Thursday, 3 January 2019

ভাললাগা ভৌতিক গল্প (মোবাইল ভাঃ): ভূত পেত্নীর কথা (হেমেন্দ্রকুমার রায়)


ভূত পেত্নীর কথা
হেমেন্দ্রকুমার রায়
তোমাদের কাছে আমি কাল্পনিক ভূতের গল্প বলেছি অনেক। কিন্তু সত্যি সত্যি ভূতের অস্তিত্ব আছে কিনা, এ নিয়ে তর্কের অন্ত নেই।
এ-সব নিয়ে দরকার নেই আমাদের মাথা ঘামিয়ে। কারুকেই আমি ভূত বিশ্বাস করতে বলি না। অন্তত ভূত মানলেও ভূতকে ভয় করবার কোনও দরকার আছে বলে মনে হয় না।
কিন্তু ভূত মানি আর না মানি, মাঝে মাঝে এমন কতকগুলো আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যাদের কোনও মানে হয় না। সেগুলো ভূতের কীর্তি না হতে পারে, কিন্তু তাদের মূলে নিশ্চয়ই কোনও অপার্থিব শক্তি কাজ করে।
প্রায় বছর-কুড়ি আগে কলকাতায় জয় মিত্র স্ট্রীটের একটি বাড়িতে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে আরম্ভ করে। কোথাও কিছু নেই, বন্ধ ঘরের মধ্যে হঠাৎ একরাশ ইট বা রাবিশ বৃষ্টি হল। চোখের সামনে ঘটি, বাটি ও থালা মাটি থেকে উঠে শূন্যে উড়তে লাগল পাখির মতো, তারপর ঝন্ ঝন্ করে আবার মাটির উপরে পড়ে ভেঙেচুরে গেল। থানায় খবর দেওয়া হল। পুলিশবাহিনী এসে বাড়ি ঘেরাও করে সতর্ক পাহারা দিতে লাগল, তবু ওইসব উপদ্রব বন্ধ হল না। অথচ তার কিছুকাল পরে পুলিশ যখন হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে সরে পড়েছে তখন সমস্ত উৎপাত আপনা-আপনি আবার থেমে গেল! ওই উপদ্রবের কাহিনী সংবাদপত্রেও প্রচারিত হয়েছিল এবং দলে দলে লোক ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বচক্ষে সমস্ত দর্শন করেছিল।
আমাদের নিজেদের ভিতরে দুইবার দুটি বিচিত্র ঘটনা ঘটে।
অনেক দিন আগে আমরা রাওয়ালপিণ্ডিতে গিয়ে এক বৎসর বাস করেছিলুম। পরিবারের মধ্যে বাবা, মা, আমি আর দুই বোন। পে-অফিস-লেন নামক রাস্তায় যে বাড়িখানা আমরা ভাড়া নিয়েছিলুম সেখানা এখনো বর্তমান আছে কিনা জানি না, কিন্তু তখন সে-বাড়িতে সহজে কেউ থাকতে চাইত না। আমরা ভাড়া নেবার পরেই পাড়ায় লোকের মুখে খবর পাওয়া গেল, এ বাড়িতে নাকি অনেক-রকম ভয় আছে। এর মধ্যে একজন পাঠান নিহত হয়েছে এবং আর একজন পাঠান করেছে আত্মহত্যা। তারপর থেকে এখানে আর কেউ বাস করতে পারে না। বাবা কিন্তু ও-সব কথা গ্রাহ্যের মধ্যে আনলেন না।
আমার বয়স তখন অল্প। সব কথা ভাল করে মনে হয় না, তবে কোনও কোনও ঘটনা এখনো ভুলিনি। এক রাত্রে মায়ের ডাকাডাকিতে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। বাবা বিছানার উপরে উঠে বসে বললেন, ব্যাপার কি? মা বললেন, ‘দেখবে এস।’
আমাদের শোবার ঘরের সামনেই ছিল একটা দালান, তারপর উঠান এবং উঠানের তিনদিকে কয়েকখানা ঘর। বাবা ও মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, আমিও গেলুম তাদের পিছনে পিছনে।
দালান থেকে বেরিয়েই অবাক হয়ে দেখলুম, উঠানের উপরে মাটি থেকে প্রায় চার হাত উঁচুতে জ্বলছে আশ্চর্য একটা আলো। দেখলেই বুঝতে বিলম্ব হয় না যে, প্রদীপ, বাতি, লণ্ঠন বা মশাল থেকে সে আলোর উৎপত্তি নয়। নীলাভ আলো, আকার ক্রিকেট বলের মতন। চাঁদের কিরণে ধবধবে উঠানের উপরে আলোটা এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত নেচে বেড়াচ্ছে এবং মাঝে মাঝে এক একটা ঘরে দরজার কাছে গিয়ে যেন ঠোকর খেয়েই আবার আসছে।
মায়ের বাধা না মেনে বাবা উঠানের দিকে অগ্রসর হলেন আলোটাও হঠাৎ নিবে গেল।
তারপর কয়েক রাত ধরে আর একরকম কাণ্ড! গভীর রাত্রে উঠানের ধারের ঘরগুলোর দরজায় দরজায় শিকল বেজে ওঠে ঝন্–ঝ্, ঝন্–ঝ্‌!
বাবা বাইরে ছুটে যান, কিন্তু কারুকে দেখতে পান না। হয়তো বাইরের দুষ্টু লোক এসে ভয় দেখাচ্ছে এই ভেবে ভিতরে ঢুকবার দুই দরজায় তালা-চাবি লাগানো হল, কিন্তু তবু থামল না শিকল-সঙ্গীত। মা তো ভয়ে সারা। বলেন, এ অলক্ষুণে বাড়ি ছেড়ে চল! বাবা কিন্তু অটল। বলেন, আলো দেখিয়ে আর শিকল বাজিয়ে কোন পাঠান-ভূত আমাকে ভয় দেখাতে পারবে না।
পাঠান-ভূতেরা শেষটা হতাশ হয়ে আলো দেখানোর ও শিকল-বাজানোর কাজে ইস্তফা দিলে। দ্বিতীয় ঘটনাটি গুরুতর এবং ঘটনাস্থল হচ্ছে কলকাতা।
আমাদের পৈতৃক বসতবাড়ি ছিল পাথুরিয়াঘাটায়। তিন-মহলা বাড়ি, তারপরে একটা হাত-দেড়েক চওড়া খানা, তারপরে আমাদের দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়দের এক সারে তিনখানা বাড়ি। শেষোক্ত তিনখানা বাড়ির মধ্যে একখানা ছিল খালি ভৌতিক বাড়ি বলে তার ভিতরে কেউ বাস করতে পারত না।
ছেলেবেলা থেকেই আমি ভূতকে ভয় করি না। যদিও ভূতের গল্প শুনতে বা পড়তে খুব ভালবাসি। মনে আছে, বালক-বয়সে একদিন কৌতূহলী হয়ে ছাদ থেকে পাঁচিল বেয়ে সেই হানাবাড়িতে নেমেছিলুম। ভূতকে বধ করবার জন্যে আমার হাতে একখানি কাটারি!
দোতলা ও একতলার প্রত্যেক ঘরে ঢুকে দেখলুম খালি দুই ইঞ্চি পুরু ধুলো এবং ধুলোর উপরে নানা আকারের পদচিহ্ন। একটা ঘরে রয়েছে ধুলো ভরা তৈলহীন প্রদীপের ভিতরে আধ-পোড়া সলিতা এবং আর একটা ঘরের মেঝের উপরে পড়ে রয়েছে একটা কঙ্কাল!
তোমরা চমকে উঠো না, কারণ সেটা হচ্ছে বিড়ালের কঙ্কাল! ভূত দেখাও দিলে না, কোনরকম শব্দ বা কথা কইবার চেষ্টা করলে না। বোধহয় আমার হাতে কাটারি দেখে ভয় পেয়েছিল। অথচ এই বাড়িরই ছাদের উপরে ঘটেছিল একটি রোমাঞ্চকর ঘটনা। তখন আমার বয়স দশ বৎসরের বেশি নয়।
আমার বাবার একটি অভ্যাস ছিল। গ্রীষ্মকালের রাত্রে তিনি খোলা ছাদের উপরে শয়ন করতেন। একদিন অনেক রাতে বিষম গোলমালে আমার ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি, কাকারা আমার বাবার অচেতন দেহ বহন করে তেতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছেন।
খানিকক্ষণ চেষ্টার পর বাবার জ্ঞান হল। তারপর এবং পরেও বাবার মুখে একাধিকবার যে কাহিনীটি শুনেছি তা হচ্ছে এই :
ছাদের উপরে উঠে ঘুমোবার আগে বাবা খানিকক্ষণ পায়চারি করতেন।
দুই-তিন দিন পায়চারি করতে করতে বাবা দেখতে পেলেন, খানার ওপাশে হানাবাড়ির ছাদের উপরে দাঁড়িয়ে আছে এক শ্বেতবসনা নারীমূর্তি।
ওদিকের পাশাপাশি তিন বাড়ির একটা ছাদে উঠলেই অন্য দুটো ছাদের উপরে অনায়াসে যাওয়া যেত। হানাবাড়ির ও তার পাশের বাড়ির ছাদে ওঠবার সিঁড়ি ছিল না। বাকি যে বাড়ির সিঁড়ি ছিল তার মধ্যে বাস করতেন ‘রাঙা গিন্নী’ নামে এক বিধবা নারী ও তুলসীর মা’ নামে এক মহিলা। ছাদের উপরে প্রথম দুই-তিন দিন নারীমূর্তি দেখে বাবা ভেবেছিলেন, গরমের জন্যে নিশ্চয়ই ‘রাঙা গিন্নী’ বা ‘তুলসীর মা’ ছাদের উপরে উঠে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন।
ঘটনার দিন বাবা অনেক রাতে থিয়েটার দেখে বাড়ি ফিরেছিলেন। আহারাদি সেরে তিনি যখন ছাদের উপরে শয়ন করতে যান তখন প্রায় তিনটে। নিঝুম রাতে বৈশাখী জ্যোৎস্নায় চারিদিক সমুজ্জ্বল। বাবা সেদিনও স্পষ্ট দেখতে পেলেন, একটি নারীমূর্তি হানাবাড়ির ছাদ থেকে মাঝের বাড়ির ছাদের উপরে এসে দাঁড়াল।
আজ বাবার মনে কেমন সন্দেহ হল। ওই হানাবাড়িকে পাড়ার সকলেই ভয় করে। ও বাড়ি কেউ ভাড়া পর্যন্ত নেয় না। এই শেষ রাতে ওর ছাদের উপরে পাড়ার মেয়ের নিয়মিত আবির্ভাব দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। দূর থেকে বাবা চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছ?’
কোন সাড়া নেই। বাবা এগুতে এগুতে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি রাঙা গিন্নী নাকি?...তুলসীর মা?’
মূর্তি উত্তর দিলে না। বাবা তখন খানার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। এতক্ষণে তিনি লক্ষ্য করলেন, মূর্তির মুখে ঘোমটা। রাঙা গিন্নী বা তুলসীর মা বাবার সামনে ঘোমটা দিতেন না। ওখানে অন্য কোনও মেয়ের আসবার কথাও নয়। তবে কে এই নারী ?
মূর্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরিপূর্ণ চাঁদের আলোতেও তার কাপড়ের ভিতর থেকে দেহের কোন অংশই দেখা যাচ্ছে না। তার ভাবভঙ্গি বৃদ্ধার মতন নয় বটে, কিন্তু সে যুবতী কি প্রৌঢ়া, তাও বোঝবার উপায় নেই।
বাবা অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে খানা ডিঙিয়ে পাশের বাড়ির ছাদের উপরে গিয়ে উঠলেন। তিনি স্থির করলেন, নিশ্চয় এ কোন মেয়ে-চোর! ধরা পড়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা তার দিকে অগ্রসর হতেই সে পায়ে পায়ে পিছোতে লাগল। বাবা বললেন, ‘দাঁড়াও। শিগগির বল কে তুমি?’
কোন জবাব না দিয়ে মূর্তি পিছোতে লাগল। ক্রমে তার সঙ্গে বাবাও হানাবাড়ির ছাদের উপরে গিয়ে পড়লেন।
নারীমূর্তি একেবারে ছাদের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আর পিছোবার উপায় নেই।
‘আর কোথায় পালাবে? এখন আমার কথার জবাব দাও। কে তুমি?’ বলে বাবা আরো দুই পা এগিয়ে গেলেন।
তারপর যা হল সেটা একেবারেই কল্পনাতীত। বাবা যখন মূর্তির কাছ থেকে মাত্র এক হাত তফাতে, তখন পূর্ণ চন্দ্রালোকেই সেই অদ্ভুত স্ত্রীলোকটি যেন হাওয়ার ভিতরে মিলিয়ে গেল।
বাবা অত্যন্ত সাহসী ছিলেন, তিনি যে ভূতকে ভয় করতেন না এ কথা আমি জানি। কিন্তু এই অপার্থিব দৃশ্য দেখে গেলেন।
এই ঘটনার কিছুকাল পরে আমাদের বসতবাড়ি চার ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং আমাদের অংশে পড়ে বাড়ির পিছন দিকটা। খানার ধারে হানাবাড়ির ঠিক পাশেই তেতলার ঘরে আমি বহু বৎসর শয়ন করেছিলুম, কিন্তু প্রেতিনী দর্শনের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনদিন আমার হয়নি।
বাবা এর পরেও গ্রীষ্মকালে ছাদে শয়ন করতেন, কিন্তু কোন ছায়ামূর্তিই আর তিনি দেখতে পাননি। হানাবাড়িখানাও পরে সংস্কার করে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোন ভাড়াটিয়া ভূতের ভয় পেয়েছে বলে অভিযোগ করেনি।
বাবা ছিলেন অত্যন্ত সত্যবাদী, নির্ভীক, স্বল্পবাক ও গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তিনি যে মিথ্যা ভয় পেয়েছিলেন বা কাল্পনিক গল্পকে সত্য বলে চালিয়েছিলেন, এমন অসম্ভব কথা আমি স্বপ্নেও বিশ্বাস করতে পারি না।
ছবি: প্রকাশ গুপ্ত
আপলোড: ৫/৭/২০১৯

No comments:

Post a Comment