগে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের জীবনলীলার অবসান হয়ে গেছে। তবু, সে-রাত্রির মত আমাকে সেইখানেই থাকতে হলো।
বাঙ্গালী ছোকরাটি জাতিতে ব্রাহ্মণ, আমার জন্যে সে রান্না করে রেখেছিল। ঠিক হলো সে-ই রোজ আমার রান্না করে দেবে। সেদিন রাত্রে তাকে আর আমার কাছ ছেড়ে যেতে দিলাম না। খাওয়া-দাওয়ার পর সে আমারই কাছে ছোট্ট একটি বিছানা বিছিয়ে শুয়ে রইলো। কাছাকাছি কোন একটা গ্রামে তার বাড়ী। নাম—যতীন।
যতীন কথা বলতে ওস্তাদ মানুষ। সেই অল্প সময়ের মধ্যেই সে জানিয়ে দিল, এখানে সবাই খুন হয়েছে গেছো ভূতের হাতে। তবে আমার নাকি ভাবনা নেই। ভূত বামুন মানুষকে মারে না। আগের কেউ বামুন ছিল না তাই বেঘোরে মরতে হয়েছে। সেও যে আজ রাতে থেকে যেতে রাজি তা ওই বামুন হবার কারণেই।
বলা বাহুল্য যতীনের কথায় খুব যে ভরসা পেলাম এমন নয়।
রাত্রে ভাল ঘুম হলো না। অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তখন সবে সূর্যোদয় হচ্ছে। পৰ্বদিকে সবুজ বনের মাথার উপর আকাশটা লাল হয়ে উঠেছে। মিষ্টি মিষ্টি হাওয়া বইছে। জায়গাটি বড় চমৎকার!
আমায় বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখেই গোর্খা চাপরাশী দু’জন সেলাম করে কাছে এসে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলে, কাজ আরম্ভ হবে কি না এবং তা যদি হয়, তাহলে ওরা আশ-পাশের গ্রাম থেকে লোক ডাকতে যাবে।
বললাম, ‘যাও, তোমরা লোক নিয়ে এসো। কাজ আরম্ভ হবে।’
এখন আমাদের কাজ শুধু, জঙ্গলের গাছ কাটা। কোম্পানী তার জন্যে আমার সঙ্গে দিয়েছে একশ টাকা। তা ছাড়া, টাকার দরকার হলেই হয় হেড-আপিসে জানাতে হবে, আর না হয় এখানকার জংশন স্টেশনে কোম্পানীর যে চুনের কারখানা আছে, সেখানে জানালেই তারা তৎক্ষণাৎ টাকা পাঠিয়ে দেবে। আমার ওপর হুকুম এক মাসের মধ্যে অন্ততঃ হাজার বিঘে জমি সাফ করে ফেলা চাই। চাপরাশীদের বলে দিলাম, ‘লোক তোমরা যত বেশি পারো নিয়ে এসো।’
তারা লোক আনতে চলে গেল।
ভাবলাম, আমার একমাত্র প্রতিবেশী ষ্টেশন-মাষ্টারের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়টা ক'রে আসি। কিন্তু এত সকালে ভদ্রলোক ঘুম থেকে উঠেছেন কি না, কে জানে? একটু পরেই যাওয়া যাবে ভেবে, পায়ে-চলা যে সরু, পথটি জঙ্গলের ভেতর গিয়ে ঢুকেছে, সেই পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। দু'পাশে শাল আর মহুয়ার ছোটবড় নানা রকমের গাছ সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখি, শাখা-প্রশাখায়, চিকণ কচি লতায়-পল্লবে ক্রমশঃ তারা এমনিভাবে ঘন সন্নিবদ্ধ যে, বেশিদূর দৃষ্টি চলে না। যেদিকে তাকাই শুধু, গাছ আর পাতা, পাতা আর গাছ। মৃদুমন্দ বাতাসে পাতাগুলি ঝির ঝির করে কাঁপছে, নানারকমের অসংখ্য পাখী উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। কোথায় হয়ত কোন বুনো গাছে বুনো ফুল ফুটেছে; তারই মিষ্টি সুগন্ধে বাতাস যেন ভরে আছে। চিত্র-বিচিত্রিত চমৎকার একটি প্রজাপতি উড়তে উড়তে হঠাৎ আমার গায়ে এসে বসলো। ইচ্ছে করলেই তাকে আমি ধরতে পারতাম, কিন্তু ধরলাম না। হাতটি আমার চোখের কাছে এনে যেই তাকে ভাল করে দেখতে গেলাম, রঙিন পাখা উড়িয়ে তৎক্ষণাৎ সে আমার হাতের ওপর থেকে উড়ে পালালো। ছায়া শীতল স্নিগ্ধ সেই অরণ্যের মাঝখান দিয়ে মনের আনন্দে অন্যমনস্ক হয়ে অনেক দূরে গিয়ে পড়েছিলাম, পেছনে হঠাৎ একটা ট্রেনের শব্দে যেন আমার চৈতন্য হলো! এবার ফিরতে হবে। ফেরার পথে যতই আমি সেই সতেজ সবুজ গাছগুলির পানে তাকাই, ততই আমার মনে হ'তে থাকে,—আমি যেন ওদের পরম শত্রু! কতকাল ধরে এরা এইখানে এই ধরিত্রী মাতার বুকের ওপর সযত্নপালিত সন্তানের মত ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে, বিশ্বের বিস্ময় প্রাণবন্ত এই সব বিশাল মহীরুহ আমি এসেছি তাদের সমূলে উৎপাটিত ক'রে সবংশে নিধন করে দিতে! নিবিড় ঘন অরণ্যানীর নয়ন-মনোহর এই স্নিগ্ধ শ্যাম রূপ আমায় নিশ্চিহ্ন করে মুছে দিতে হবে, তার পরিবর্তে বসবে এখানে এক বিরাট কারখানা! লোহা আর ইস্পাত, ইঞ্জিন আর আগুন। আমার আগে যাঁরা এলেন, নিজের জীবন দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের প্রায়শ্চিত্ত ক'রে গেলেন কি না, তাই বা কে জানে!
ট্রেন এসেছে, আবার চলেও গেছে। ষ্টেশন-মাষ্টার বসে বসে একটা মোটা খাতায় কি যেন লিখছিলেন! মোটা-সোটা, বেঁটে-খাটো মানুষটি। পরিচয় হতেই মুখখানি তাঁর আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। খাতা বন্ধ করে গল্প জুড়ে দিলেন।
বললাম, ‘কাজ করুন।’
তিনি বললেন, ‘রাখুন কাজ! মানুষের মুখ দেখতে পাই না মশাই, দুটো কথা বলে যে সুখ হবে, এই পাণ্ডববর্জিত দেশে তার উপায় নেই! দিন না-মশাই চটপট ওই গাছগুলোকে কেটে উড়িয়ে! তবু, একটা কারখানা-টারখানা হবে, সহর বসবে, বাজার বসবে, লোকজন দেখতে পাব।'
বললাম, ‘কিন্তু ওই গাছ কাটতে গিয়েই শুনছি, আমার আগে তিন-তিনজন…’
কথাটাকে তিনি আর শেষ করতে দিলেন না। টেবিল চাপড়ে চীৎকার করে বলে উঠলেন, ‘আরে দূর দূর! আমি বিশ্বাস করি না মশাই। ভূত না আরও কিছু! ভূত না হয় মেরেই দিয়ে গেল, কিন্তু টাকাকড়িগুলো গেল কোথায়? সেগুলোও কি ভূতে নিয়ে গেল?’
কথাটা ভাল বুঝতে পারলাম না, তাই তাঁকে আর একবার ভাল করে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ‘হলফ করে বলতে পারি মশাই ভূত নয় ওনারা খুন হয়েছেন মানুষের হাতে। মজুরদের পেমেন্টের টাকা ওনাদের কাছে থাকতো, সেই টাকার লোভে কেউ তাদের খুন করেছে! আমার তো ওই গোর্খা চাপারাশী দুটোকে বিশ্বাস হয় না। নেশায় সারাদিন বুঁদ হয়ে থাকে। একটুও সুবিধার মনে হয় না।’
মাস্টারবাবুর সঙ্গে গল্প করতে এসে চিন্তা যেন বাড়ল আরও। মাথা নেড়ে বললাম ‘কি জানি মশাই, কি করব, তাই ভাবছি।’
মাষ্টারমশাই-এর টেলিগ্রাফ এসেছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। টেলিগ্রাফের কলটার কাছে গিয়ে টক্ টক্‌, ক'রে কলটা বার কতক বাজিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বলছি দাঁড়ান! আপনার আগে যে লোকটা এসেছিল, তাকেও বলেছিলাম; কিন্তু সে হিন্দুস্থানী, বাঙ্গালীর কথা শুনলে না, ভাবলে বুঝি আমি ওর টাকাগুলো বাগাবার মতলবে আছি।’
‘টাকাকড়ি নিজের কাছে রাখবেন না দাদা।’ খানিক বাদে কাজ শেষ স্টেশন মাস্টার ফিরে এসে স্টেশন-ঘরের দেওয়ালের গায়ে-লাগানো একটা আয়রণ সেফ দেখিয়ে বললেন ‘ভাল কথা শিখিয়ে দিচ্ছি, টাকা ওই সিন্দুকে রাখতে পারেন। পরের টাকা ওখানে রাখতে অবশ্য আমি দিতাম না, কিন্তু আপনি বাঙ্গালী তাই বলছি। একবার রেখে দেখুন দেখি কি হয়। রাত দশটায় শেষ ট্রেন পার করে দিয়ে আমি বাসায় চলে যাই, চাবিও সঙ্গে নিয়ে যাই। আপনি ইচ্ছে করলে রাত্রে এখানে এসেও শুতে পারেন। বেশ করে দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়ে এই টেবিলের ওপর তোফা আরামে ঘুমোতে পারবেন। দেখি ভূতে কেমন ক'রে মারে?”
খাবার জোগাড় করবার জন্যে যতীন আমার কাছে টাকা চাইতে এলে, টাকা দিয়ে বললাম, রাত্রে আমি এইখানে থাকব যতীন।
যতীন হেসে বললে, ‘বুঝতে পেরেছি, ভয় পেয়েছেন। কিন্তু দিব্যি দিয়ে বলছি ভূত আপনার ক্ষতি করতে পারত না।’
গোর্খা চাপরাশী রামলাল আর শিউশরণ কাজের লোক। গাছ কাটবার জন্যে প্রায় পঞ্চাশ জন কুলি তারা ধরে নিয়ে এলো। একশ’ টাকা আর কতক্ষণ! দিনের শেষে কুলিদের মজুরি দিতে গিয়ে দেখি-অনেকখানি জায়গা তারা পরিষ্কার করে ফেলেছে।
রামলাল বললে, 'বাবু, হেট-আপিসে বহুট রপেয়া মাঙ্গায় লেন।’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কাজ কি তাহলে এতদিন হয়নি রামলাল?’
‘ঠোড়া ঠোড়া হয়েছে বাবু!’
শিউশরণ রামলালের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বললে, ‘উ বাবুলোক বহুট, রুপেয়া চুরি করিয়েসে বাবু!’
তা হয়ত হবে। কিন্তু সেটা তাদের কাজে লাগেনি। টাকা তো যমের বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছোয় না! যাই হোক সেইদিনই হেড-আপিসে তার ক'রে দিলাম একসঙ্গে মোটা রকমের কিছু টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হোক, নইলে কাজের ভারি অসুবিধা হবে।
কিন্তু টাকা আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেল। আমার আগে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরাও হয়ত’ এমনি করে টাকা নিয়েছেন, কিন্তু কাজ বেশিদূর এগোয়নি। অথচ টাকার হিসেব না দিয়েই তাঁরা মরে গেছেন। এমনি করে কোম্পানীর অনেক টাকা ক্ষতি হয়েছে। তাই টাকা না এসে কলকাতার হেড-আপিস থেকে এলেন একজন ইন্সপেক্টর।
কাজ দেখে তিনি খুশী হলেন। অসংখ্য গাছ তখন আমি কাটিয়ে স্তূপাকার করে ফেলেছি। বনের শ্যামল শ্ৰী একেবারে নির্মমভাবে নষ্ট করে দিয়ে অনেকটা জায়গা ফাঁকা করে দিয়েছি। কিন্তু কুলিরা বেতন পায়নি প্রায় সপ্তাহ খানেকের, তারা আমায় তখন ছিঁড়ে খাচ্ছে। বললাম, ‘টাকা আপনি গিয়েই পাঠিয়ে দেবেন, নইলে কাজ হয়ত আমার বন্ধ করে দিতে হবে।’
ইন্সপেক্টর বললেন, ‘এক হাজার টাকা পরশুই পৌঁছে যাবে। ফুরিয়ে যাবার আগেই জানাবেন।’
তাঁকে আমি ট্রেনে চড়িয়ে দিয়ে এলাম। শিউশরণ আমার সঙ্গে গিয়েছিল। ফেরবার পথে শিউশরণ বললে, ‘আরও বেশী টাকা মাঙ্গায় লেন বাবু, এক হাজার টাকা আর কোতোদিন যাবে!’
শিউশরণ ভুল বলেনি। কিন্তু উত্তর দিলাম না। দুটো দিন জোর কদমে কাজ হল। সাহসও বেড়েছে কিছু। যতীনকে বলেই ফেললাম ‘কী যতীন, বড় গাছ তো প্রায় সবই কেটে ফেললাম। ভূতের দেখা তো মিলল না!’
যতীন হেসে জবাব বলল, ‘সে তো বাবু আগেই বলেছি। ভূত আপনার ক্ষতি করতে পারবে না।’
‘তাই তো দেখছি। তোমার কথা গোড়ায় কিন্তু বিশ্বাস হয়নি।’
যতীন বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার ও-সব অনেক জানা আছে।’
রাত্রে খেতে বসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভূত তুমি নিজে কোনোদিন দেখেছ যতীন?
যতীন বললে, ‘তা, আজ্ঞে, দেখেছি বই কি!’
এই বলে সে তার ভূত-দেখার গল্প আরম্ভ করলে। এমন গল্প যে, সে আর সহজে থামতে চায় না। এদিকে রাত্রির শেষ-গাড়ীটা তখন ষ্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ীটা ছেড়ে গেলেই ষ্টেশন-মাষ্টার বাসায় চলে যাবেন। তার আগেই আমার সেখানে যাওয়া দরকার। সেখানেই শোবার ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে যতীনকে বললাম, 'বাকিটা কাল শুনব যতীন, আজ থাক।’
কিন্তু এমনি তার গল্প বলবার সখ যে, সে শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে ষ্টেশন পর্যন্ত গল্প বলতে বলতে এল!
গাড়ী চলে গেছে, মাষ্টারমশাই তখন বসে আছেন দেখে বললাম, ‘এবার আপনি যেতে পারেন!’
তিনি বললেন, ‘যাব কি মশাই, জংশন থেকে তার এলো, আপনার এক হাজার টাকা নিয়ে লোক আসছে।’
‘কেমন ক'রে আসবে? গাড়ীতো তো চলে গেল!’
তিনি ঈষৎ হেসে বললেন, ‘একি আর আপনার-আমার কাজ মশাই, অত বড় সায়েব-কোম্পানীর কাজ,খাতির কত! জংশন থেকে একখানা পাইলট ইঞ্জিন দিয়েছে, তাইতেই লোক আপনার এলো বলে!’
যতীন বললে, ‘তাহলে এই অবসরে গল্পটা বলে ফেলি বাবু।’
যতীনের গল্প শেষ হবার আগেই হুশ–হুশ শব্দে ইঞ্জিন এসে দাঁড়ালো! ইঞ্জিন থেকে নামলো এক সাহেব। এক হাজার টাকা অন্য কারও হাতে পাঠাতে হয়ত বিশ্বাস হয়নি, তাই চুনের কারখানার ছোট সাহেব নিজেই এসেছেন।’
টাকা দিয়ে রসিদ লিখিয়ে নিয়ে সাহেব সেই ইঞ্জিনেই ফিরে গেলেন আবার।
টাকাগুলো লোহার সিন্দুকে বন্ধ করে মাষ্টারমশাই বিদায় নিতে যতীন বললে, 'আমিও তাহ'লে আসি বাবু! আপনি শুয়ে পড়ুন।’
বললাম, ‘যাও।’
যতীন চলে যেতে দরজা-জানালা বন্ধ করছিলাম, সে ফিরে এসে বললে, ‘অত অত টাকা এলো, আপনি একা থাকবেন বাবু! গোর্খা দু’জনকে পাঠিয়ে দেব?’
ঘাড় নেড়ে মানা করে দিলাম। যতীন চলে গেল।
দরজা-জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়ে ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকলে দম আমার বন্ধ হয়ে আসে। সেদিনও তাই একটা জানালা খুলে রাখলাম। রেল-ষ্টেশনের জানালা, খুলে রাখা মানে সবই খোলা। ইচ্ছে করলে ও-পাশ থেকে টপকে যে-কেউ এসে ঘরে ঢুকতে পারে। তা আসুক। টাকা দেয়ালের সঙ্গে গাঁথা লোহার সিন্দুকে। কী আর করতে পারবে? আর ভূত যদি আসে, তাদের ত’ শুনেছি সর্বত্রই অবাধ গতি। তাদের কাছে সিন্ধুক খোলাই বা কী, আর বন্ধই বা কী! তারা অবশ্য টাকা নিতে আসে না। তাছাড়া, এলে এতদিন আসতো। এখনও যখন আসেনি, তখন সম্ভবত আর আসবে না।
এমনি সব নানান কথা ভাবছি, আর সেই খোলা জানালার পানে তাকিয়ে আছি। আকাশে চাঁদ উঠেছে। দিনের মত পরিষ্কার জ্যোৎস্নার আলো জানালার পথে ঘরে এসে পড়েছে।
ভাবতে ভাবতে কতক্ষণ পরে জানি না, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, কাপড় দিয়ে কে যেন আমার মুখখানা চেপে ধরেছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল, জেগে দেখি, সত্যিই তাই। হাত তুলতে গিয়ে দেখি, হাত দুটো দড়ি দিয়ে বাঁধা, পায়ের অবস্থাও তাই। ঘুমের ঘোরে কখন যে এমন করে আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, কিছুই বুঝতে পারিনি! কথা কইবার উপায় নেই। দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে। অথচ চোখ দুটো খোলা। জানালার পথে যে জ্যোৎস্নার আলো ঘরে এসে পড়েছে, তাতে শুধু, সেই জায়গাটাই দেখা যায়। যে-লোকটা আমার মুখে কাপড় চাপা দিয়ে সজোরে বেঁধে ফেলছে, তাকে আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু চিনবার উপায় নেই। মুখ খুলতে পারছি না। কোনো রকমে অস্পষ্টভাবে গোঁ গোঁ করে বললাম, ‘টাকা নিয়ে যাও, কিন্তু আমায় তোমরা মেরে যেয়ো বাবা!’
ওদিকে আমার মাথার পেছনে দেওয়ালের গায়ে সিন্দুক খোলার শব্দ পেলাম। আর করি কি! মড়ার মত চুপ ক'রে পড়ে আছি। মৃত্যু অনিবার্য। এতক্ষণে বুঝলাম, আমার আগে যারা গেছে তারাও ঠিক এমনি করেই গেছে। বুকের ভেতরটা ধক ধক করছে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে যে কি ভীষণ অবস্থা, তা আমি লিখে বোঝাতে পারব না! চোখের সমুখে আমার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে তিনটির কচি মুখ ভেসে উঠলো, আমার স্ত্রীর কথা মনে হলো। হায় হায়, কেন আমি তাদের ছেড়ে এখানে এলাম। চোখ দিয়ে আমার দর দর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। হে ভগবান! এরা যেন আমায় প্রাণে না মারে। বেঁচে যদি থাকি ত’ কালই আমি এ চাকরীতে ইস্তফা দিয়ে চলে যাব। টাকাগুলো মাথার কাছে ঝন ঝন করে উঠলো। থলেটা তাহলে ওরা বের করে ফেলেছে!
এমন সময় মনে হলো জানালার পথে আর-একটা লোক যেন ঘরের মধ্যে লাফিয়ে পড়লো! চোখের জলে দৃষ্টি তখন আমার ঝাপসা হয়ে এসেছে, তবু যেন মনে হলো, আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা প্রকাণ্ড লম্বা সেই লোকটা যাকে আমি প্রথম দিন ট্রেনে দেখেছিলাম।
গলাটা তখন কে যেন আমার দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছে! মৃত্যু সন্নিকটে।
কিন্তু অবাক কাণ্ড! মরতে মরতে আমি যেন বেঁচে গেলাম! লোকটা আমার গলা ছেড়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে কার সঙ্গে যেন হাতাহাতি শুরু, করে দিয়েছে।
তার পরেই ভীষণ শব্দ! সেই সঙ্গে আর্ত চীৎকার! মানুষ মরবার সময় যেভাবে চীৎকার করে, এও যেন ঠিক তেমনি! কণ্ঠস্বর শুনে চিনতে পারলাম, এ আমার গোর্খা চাপরাশী রামলাল!
মারামারি কিন্তু তখনও থামেনি। টাকার থলেটা মনে হলো একবার ঝন্–ঝন, করে মেঝেতে পড়ে গেল। তারপর কে যেন জানালা টপকে বাইরে বেরিয়ে গেল! তার পিছু-পিছু আর একজন! বাইরেও শব্দ হতে লাগলো। নিরুপায় ও অসহায় অবস্থায় আমি শুধু, মড়ার মত সেইখানে চুপ করে পড়ে রইলাম।
খানিক পরে সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল!
কি যে হলো, কিছুই ভাল বুঝতে পারলাম না। তখনও বুকের ভেতরটা আমার কেমন যেন করছে! যে-কোন মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারে, সে কথাই ভাবছি।
এমন সময় ঝক্–ঝক্‌ শব্দ করতে করতে স্টেশনে একখানা ইঞ্জিন এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো পায়ের শব্দ! বন্ধ দরজায় ঘা পড়তে লাগলো। কিন্তু কে খুলবে? আমার তো ওঠবার উপায় নেই। মুখখানা টেনে বাঁধা! কথাও বলতে পারছি না।
পায়ের শব্দ ঘরে এদিকের খোলা জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো। একজন সাহেব জানালা টপকে ঘরে ঢুকে দরজা খুলে দিলেন। ঘরে আলো জ্বালা হলো।
জংশন থেকে তাঁরা ইঞ্জিনে চড়ে চারজন এসেছেন। কোয়ার্টার থেকে ষ্টেশন-মাষ্টার এলেন।
ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে গেছে! গোর্খা চাপরাশী রামলাল মেঝের উপর মরে পড়ে আছে। তারই কোমরের ভোজালি তারই গলায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লোহার সিন্দুক খোলা। কিন্তু টাকার থলে মেঝের উপর পড়ে রয়েছে।
ব্যাপারটা কিছুই ভালো বোঝবার উপায় নেই। কে যে আমায় মেরে ফেলে টাকা নিয়ে উধাও হবে ভেবেছিল, আর কেই-বা আমায় বাঁচিয়ে রামলালকে মেরে গেল, কে জানে!
সাহেবদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা খবর পেলেন কেমন করে?
যিনি এখানে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি বললেন, ‘জংশনে ইঞ্জিন আমাদের পৌঁছনো মাত্র এখান থেকে তার গেল, ‘ডাকাত পড়েছে, জলদি আসুন।’
এখান থেকে তার করবে কে? ষ্টেশন-মাষ্টার টেলিগ্রাফের কাছে উঠে গিয়ে হাত দিয়ে তুলে আমাদের দেখালেন, কানেকশন তিনি কেটে দিয়েই বাসায় গিয়েছিলেন।
অবাক হয়ে আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম।
হঠাৎ আমার মনে হলো, ঝগড়াটা বাইরে পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বাইরে বেরিয়ে একবার দেখা যাক।
সবাই মিলে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। জ্যোৎস্নার আলো তখন ম্লান হয়ে এলেও দেখা গেল, দূরে প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ সীমানায় সাদামতো কী একটা পড়ে রয়েছে!
কাছে গিয়ে দেখি, শিউশরণ! আমাদের দেখে সে শুধু কাঁদতে থাকে। মুখে কথা নেই।
শেষে অনেক মেহনতে তাকে কথা বলানো গেল। সাহেবের লাথি খেয়ে সে কাঁদতে কাঁদতে সব কথাই বলে ফেললে। আমায় মেরে ফেলে সে আর রামলাল এসেছিল টাকা চুরি করতে। এর আগে যে তিনজন মরেছে, তারাও তাদেরই হাতে মরেছে। কিন্তু এবার তার ফল হলে বিপরীত। মাঝখান থেকে কে একটা লোক এসে রামলালকে ত’ মেরেই ফেললে, আর তার হাত থেকে টাকার থলেটা কেড়ে নিয়ে পা-দুটো তার উলটো দিকে মুচড়ে ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেল।
বুঝলাম, সেই ভাঙ্গা পা নিয়ে অতি কষ্টে বুকে হেঁটে শিউশরণ পালাবার চেষ্টা করছিল।
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘লোকটা দেখতে কি রকম বল দেখি?”
শিউশরণ বললে, সে মানুষ নয় বাবু। তার গায়ে বহু জোর। ইয়া বড় তালগাছের মত লম্বা ছাগলের মত মুখ।
আর কিছু বলবার দরকার ছিল না। মাথাটা তখন আমার কেমন যেন ঘুরছিল বলে সেইখানেই বসে পড়লাম। রামলাল যখন আমার গলাটা চেপে ধরে আমায় মেরে ফেলবার উদ্যোগ করছিল, তাকে তখন আমি জানালা টপকে ঘরে ঢুকতে দেখেছি। এমন সময় টপ করে আমার পায়ের কাছে কি যেন একটা পড়লো। তুলে দেখি একটা দেশলাই-এর বাক্স। এইটেই সেদিন আমি তাকে ট্রেনের কামরায় দিয়েছিলাম, কিন্তু ফেরত দিতে সে ভুলে গিয়েছিল।
এদিক-ওদিক, বহুদূর পর্যন্ত তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পেলাম না। সমস্ত শরীর তখন আমার রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু কে সে? যে-ই হও, তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করেছ। তোমায় নমস্কার!
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত
আপলোড: ২৬/৬/২০১৯

No comments:

Post a Comment