Wednesday, 2 January 2019

ভৌতিক গল্প (মোবাইল ভার্শন): হানাবাড়ির কালো কুকুর

হানাবাড়ির কালো কুকুর
শিশির বিশ্বাস
ল্পটা শুনেছিলাম ‘শনিবারের সভার এক আসরে বলেছিলেন ভরদ্বাজ চৌধুরী নাথের বাগানে আমাদের সারদাময়ী মেসে শনিবারের সভার কথা আগেও বলেছি এঁদো গলির ভিতর ছোট এক মেস তবু শনিবার হলেই ছুটে আসেন অনেকে তাঁদের সবাই যে কোনও এক সময় সারদাময়ী মেসের আবাসিক ছিলেন তা বলাই বাহুল্য তবে ব্যতিক্রমও আছে নিখাদ আড্ডা আর গল্পের টানে অন্যরাও হাজির হয়ে যান কখনও মেসের ঠাকুর ব্রজও বেজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে এই দিনে দফায় দফায় হাজির হয় রসনা তৃপ্তির জন্য দেদার গরম তেলেভাজা আর জিলিপি এ ছাড়া মস্ত রেকাবে সদ্য ভাজা মুড়ি মেসের পাশেই বুড়িমাসির মুড়ি ভাজার দোকান বলাই আছে এই দিনে গরম মুড়ি জোগান দেবার দায়িত্ব তাঁর সদ্যভাজা সেই মুড়ির স্বাদ কিছু অন্য রকম তো অবশ্যই এর সঙ্গে হরেক কিসিমের গল্প তো রয়েছেই
আগেই বলেছি শনিবারের সভায় কখনও বাইরের মানুষও চলে আসতেন ভরদ্বাজ চৌধুরী তাঁদেরই একজন সেদিন ওনাকে নিয়ে এসেছিলেন সভার পুরোনো মানুষ মোহিত রায় রেকাব ভরতি গরম মুড়ি আর তেলেভাজা দিয়ে আসর তখন বেশ জমে উঠেছে চলছে নানা খুচখাচ গল্প একটু আগে ব্রজ জানিয়ে গেছে জিলিপি চলে আসছে অল্প সময়ের মধ্যেই মন তাই খুশ হয়ে রয়েছে সেই সময় মোহিত রায় হঠাৎ বললেন ‘আজ কিন্তু আমাদের মধ্যে একজন তান্ত্রিক মানুষ রয়েছেন তাঁর
কেকে?’
মোহিত রায়ের কথা শেষ হতে পেল না রব উঠল চারদিকে মোহিত রায় ফের দম নিয়ে পাশে বসা ভদ্রলোককে দেখিয়ে বলল ‘ইনি ভরদ্বাজ চৌধুরী তান্ত্রিক মানুষ পরিচয় হতে নিয়ে এসেছি আজ
ভদ্রলোককে দেখে কিছু অবাকই হয়েছিলাম গোড়ায় মাঝবয়সী মানুষটির শরীরে তান্ত্রিক সুলভ কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা রুদ্রাক্ষের মালা কিছুই নেই পরনে অবশ্য সদ্য পাট খোলা ধুতিপাঞ্জাবি তবু এক প্রস্থ জোরাল হাততালি হয়ে গেল আসলে শনিবারের আসরে সবাই প্রায় পুরোন মানুষ হঠাৎ নতুন কেউ মানেই কিছু নতুন গল্প
ব্যাপার দেখে ভরদ্বাজ চৌধুরী তখন কিছু অপ্রস্তুত এমন আশা করেননি তবু সামলে নিতে সময় লাগল না মুখ ভরতি মুড়িতেলেভাজা পেটে চালান করে দিয়ে বললেন ‘প্রথমেই বলি আমি তান্ত্রিক নই একসময় সামান্য চর্চা করতাম একজন গুরুও ছিলেন অমাবস্যায় নির্জন শ্মশানে রাতও কাটিয়েছি বহুবার একবার বীরভূমের দিকে রাতে একাই এক নির্জন শ্মশানে গেছি হঠাৎ দেখি ভুঁড়ো এক শেয়াল সদ্য নেভা চিতা হাঁটকাচ্ছে কাছে যেতে চমকে উঠলাম শেয়াল কোথায়জটজুটধারী এক সন্ন্যাসী আমাকে দেখে তিনি ধমক দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছিলেন আমিও চলে এসেছিলাম গুরুদেবের কাছে ধমকও খেয়েছিলাম সেজন্য কাজটা নাকি খুবই বোকামি হয়েছে তারপর
কী কী তারপর?’
কথার মাঝেই প্রশ্নের ঝড় সামান্য দম নিয়ে মৃদু হাসলেন উনি ‘তারপর ছেড়ে দিলাম সব
কেনকেন?’
কারণ আমার গুরুদেব নিজেই তন্ত্রচর্চা ছেড়ে দিয়েছিলেন যে আমি তো সামান্য চুনোপুঁটি
কেনকেন?’ চারপাশে ফের সেই প্রশ্নের ঝড় অনেক দিন পরে শনিবারের আসর সত্যিই জমজমাট
সে এক ভয়ানক ব্যাপার’ ইতিমধ্যে সদ্য ভাজা গরম জিলিপির প্রথম কিস্তি এসে গেছে মোহিত রায় তাঁর হাতে গোটা দুয়েক জিলিপি ধরাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে উনি কপালে হাত ছুঁইয়ে কিছুক্ষণ থম হয়ে থেকে বললেন ‘আমার গুরু তান্ত্রিক  সনাতন ভট্টর নাম আপনারা শোনেননি নিশ্চয় শোনার কথাও নয় একেই উনি তন্ত্রচর্চা ছেড়ে দিয়েছেন আজ প্রায় বছর পনেরো যখন যুক্ত ছিলেন তখনও পরিচিত মহল ছাড়া তাঁর নাম বড় একটা কেউ জানত না কাগজে প্রতি সপ্তায় ঢাউস বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি তন্ত্রাচার্যতন্ত্রসূর্য ইত্যাদি হতে চাননি যারা আসতেন লোকমুখে তাঁর গুনের কথা শুনেই আসতেন
যাই হোক এই সনাতন ভট্টর কাছেই সেবার হাজির হয়েছিলেন রমাকান্ত পোদ্দার নামে এক ব্যক্তি বয়স চল্লিশের কোঠায় হলেও এক কথায় সফল ব্যবসায়ী নৈহাটির ওদিকে বাড়ি গোটা কয়েক বাসট্রাক ছাড়াও গোটা দুই সিনেমা হলের মালিক এ ছাড়া অন্য কারবারও ছিল তার একটা বাড়ি কেনাবেচার ব্যবসা এক কথায় শাঁসালো মানুষ
ভদ্রলোক সেবার গঙ্গার ধারে পুরোনো আমলের এক বাড়ির খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন কলকাতা থেকে অনেকটা দুরেই শুধু নয় যথেষ্টই পুরোনো আমলের বাড়ি রেনভেশন করতেও খরচ প্রচুর তবু গঙ্গার ধারে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়িটা দেখে এতই পছন্দ হয়ে গেল যে নিজেই মাঝেমধ্যে এসে থাকবেন ঠিক করলেন এরপর খোঁজখবর করতে গিয়ে অবশ্য থমকেই গিয়েছিলেন বাড়িটা নাকি হানাবাড়ি স্থানীয় মহলে তাই নিয়ে চালু রয়েছে নানা রোমহর্ষক গল্প বার কয়েক মালিকানা পালটালেও কেউ থাকেনি কখনও এককথায় থাকতে পারেনি
অন্য কেউ হলে এরপর পিছিয়ে আসতেন কিন্তু রমাকান্ত পোদ্দার কিছু অন্য ধাতের মানুষ টাউনের বাইরে হলেও জায়গাটা এখন আর তেমন ফাঁকা বলা যায় না চারপাশে নতুন বাড়ি উঠেতে শুরু করেছে রাস্তাঘাটও কিছু ভাল হয়েছে অথচ হানাবাড়ির দুর্নাম থাকায় বাড়িটা পাওয়া যাচ্ছে প্রায় জলের দামে। মনস্থির করে অগত্যা কিনেই ফেললেন
অল্প দিনের মধ্যে রেনভেশনের কাজ শুরু হবে তার আগে বাইরে থেকে মোটা মাইনেয় জবরদস্ত এক দারোয়ান মোতায়েন করেছিলেন ট্রাক বোঝাই মালপত্রও আসতে শুরু করেছে তার মধ্যেই হঠাৎ ছন্দপতন পাহারাদার একদিন ছুটে এসে জানাল ওই বাড়িতে সে আর এক দিনও থাকতে পারবে না কাজ ছেড়ে দেবে।
জানা গেল প্রতিদিন রাত কিছু গভীর হলেই একটা হিংস্র কাল কুকুর কোথা থেকে হাজির হয় বাড়িতে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায় তারপর কুকুরটা কোন পথে আসে সে এক রহস্য বাড়ির সদর ফটক এমনকি প্রতিটি দরজাজানলা বন্ধ করেও তাকে আটকানো যায়নি গত রাতে দারোয়ান সাহস করে মোটা এক লাঠি নিয়ে তাড়া করেছিল তাতে কুকুরটা যেভাবে হিংস্র দাঁত বের করে তেড়ে এসেছিল তাতেই প্রাণ উড়ে গেছে বেচারার কোনক্রমে পালিয়ে বেঁচেছে এরপর ওই বাড়িতে সে আর থাকতে রাজি নয় ডবল মাইনে দিলেও
বৈষয়িক মানুষ রমাকান্ত পোদ্দার অবশ্য সেজন্য পরোয়া করেননি নতুন দারোয়ান বহাল করেছিলেন কিন্তু সেও দিন কয়েকের বেশি থাকতে পারেনি কাজ ছেড়ে পালিয়েছে এরপর খবর পাঁচকান হতে সময় লাগেনি যে ঠিকেদার রেনভেশনের কন্ট্রাক্ট নিয়েছিলেন তিনিও পিছিয়ে গেছেন রমাকান্ত পোদ্দার খোঁজখবর নিয়ে এরপরেই ছুটে এসেছিলেন তান্ত্রিক সনাতন ভট্টর কাছে বুঝেছিলেন এই সমস্যার সমাধান থানা–পুলিশ বা অন্য কিছু দিয়ে হবে না।
এই পর্যন্ত বলে ভরদ্বাজ চৌধুরী অল্প থামলেন উপস্থিত মানুষগুলোর উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন ‘রমাকান্ত পোদ্দার যেদিন সনাতন ভট্টর কাছে এসেছিলেন সেদিন আমিও ছিলাম সেখানে কথাবার্তা আমার সামনেই হয়েছিল অভিজ্ঞতা থেকে জানতাম কাজটা তেমন শক্ত নয় সঠিকভাবে একটা স্বস্ত্যয়ন করতে পারলেই হানাবাড়ির দোষ কাটিয়ে দেওয়া যায় বাড়ি তৈরি হবার সময় ভিত পুজোর কাজ প্রেত বা ডাকিনী বিদ্যায় সিদ্ধ কাউকে দিয়ে করানো হয়েছিল কালো কুকুরের ব্যবস্থা তিনিই করে গিয়েছেন এসব ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক যতদিন জীবিত থাকেন ততদিন কালো কুকুরের রূপ ধরা অশরীরী আত্মা বাড়ি পাহারা দেয় প্রেতক্রিয়ার সময় তাই বাড়ির মালিককেও উপস্থিত থাকতে হয় মালিকের মৃত্যুর পর অশরীরী আত্মাও বিদায় হয়ে যায় কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি
‘যথেষ্ট পুরোনো বাড়ি প্রথম মালিক নিশ্চয় বেঁচে নেই বাড়িও পরিত্যক্ত তবু সেই অশরীরী আত্মা এখনও বাড়ি পাহারা দিয়ে যাচ্ছে গোলমেলে ব্যাপার এসব ক্ষেত্রে বাড়ির পুরোনো ইতিহাস নাড়ি নক্ষত্র না জেনে অনেকেই কাজে হাত দিতে চায় না কিন্তু রমাকান্ত পোদ্দারের তাগাদায় কী ভেবে সনাতন ভট্ট রাজি হয়ে গেলেন
আগেই বলেছি এমনিতে এসব কাজ খুব শক্ত নয় তান্ত্রিক সনাতন ভট্টর কাছে তো নয়ই তন্ত্রশাস্ত্র মেনে সঠিকভাবে স্বস্ত্যয়ন করে পূর্ণ আহুতি দিতে পারলেই সমস্যার সমাধান সেজন্য হরেক জিনিসপত্রও দরকার তবে রমাকান্ত পোদ্দার পয়সাওয়ালা মানুষ আয়োজনে ত্রুটি হবে না তবু সমস্যা একটা আছে হোম–স্বস্ত্যয়নের সময় বাড়ির কর্তারও উপস্থিত থাকার নিয়ম কিন্তু অনেকেই থাকতে ভয় পান তেমন শক্ত মনের মানুষ না হলে আমরাও নিষেধ করি তাতে বরং বিপদের সম্ভাবনা
এসব ক্ষেত্রে তন্ত্রমতে অন্য ব্যবস্থা রয়েছে অন্য কাউকে গৃহকর্তার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকতে হয় কাজটা আমি নিজেও সামাল দিয়েছি অনেক বার তবু গৃহকর্তা থাকলেই ভাল হয় সেই কথাই তাঁকে বলা হল ব্যবসায়ী মানুষ হলেও রমাকান্ত পোদ্দারের বুকের পাটাও দেখা গেল যথেষ্ট বলতেই রাজি হয়ে গেলেন তিনি নিজেই থাকবেন সনাতন ভট্টও আপত্তি করলেন না দুদিন পরেই অমাবস্যা ঠিক হল সেই রাতেই তিনি স্বস্ত্যয়নে বসবেন জিনিসপত্রের বড় একটা ফর্দ তখনই করে দেওয়া হল
রমাকান্ত পোদ্দার কাজের মানুষ ফর্দ হাতে নিয়ে বললেন আচার্যি মশাই এ যা দেখছি কলকাতা ছাড়া ঠিকমতো পাওয়া মুশকিল তাই আজই সব কিনে নিয়ে যাব সঙ্গে গাড়িও রয়েছে 
মাত্র দুদিন পরেই কাজ প্রস্তাবটা মন্দ নয় সনাতন ভট্ট আমাকেও দিয়ে দিলেন সঙ্গে দেখেশুনে নিতে পারব
 ‘ভাগ্যিস সনাতন ভট্ট আমাকেও সঙ্গে দিয়েছিলেন তাই হানাবাড়ির কিছু পরিচয় ভালই পাওয়া গেল। বড়বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে দিয়ে আমার ফিরে আসার কথা কিন্তু রমাকান্তবাবু যখন জানালেন জিনিসপত্র তিনি আজই নতুন কেনা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবেন হঠাৎই মনে হল আমারও সঙ্গে থাকা দরকার। কেন এমন মনে হয়েছিল বলতে পারব না তবে যেহেতু তন্ত্র নিয়ে সামান্য চর্চা ছিল তাই বুঝেছিলাম ভাবনাটাকে ছুঁড়ে ফেলা ঠিক হবে না
গাড়ি যখন যথাস্থানে এসে পৌঁছল রাত আটটার মতো বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি যায় না খানিকটা কাঁচা পথ হেঁটেই যেতে হবে এদিকে ইলেক্ট্রিসিটি এলেও রাস্তায় এখনও আলোর ব্যবস্থা হয়নি সামনে রমাকান্ত পোদ্দার নিজে পাশে মালপত্রের ছোট এক ব্যাগ হাতে আমি পিছনে বড় ঢাউস ব্যাগটা নিয়ে ড্রাইভার তিনজন চলেছি হঠাৎ একটা ষণ্ডা চেহারার মানুষ সামনে এসে দাঁড়াল আধো অন্ধকার রাস্তা হয়তো আশপাশেই ছিল এমন দশাসই চেহারার মানুষ বড় একটা দেখা যায় না মাথায় কদমছাঁট চুল পরনে কালো হাফ প্যান্টের উপর একই রঙের জামা লোকটা পথ আটকে হেঁড়ে গলায় বলল ‘এদিকে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’
রমাকান্ত পোদ্দার যথেষ্ট ঠাণ্ডা গলায় বললেন ‘কেন ভাইনিজের বাড়িতে যাচ্ছি
 এই বাড়ি তাহলে আপনিই কিনেছেন?’
হ্যাঁ ভাই আমিই কিনেছি কেন কিছু আপত্তি আছে নাকি’ রমাকান্ত পোদ্দারের কথায় সামান্য ঝাঁঝ ঝরে পড়ল এবার
না আপত্তি নেই কিন্তু পিছনে ব্যাগ বোঝাই অত মালপত্র কেনওসব হোমযজ্ঞের জিনিসপত্র বাড়িতে ঢোকাবেন না ভাল হবে না
কথা শেষ করে লোকটা কটমট চোখে আমার দিকে তাকাল সনাতন ভট্টর মতো আচার্যর কাছে তন্ত্রচর্চা করি একা মহাশ্মশানে অনেক রাত কাটিয়েছি দেখেছি অনেক কিছুই অথচ লোকটার সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে মাথা নামিয়ে নিলাম অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠল যেন লোকটা অবশ্য আর মুহূর্তমাত্র দেরি করেনি এরপর পিছন ফিরে হনহন করে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে
রমাকান্তবাবু একটু অবাক হয়েই বললেন আচার্যি মশাই ব্যাগের ভিতর যে হোমযজ্ঞের মালপত্র রয়েছে লোকটা জানল কী করে?
উত্তরে সেদিন তাঁকে কিছু না বললেও পরের দিন সনাতন ভট্টর কাছে গোপন করিনি বলেছিলাম কাজটায় হাত না দিলেই ভাল হয় বিপদ হতে পারে
কিন্তু সনাতন ভট্ট অন্য ধাতের মানুষ ভুরু কুঁচকে কী ভাবলেন খানিক তারপর বললেন তা হয় না ভরদ্বাজকথা যখন দিয়েছি যেতেই হবে তবে তোমার ওখানে যাওয়ার দরকার নেই আমি একাই সামলে নিতে পারব
অগত্যা আসল কাজের দিন আমি আর ওই হানাবাড়িতে যাইনি এরপর এই কাহিনীর বাকি অংশ আমার প্রত্যক্ষ নয় শুনেছি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে’ কথা শেষ করে ভরদ্বাজ চৌধুরী আমাদের দিকে তাকালেন
হাঁ করে শুনছিলেন সবাই মোহিত রায় নিজেও ব্যতিক্রম নয় সাড় ফিরে পেয়ে বললেন ‘মুড়িজিলিপি সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল যে আগে খেয়ে নিন বরং
কিন্তু ভরদ্বাজ চৌধুরী সেকথায় কান দিলেন না ‘থাক ওসব বরং গল্পটাই শেষ করি আগে
উপস্থিত কেউ সে কথায় আপত্তি করলেন না এমনকি মোহিত রায়ও ভরদ্বাজ চৌধুরী ফের শুরু করলেন ‘রাত বারোটায় হোমযজ্ঞ শুরু হবে তার আগে গোছগাছ ভৈরবের আরাধনা পুজো সনাতন ভট্ট সন্ধের কিছু পরেই পৌঁছে গিয়েছিলেন
হোমের জিনিসপত্র হানাবাড়ির দুতলার একটা  বড় ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছিল সনাতন ভট্ট ভেবেছিলেন সব ছড়িয়ে ছত্রাকার হয়ে থাকবে কিছু জিনিস নষ্ট হওয়াও সম্ভব সেজন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন কিন্তু ঘরের তালা খুলতে দেখা গেল তেমন কিছু হয়নি যেভাবে রাখা হয়েছিল তেমনই রয়েছে কিছুটা নিশ্চিন্তই হয়েছিলেন উনি তবু গৃহকর্তা রমাকান্ত পোদ্দারকে নিয়েই তাঁর চিন্তা ছিল বেশি তাই স্বস্ত্যয়নে বসার আগে তাঁর গলায় একটা মন্ত্রপূত কবজ পরিয়ে দিয়ে বললেন বাবাজী স্বস্ত্যয়নে বসলে নানা ঝামেলা শুরু হতে পারে ভয় পাবেন না একমনে ইষ্টদেবতার নাম জপ করবেন এটুকু করতে পারলেই বাকি সব আমি সামলে নিতে পারব
গরদের ধুতি পরে রমাকান্তবাবু তখন তাঁর আসনে বসে পড়েছেন নীরবে মাথা নাড়লেন মুখ পাথরের মতো শক্ত বিন্দুমাত্র চঞ্চলতা নেই সেদিকে তাকিয়ে সনাতন ভট্ট অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করলেন
দেহবন্ধন করে আগে আসনশুদ্ধি তারপর ঘট স্থাপন করে মঙ্গলভৈরবের ধ্যান আর আরতি শেষে সনাতন ভট্ট হোমের বেদীতে সমিধ সাজিয়ে জ্বেলে দিলেন হোমের আগুন কিছু বেড়ে উঠতে বীজমন্ত্র উচ্চারণ করে সবে আহুতি দিয়েছেন ঘরের বন্ধ দরজার উপর কেউ বাইরে থেকে দড়াম করে লাথি মারল পুরোনো দিনের মজবুত কাঠের দরজা মড়মড় করে উঠল সারা বাড়ি কেঁপে উঠল যেন
অত বড় বাড়িতে দুজন মাত্র মানুষ অযথা ঝামেলা হতে পারে বুঝে অন্য কাউকেই রাখা হয়নি সনাতন ভট্টর ভয় ছিল রমাকান্তবাবু নার্ভ ফেল করে কিছু করে না বসেন আড় চোখে তাকিয়ে দেখলেন তিনি আগের মতই প্রায় পাথর হয়ে বসে আছেন মুখে বিড়বিড় করে অবিরাম ইষ্টমন্ত্র ওই দৃশ্য দেখার পর তান্ত্রিক সনাতন ভট্ট আর পরোয়া করেননি উনি নিজেই পরে আমায় বলেছিলেন ভদ্রলোক শুধু বড় ব্যবসায়ী নয় ভালো তান্ত্রিকও হতে পারতেন
যাক সে কথা সেদিন ওই বাড়িতে তারপর যা শুরু হয়েছিল তা এক কথায় ভয়ানক একটু পরে দরজার লাথি বন্ধ হয়ে গেলেও হোম যত এগোতে লাগল  প্রায় যেন দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেলে বাড়িতে ছাদের উপর নীচের ঘরগুলোয় কয়েকশো মানুষের দাপাদাপি মার–মার চিৎকার আর কান ফাটানো অট্টহাসি সেই সঙ্গে অবিরাম কাক আর শকুনের ডাক
তারই মধ্যে সনাতন ভট্ট একে একে প্রতিটি কাজ নিষ্ঠাভরে করে গেলেন যখন পূর্ণাহুতি পড়ল ঘড়িতে ভোর পাঁচটা ওই সময় ঘরের দরজার বাইরে ফের লাথি পড়তে শুরু করল বোধ হয় ভেঙেই পড়বে এবার সনাতন ভট্ট পাশে রমাকান্তবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন বাবাজী এবার দরজা খুলে দিতে হবে
ওই অবস্থায় কাজটা যে একেবারেই সহজ নয় তা বলাই বাহুল্য ভয়ানক বুকের পাটা দরকার কিন্তু উনি বুঝেছিলেন রমাকান্তবাবু পারবেন সত্যিই তাই মুখের কথা শেষ হতেই তিনি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন বাইরে বিশাল এক কালো কুকুর দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ হিংস্র দাঁতের ফাকে সমানে লালা গড়াচ্ছে ছিঁড়ে খাবে যেন দরজা খুলে দিতেই কুকুরটা ছুটে ঘরে ঢুকে হোমের বেদীর অদূরে রাখা নরকপালের উপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল নরকপাল ভরতি করে কারণবারি আগেই রাখা ছিল কুকুরটা জিব বের করে সশব্দে সেই কারণবারি পান করতে লাগল নরকপাল খালি হয়ে আসতেই সনাতন ভট্ট ফের ঢেলে দিলেন এভাবে বার চারেক নরকপালে ঢালা কারণবারি পান করে কুকুরটা মুখ তুলল এবার দুই চোখের হিংস্র দৃষ্টি তখন অনেকটা শান্ত কোনও দিকে দৃষ্টিপাত না করে প্রাণীটা ধীর পদক্ষেপে ঘর থেকে বের হয়ে গেল এরপর
রমাকান্তবাবুকে ইশারা করে সনাতন ভট্ট তৎক্ষণাৎ আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে কুকুরটাকে অনুসরণ করলেন বাড়িতে উপর নীচ মিলিয়ে গোটা দশেক ঘর অন্য দিকে না গিয়ে কুকুরটা সিঁড়ি দিয়ে সোজা নেমে গেল নীচে শেষ ধাপ পার হয়ে কয়েক পা এগোতেই প্রাণীটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল বাতাসে প্রায় ভোজবাজির মতো
সনাতন ভট্টর ইঙ্গিত বুঝতে রমাকান্ত পোদ্দারের ভুল হয়নি তৎক্ষণাৎ তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন তিনিও তাই ব্যাপারটা তাঁর নজর এড়ায়নি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন সনাতন ভট্ট বললেন বাবাজী হানাবাড়ির অশরীরী আত্মা বিদেয় হয়ে গেছে আর দেখা যাবে না তবে একটা কাজ বাকি আছে এখনও কুকুরটা যেখানে বাতাসে মিলিয়ে গেল সেখানের মেঝে খুঁড়তে হবে এখনই
পুরোনো আমলের শক্ত মেঝে খোঁড়া সহজ নয় তবে তখন আলো ফুটেছে কাজের মানুষ রমাকান্তবাবু দৌড়োদৌড়ি করে অল্প সময়ের মধ্যেই দুজন লোক জোগাড় করে ফেললেন গাঁইতাকোদাল দিয়ে ফুট তিনেক খুঁড়তেই বের হয়ে পড়ল একটা পশুর মাথার খুলি সঙ্গে গোটা কয়েক হাড় খুলিটি কুকুরের মনে হলেও অত বড় আকারের কুকুর খুব একটা দেখা যায় না    
খুলি আর হাড়গুলো একটা ঝুড়িতে রেখে সনাতন ভট্ট রমাকান্তবাবুকে সেগুলো সেই সকালেই মাঝ–গঙ্গায় ফেলে আসতে বললেন
রমাকান্তবাবু দেরি করলেন না মজুরদের বিদেয় করে বাড়িতে তালা দিয়ে বের হয়ে পড়লেন সনাতন ভট্ট অবশ্য সঙ্গেই চললেন বাড়ির কাছেই গঙ্গা কিন্তু হাড়গুলো ফেলতে হবে মাঝগঙ্গায় ঘাটে না গেলে নৌকো পাওয়া যাবে না দুজন চললেন সেই দিকে ছোট এক জেলে নৌকো পাওয়া গেল সনাতন ভট্টও সঙ্গে থাকবেন কিন্তু রমাকান্তবাবুই বললেন দিনের বেলা যখন সামান্য এই কাজ তিনি একাই পারবেন নৌকোও তেমন বড় নয় তিনি বরং ঘাটেই বিশ্রাম করুন
কাজটা যে একেবারেই সামান্য নয় সনাতন ভট্ট জানতেন কিন্তু গত রাতে রমাকান্ত পোদ্দারকে দেখে অনেকটাই ভরসা পেয়েছেন তা ছাড়া একা হাতে সব সামলাতে গিয়ে রাতে পরিশ্রম কম হয়নি। মনের উপর ভয়ানক চাপ গেছে। শরীর আর বইছিল না ভাবলেন তাহলে আর ঘাটে বসে থেকে লাভ কী? স্টেশন বেশি দূরে নয় যখন সহজে ট্রেনেই ফিরে যেতে পারবেন তাতে তাড়াতাড়িও হবে। সেই কথা বলতে রমাকান্তবাবুও আপত্তি করলেন না ঘাটের একজনকে দিয়ে রিকশাও ডেকে দিলেন
সনাতন ভট্ট তখন ভাবতেও পারেননি কী ভয়ানক বিপদ তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে মিনিট পনেরো পরে রিক্সা স্টেশনে পৌঁছেছে উনি রিকশা থেকে নামতে যাবেন হঠাৎ একটা ভয়ানক চেহারার কালো কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর উপর আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে নিমেষে উধাও হয়ে গেল তারপর
‘ভোর সকাল পথে লোকজন কম কুকুরটা ওইভাবে নিজেই পালিয়ে না গেলে হয়তো সনাতন ভট্টকে বাঁচানো যেত না একটু বেলায় যখন ফোনে খবর পাই তিনি তখন কাছেই এক হাসপাতালে জ্ঞান থাকলেও অবস্থা একেবারেই ভাল নয় ছুটলাম সেই দণ্ডেই। দৌড়ঝাঁপ করে তাঁকে সেই দিনই নিয়ে আসা হল কলকাতায় যথাবিহিত চিকিৎসা হতে মানুষটি বেঁচে গেলেন এই যা
সে কীকেন?’
আর রমাকান্ত পোদ্দারতাঁর কিছু হয়নি?’ একসাথে কয়েক ঝাঁক প্রশ্ন ছুটল
আমার গল্প কিন্তু এখনও শেষ হয়নি’ অল্প দম নিয়ে ফের শুরু করলেন ভরদ্বাজ চৌধুরী ‘এরপর সামান্য যা বাকি তা ওই রমাকান্ত পোদ্দারকে নিয়েই সনাতন ভট্টকে রওনা করিয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্তেই মাঝিকে নৌকো ছাড়তে বলেছিলেন দাঁড় টেনে মাঝি খানিক বাদে পৌঁছেও গিয়েছিল মাঝ–গঙ্গায় তারপরেই ঘটে যায় এক ভয়ানক ব্যাপার হঠাৎ সোঁসোঁ শব্দে দমকা বাতাসে নৌকো প্রায় বেসামাল। তারই মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল নৌকোয় দাঁড়িয়ে এক ষণ্ডা চেহারার মানুষ পরনে কালো হাফ প্যান্ট গায়ে সেই রঙের জামা দুদিন আগে সন্ধেয় রমাকান্তবাবু বাড়ির সমানে যে লোকটিকে দেখেছিলেন সেই মানুষ তবে সেদিন মানুষটি অন্ধকারে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াতে তেমন অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। কিন্তু আজ একেবারেই অন্য রকম। প্রায় যেন বাতাস ফুঁড়ে বেরিয়ে এল লোকটা। তাই দেখে আজ আর মাথা ঠিক রাখতে পারেননি তিনি। তার উপর অমন ভয়ানক হিংস্র হাসি কারও মুখে ফুটে উঠতে পারে ভাবাও যায় না! আতঙ্কে আঁআঁ করে মুহূর্তে ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন নৌকোর উপর
সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি নৌকোর মাঝিও প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছিল গঙ্গায় তারপর খানিক দূর গিয়ে সামান্য পিছন ফিরতে দেখে নৌকোয় ভয়ানক চেহারার সেই লোকটা নেই যেমন বাতাস ফুঁড়ে এসেছিল তেমনই মিলিয়ে গেছে হাজার হোক নিজের নৌকো সাহস করে মাঝি তাই ফিরে এসেছিল নৌকোয় রমাকান্ত পোদ্দারের তখনও জ্ঞান ফেরেনি। ঝুড়িটা পড়ে রয়েছে পাশেই সেদিকে তাকাতেই মাঝির নজরে পড়ল মাটিমাখা কোন পশুর বড় এক মাথার খুলি কিছু হাড়গোড় মাঝি তারপর আর দেরি করেনি ঘাবড়ে গিয়ে ঝুড়িসুদ্ধ সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল গঙ্গায় তার কিছুক্ষণ পরেই রমাকান্তবাবু জ্ঞান ফিরে উঠে বসেন। একদম সুস্থ।
ভরদ্বাজ চৌধুরী থামলেন ঘরে কারো মুখেই কথা নেই যদিও মনের ভিতর অনেক প্রশ্নই তখন ভিড় করতে শুরু করেছে সামনে মানুষগুলোর মুখের দিকে খানিক দৃষ্টি বুলিয়ে উনি মুখ খুললেন আবার ‘দুটো ঘটনা অনেকেই বোধ হয় মেলাতে পারছেন না সেটাই স্বাভাবিক আসলে সেদিন তন্ত্রক্রিয়ার শেষ কাজটা সম্পূর্ণ করেছিল নৌকোর মাঝি যদিও নিজের অজান্তেই লোকটা ভয় পেয়ে ঝুড়ির হাড়গুলো ওই সময় গঙ্গায় ফেলে না দিলে কুকুরটা অত তাড়াতাড়ি উধাও হত না সনাতন ভট্টকে প্রাণে মারাই তার উদ্দেশ্য ছিল
আসলে ভয় পেয়ে রমাকান্ত পোদ্দার সেদিন ওইভাবে জ্ঞান হারিয়ে না ফেললে পরের ভয়ানক ব্যাপারটা আর ঘটত না ত্রুটি সনাতন ভট্টরই রমাকান্ত পোদ্দারের সাহসের উপর অতিরিক্ত আস্থা রাখাই কাল হয়েছিল পরে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যাই হোক হানাবাড়ির সেই ভৌতিক কালো কুকুর আর দেখা যায়নি এরপর দেখা যায়নি কালো পোশাকের সেই লোকটাকেও
‘রমাকান্ত পোদ্দার অবশ্য চেষ্টায় ত্রুটি রাখেননি খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন সেই দিনই বলা যায় তাঁরই একান্ত চেষ্টায় সনাতন ভট্ট দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তবে তন্ত্রচর্চা ছেড়ে দিয়েছিলেন বরাবরের জন্য
আপলোড: ২৯/৪/২০১৯

1 comment: