Friday, 4 January 2019

ভাললাগা ভৌতিক গল্প (মোবাইল ভাঃ): রাজপুতানার মরুতে (প্রেমেন্দ্র মিত্র)


রাজপুতানার মরুতে
প্রেমেন্দ্র মিত্র
ছেলেবেলা হইতে ভ্রমণ করা আমার নেশা। এই পঁচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত স্থির হইয়া কোথাও তিন মাস বসিতে পারিয়াছি, এমন কথা স্মরণ করিতে পারি না।
একলা একলাই ঘুরিয়াছি। যেসব বাঁধা পথে সাধারণ লোক চোখ-কান বুজিয়া বারকয়েক যাতায়াত করিয়া জাঁকাইয়া গল্প করিবার মতো ভ্রমণ সাঙ্গ হইয়াছে মনে করে, সে-পথে যাইতে আমার ভাল লাগে না। অদ্ভুত সব জায়গা, অজানা সব রেল লাইন, নগণ্য সমস্ত স্টেশন খুঁজিয়া বাহির করিতেই আমার আনন্দ। এই বিদেশযাত্রায় আমার কোনও দিন কোনও সঙ্গী মিলিবে আশা করি নাই, কিন্তু তাহাই একদিন মিলিয়াছিল আশ্চর্য রকমে। সেই গল্পই আজ বলিতেছি।
সুদূর রাজপুতানায় জে. বি. রেলওয়ের মারতা রোড স্টেশনে বসিয়াছিলাম ফুলেরা জংশনে যাইবার গাড়ির অপেক্ষায়। ফুলেরা জংশন পর্যন্ত যাইবার ইচ্ছা অবশ্য ছিল না, মনে মনে ঠিক করিয়াছিলাম, তাহার আগেই দেগানা স্টেশনে অবতরণ করিব।
মরুভূমির মাঝে স্টেশনটি অত্যন্ত ছোট। ওয়েটিংরুম নাই, একটা ছোট ঘর আছে, কিন্তু তাহাকে ওয়েটিংরুমের সম্মান দেওয়া চলে না। ঘরের মেঝেতে বালি ছাড়া আর কিছু নাই। একধারে একটা বেঞ্চ ছিল, এখন তাহার পায়া খসিয়া যাওয়ায় তাহার বসিবার জায়গাটা মেঝেতে পড়িয়া আছে মাত্র।
একেবারে বালির উপর না শুইয়া সেই তক্তার উপরই কম্বল পাতিয়া শুইয়াছিলাম। এই মরুর দেশে এই সময়টায় দিনের বেলা যেমন অসহ্য উত্তাপ, রাত্রে তেমনই কনকনে শীত। একটু আগুন দিলে ভাল হয় মনে হইতেছিল।
স্টেশনে জনপ্রাণী নাই। যে পাঞ্জাবি ভদ্রলোকটি স্টেশনমাস্টারি করেন, তাহার কোয়ার্টার নিকটেই। স্টেশনের একটিমাত্র চাকরের সঙ্গে তিনি সেখানে তখন বিশ্রাম করিতে গিয়াছেন। ট্রেন আসিবার মিনিট পনের আগে আসিলেই তাঁহার চলে।
পরিষ্কার জ্যোৎস্নার রাত্রি। যে ঘরে বসিয়াছিলাম, তাহার জানালার বালাই নাই। একটি দরজা আছে, কিন্তু তাহাও একেবারে খোলা-বন্ধ করিবার মতো কোনও পাল্লা সেখানে কোনও দিন বসান হয় নাই। সেই দরজা দিয়া চন্দ্রালোকে বহুদূর পর্যন্ত মরুভূমি দেখিতে পাওয়া যাইতেছিল। জ্যোৎস্নায় সমস্ত বালির সমুদ্র মনে হইতেছিল। কে যেন রূপার গুঁড়া ছড়াইয়া রাখিয়াছে!
শুইয়া শুইয়া বিশাল মরুপ্রকৃতির রহস্যময় নিস্তব্ধতা সত্যই উপভোগ করিতেছিলাম। মনে হইতেছিল, পৃথিবীর মমতাময়ী মাতৃরূপও যেমন সত্য, এই কঠোর তপতীরূপও তেমনই। স্নিগ্ধ শস্যশ্যামলা মাটির স্নেহময়ী রূপ দেখিলে মনে হয়, মানুষই বুঝি সৃষ্টির সবচেয়ে বড় কথা। তাহাকে লালন করিবার জন্যই পৃথিবীর যেন যত ব্যাকুলতা! কিন্তু এই দিকচিহ্নহীন মরুপ্রান্তরে মানুষ নগণ্য হইয়া গিয়াছেমানুষের প্রতি এই উদাসীন প্রকৃতির ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত নাই। এই বিশাল প্রান্তরের মাঝে ক্ষীণ একটি রেখা অনুসরণ করিয়া খেলনার শকটের মতো অসহায়ভাবে মানুষের সৃষ্ট দুর্ধর্ষ ইঞ্জিন গাড়ি সমেত যাতায়াত করে। আকাশ ও ধরণীর অসীমতার মাঝখানে মানুষের জীবনের মতোই তাহাকে অকিঞ্চিৎকর মনে হয়।
এমনই সব কথা ভাবিতেছিলাম, এমন সময় বাহিরের প্ল্যাটফর্মে কাহার যেন পায়ের শব্দ শুনিয়া আশ্চর্য হইলাম। ট্রেনের তো এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি! ইহার মধ্যে স্টেশন মাস্টারের তো আসিবার কথা নয়! সেই মুহূর্তেই দরজায় কাহার দীর্ঘ ছায়া পড়িল। শুধু ছায়া দেখিয়া মানুষের চেহারা অনুমান করা যায় না, তবু মনে হইল লোকটা অত্যন্ত দীর্ঘকায়, তাহার পিঠে একটা বস্তার মতো কিছু আছে বলিয়া মনে হইল।
ছায়া আর কিন্তু বেশি দূর অগ্রসর হইল না। পদশব্দে বুঝিলাম, লোকটি আবার অন্যদিকে ফিরিয়া চলিতে আরম্ভ করিয়াছে। তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইল না। খানিক বাদে আবার পদশব্দ আমার ঘরের দিকে আসিতেছে শুনিতে পাইলাম, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এবারেও লোকটির ছায়া আমার দরজায় পড়িবার পরই সে ফিরিল। ছায়ার বেশি আর কিছু দেখিবার সৌভাগ্য আমার হইল না!
তাহার পর আধঘণ্টা ধরিয়া এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে সত্যই আমি কৌতূহলী হইয়া উঠিলাম। এই কনকনে শীতের রাত্রে একেবারে পা গনিয়া গনিয়া কে প্ল্যাটফর্মে এমন করিয়া পদচারণা করিয়া বেড়াইতেছে! উঠিয়া দেখিতে অবশ্য পারিতাম, শুধু গরম কম্বলের আশ্রয় ত্যাগ করিয়া উঠিবার উৎসাহ তখন ছিল না।
শেষ পর্যন্ত যখন উঠিলাম, তখন স্টেশনের চাপরাশি ট্রেন আসিবার ঘণ্টা দিয়াছে এবং স্টেশনমাস্টার তাহার অফিস ঘরে বসিয়া লাইন-ক্লিয়ারের টেলিগ্রাম গ্রহণ ও প্রেরণ করিতেছেন।
কিন্তু আশ্চর্য! সমস্ত প্ল্যাটফর্মে আমি একা ছাড়া আর কোনও যাত্রী নাই! এতক্ষণ ধরিয়া যে লোকটির ছায়া দেখিলাম, যাহার পদচারণার শব্দ শুনিলাম, সে গেল কোথায়!
রহস্যের মীমাংসা করিবার পূর্বেই ট্রেন আসিয়া পড়িল, ফাঁকা একটা গাড়ি দেখিয়া রাত্রে ঘুমাইতে পাওয়ার আশায় চড়িয়া বসিলাম। গাড়ি ছাড়িয়া দিল।
ফাঁকা গাড়িতে সমস্ত জানালার শার্সি তুলিয়া দিয়া নীচের একটা বেঞ্চিতে কম্বল বিছাইয়া শয়নের উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় খুক করিয়া কাশির শব্দে অবাক হইয়া উপরে তাকাইলাম! যতদূর মনে পড়ে এই কামরায় ঢুকিবার সময় চারিদিকে তাকাইয়া কাহাকেও দেখিতে পাই নাই। আমার দেখার কি এমনই ভুল হইয়াছিল!
আমার বিপরীত দিকের বাঙ্কের উপর একটি লোক বসিয়া আমারই দিকে অদ্ভুতভাবে চাহিয়া আছেন। লোকটির চেহারা অসাধারণ। বয়স প্রায় প্রৌঢ়ত্বে আসিয়া পৌঁছিয়াছে, কিন্তু এই রাজপুতের দেশেও এমন বিশাল, বলিষ্ঠ চেহারা খুব কম চোখে পড়িয়াছে, তবে সাধারণ রাজপুত অপেক্ষা লোকটির রং ময়লা
আমাকে ফিরিয়া চাহিতে দেখিয়া লোকটি চমৎকার হিন্দুস্থানিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কতদূর যাবেন?
আমি গন্তব্য স্থান বলিবামাত্র হঠাৎ তিনি বাঙ্ক হইতে নামিয়া আসিয়া নীচের বেঞ্চিতে বসিয়া বলিলেন, ‘আপনি বাঙালি তাই না?’
নিজের পোশাক ও হিন্দুস্থানি উচ্চারণ সম্বন্ধে আমার একটু গর্ব ছিল। আমার এই পোশাকে এই সুদূর দেশে কেহ বাঙালি বলিয়া চিনিতে পারিবে, আশা করি নাই। বলিলাম, কেমন করে বুঝলেন? তিনি এবার পরিষ্কার বাঙলায় বলিলেন, ‘নিজেও বাঙালি বলে।
ট্রেনের দুই ধারে বেঞ্চি হইতে এইবার আমাদের আলাপ শুরু হইয়া গেল। এই শুষ্ক মরুর দেশে আমারই মতো আর একজন ভবঘুরে বাঙালির সাক্ষাৎ পাইয়া নিদ্রার কথা একেবারে ভুলিয়া গেলাম। কিছুক্ষণ আলাপের পর মনে মনে লোকটির প্রতি একটু শ্রদ্ধাই হইল। যাযাবর বৃত্তি অনেককাল হইতেই গ্রহণ করিয়াছি, কিন্তু শুধু বয়সে নয়, অনেক দিক দিয়াই এই লোকটির কাছে আমি শিশু। তাহার চুলে পাক ধরিলেও পর্যটনের নেশা আমার চেয়ে এখনও প্রবল আছে দেখিলাম। কত অদ্ভুত জায়গাই না তিনি দেখিয়াছেন, কত অদ্ভুত ঘটনাই না প্রত্যক্ষ করিয়াছেন!
গল্প করিতে করিতে কতক্ষণ কাটিয়া গিয়াছিল, বুঝিতে পারি নাই। এই বন্ধ্যা বালির দেশে স্টেশনগুলির দূরত্ব অত্যন্ত বেশি। এক জায়গা হইতে আর-এক জায়গায় যাইতে অনেকক্ষণ লাগে। কিন্তু তবু মনে হইল যে, এতক্ষণ দেগানার আগের স্টেশনে কাছে পোঁছাইবার কথা।
জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া কিন্তু স্টেশনের কোনও কিছু দেখিতে পাইলাম না। চাঁদ পশ্চিম দিকে হেলিয়া প্রায় ডুবিবার উপক্রম হইয়াছে, কিন্তু বালির সমুদ্রে ট্রেনের কামরাগুলির আলো ছাড়া স্টেশনের কোন আভাস কোথাও নাই।
জানালা হইতে মুখ ফিরাইতেই দেখিলাম, আমার সঙ্গী মৃদু মৃদু হাসিতেছেন। বলিলেন, ‘পৌঁছবার এত তাড়া কেন? এমন করে যাওয়াতেই তো সুখ!
বলিলাম, আমাদের সুখ হতে পারে, কিন্তু ট্রেন তো যথাসময়ে যথাস্থানে পৌছবে!এবার তাহার উত্তরের কোনও অর্থ খুঁজিয়া পাইলাম না। তিনি বলিলেন, ‘তারই বা কী মানে আছে?
খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া তিনি বলিলেন, “আমার ইচ্ছা করে, আপনাকে সঙ্গী করে নিই। আপনার মতো একটি ভবঘুরে লোকের সঙ্গই খুঁজছিলাম।
বিনীতভাবে বলিলাম, ‘নিলে তো আমিও সুখী হই--আমার সেটা সৌভাগ্য।
ভদ্রলোকের কথাবার্তা ক্রমশই অদ্ভুত মনে হইতেছিল। এ কথার উত্তরে কী বলিব ভাবিতেছি, এমন সময় ট্রেনের তীব্র হুইসিলের শব্দে চমকিত হইয়া উঠিলাম। রাত্রে চলন্ত ট্রেনের তীব্র হুইসিলের শব্দ সাধারণ অবস্থাতেও কী অদ্ভুত শোনায়, তাহা অনেকেরই জানা আছে। গাড়ির চাকায় অশ্রান্ত আওয়াজের উপরে ইঞ্জিনের তীক্ষ্ণ স্বর প্রবল গতির অনুভূতিকে তীব্রতর করিয়া তুলিয়া একটা আসন্ন ভয়ংকর বিপদের ইঙ্গিত যেন বহন করিয়া আনে।
সেদিন কিন্তু বিশাল মরুপ্রান্তরের মাঝে ইঞ্জিনের হুইসিলের শব্দ ঠিক আর্তনাদের মতো শুনাইতেছিল।
শব্দ আর থামে না! ট্রেনের গতিমুখ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কখনও একটু ক্ষীণ, কখনও একটু ক্ষীণ, কখনও অত্যন্ত স্পষ্ট হইয়া সে-শব্দ অবিরাম ধ্বনিত হইতে থাকে।
এখানে একটিমাত্র লাইনে একটি করিয়া গাড়ি যায় বলিয়া লাইন-ক্লিয়ারের গোলযোগ কখনও হয় না। তাহা হইলে এই অশ্রান্ত হুইসিলের কী প্রয়োজন? জানালার শার্সিটা আবার তুলিয়া ফেলিলাম। বাহিরের কনকনে হাওয়ার সঙ্গে ইঞ্জিনের চিৎকার যেন তীব্রতর হইয়া সত্যকার তীক্ষ্ণ ছুরিকার ফলার মতোই আমাকে বিদ্ধ করিল। পশ্চিম দিকচক্রবালে চাঁদের অর্ধেক সমাধি তখন হইয়া গিয়াছে। স্তিমিত আলোকে অসীম বালির সমুদ্র মনে হইল যেন মূর্ছাগত হইয়া আছে; আর তাহারই ভিতর প্রকাণ্ড একটা বেগবান সরীসৃপের মতো কোন অবর্ণনীয় আতঙ্কে উন্মত্তের মতো আর্তনাদ করিতে করিতে আমাদের ট্রেন উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ছুটিয়া চলিয়াছে মনে হইল। ট্রেনের আতঙ্ক যেন সেই মুহূর্তে আমারও মনে সঞ্চারিত হইয়া গেল। অনুভব করিলাম, ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে আমারও দেহ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে! ট্রেনের আর্তনাদ যেন আমারই বুক ফাটিয়া বাহির হইতেছে।
ঘরের মধ্যে ফিরিয়া চাহিতেই দেখিলাম, ভদ্রলোক তাঁহার পিঠে একটি থলি লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছেন। তাহারও সমস্ত মুখভাব পাণ্ডুর হইয়া গিয়াছে ।
আমার দিকে চাহিয়া ভীত অর্ধস্ফুটে স্বরে তিনি বলিলেন, ‘আর সময় নেই, এইবেলা লাফিয়ে পড়ুন!
কেন যে সময় নাই, কীসের যে বিপদ, ভাল করিয়া বুঝিবার তখন আমার সময় নাই। আমার মনের ভিতর সমস্ত যেন ইঞ্জিনের তীক্ষ্ণ বিরামহীন চিৎকারে বিশৃঙ্খল হইয়া গিয়াছে, শুধু গাড়ির চাকার একঘেয়ে শব্দে অনুভব করিতেছিলাম, যেন প্রতি মুহূর্ত একটা ভয়াবহ সম্ভাবনার দিকে নিরুপায়ভাবে আগাইয়া চলিয়াছে!
জীবনে বিপদে কখনও পড়ি নাই এমন নয়, কিন্তু এমন আতঙ্ক অতি বড় দুঃস্বপ্নের মাঝেও কখনও অনুভব করিয়াছি বলিয়া মনে করিতে পারি না। আমার অন্তরের গভীরতম তলদেশ হইতে উঠিয়া বিপুল বন্যার মতো এই ভয়ের অনুভূতি আমার চেতনাকে যেন মগ্ন করিয়া দিল। শ্বাসরোধকারী একটা অন্ধকার আমার মনের চারিধারে যেন গাঢ়ভাবে ঘিরিয়া আসিতেছে। এই মুহূর্তে চেষ্টা না করিলে তাহার কবল হইতে আর অব্যাহতি মিলিবে না।
আমার সঙ্গীর কণ্ঠ শুনিতে পাইলাম। একহাতে কামরার দরজাটা খুলিয়া ধরিয়া তিনি অঙ্গুলি-সংকেতে আমায় ডাকিয়া বলিলেন, ‘আসুন।
তাহার সে ডাক যেন আমার পক্ষে অলঙ্ঘনীয় আদেশ মনে হইল। আমাকে যাইতেই হইবে। আমার সমস্ত দেহ-মন যেন তাহার সেই ডাক অনুসরণ করিবার জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছে। আসন্ন বিভীষিকা হইতে মুক্তি পাইবার সে-ই একমাত্র উপায়। ট্রেন হইতে আমায় এই মুহূর্তেই লাফাইয়া পড়িতে হইবে।
জানালা দিয়া আর একবার বাহিরে চাহিলাম। পশ্চিম দিগন্তে চাঁদ তখন ডুবিয়া গিয়াছে। আকাশ ও ধরণী গাঢ় অন্ধকারে আবৃত। তাহারই ভিতর ইঞ্জিনের চুল্লির রাঙা আলো রক্তাক্ত ক্ষতের মতো দেখাইতেছিল। সেই ক্ষতের জ্বালায় অস্থির হইয়াই যেন এই বিরাট প্রাণীটি ছটফট করিয়া আতঙ্কে ছুটিয়া চলিয়াছে। নিত্যকার স্টেশন, লাইন সমস্ত যেন আমরা আজ ফেলিয়া আসিয়াছি। অসীম মরুর মাঝে আমাদের ট্রেন যেন দিক ভুল করিয়া ফেলিয়াছে। আর সেই আর্তনাদসত্যকার রক্তমাংসের জীবনের কণ্ঠ হইতেই যেন তাহা বাহির হইয়া আসিতেছে। সমস্ত অন্তর সেই অস্বাভাবিক চিৎকারে প্রতি মুহূর্তে শিহরিয়া উঠিতেছিল।
উঠিয়া দাঁড়াইলাম। এ ট্রেন আর খানিক বাদেই ধ্বংস হইয়া যাইবে, মনের মধ্যে এ বিশ্বাস দৃঢ় হইয়া গিয়াছে। আমার সঙ্গীর সহিত লাফাইয়া পড়িবার জন্য প্রস্তুত হইলাম। আমার সঙ্গী দরজার কাছে আগাইয়া গিয়া হঠাৎ ঝাঁপ দিয়া পড়িলেন। আমি দরজার কাছে অগ্রসর হইলাম।
কিন্তু আতঙ্কের বন্যা চেতনাকে একেবারে ভাসাইয়া লইয়া যাইতে বোধহয় পারে নাই। কোথায় একটু শিকড় আশ্রয় করিয়া তখনও সামান্য চেতনা বোধহয় জাগিয়া ছিল। সন্ত্রস্ত দেহ-মনে অত্যন্ত প্রবল একটি আকর্ষণ অনুভব করিলেও গাড়ি হইতে লাফাইতে পারিলাম না। দরজার হাতলে হাতটা যেন আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই জোর করিয়া আটকাইয়া রহিল।
হঠাৎ চমকিত হইয়া অনুভব করিলাম ট্রেনের হুইসিলের শব্দ থামিয়া গিয়াছে। অন্ধকারে সামনের দিকে চাহিয়া একটি স্টেশনের আলো যেন দেখা যাইতেছে বলিয়া মনে হইল।
দরজাটা বন্ধ করিয়া বেঞ্চিতে আসিয়া বসিলাম। মাথাটা ঝিম ঝিম করিতেছিল। এই দারুণ শীতের ভিতর সমস্ত শরীর ঘামিয়া উঠিয়াছিল। সহসা আমার সঙ্গীর কথা মনে করিয়া সচকিতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া শিকল টানিতে গেলামকিন্তু পারিলাম না। মাথাটা সেই মুহূর্তেই অত্যন্ত ঘুরিয়া উঠিল।
কতক্ষণ অজ্ঞান হইয়া ছিলাম বলিতে পারি না। কিন্তু জ্ঞান যখন হইল তখন দেগানা স্টেশনে গাড়ি থামিয়াছে, একটি বৃদ্ধ রাজপুত আমার গাড়িতে। তাহার দরজা খোলার শব্দেই চমকিত হইয়া উঠিয়া বসিলাম, এবং বাহিরে স্টেশনের নাম দেখিয়া তাড়াতাড়ি নামিয়া পড়িলাম।
দেগানা স্টেশনটি আরও ছোট। রাত্রির শেষ প্রহরে গাঢ় অন্ধকারের মাঝে একটি বাতি স্টেশন-মাস্টারের ঘরের সামনের প্লাটফর্মটুকুকেই আলোকিত করিয়াছে মাত্র। রাস্তার ঘটনা জানাইবার জন্য তাড়াতাড়ি স্টেশন-মাস্টারের ঘরের দিকেই গেলাম।
স্টেশন-মাস্টারের অফিসে দেখিলাম স্টেশন-মাস্টার গার্ড ও ড্রাইভারকে ধমক দিতেছেন। গাড়ি নাকি দুই ঘণ্টা লেট হইয়াছে। এখন বিপরীতমুখী গাড়ির জন্য তাহাকে সাইডিংয়ে ফেলিতেই হইবে, এবং তাহাতে দেরি হইবে আরও বেশি।
রোজ রোজ এইরকম লেট হইতেছে এই অপবাদে ক্ষুব্ধ হইয়া ড্রাইভার জানাইল সে কী করিবে, আজও বাঙালিবাবু নিশ্চয়ই তাহার গাড়ি চাপিয়াছিল! কথাটার মর্ম কিন্তু বুঝিতে পারিলাম না! স্টেশন-মাস্টার ক্রুদ্ধ হইয়া কী বলিতে যাইতেছিলেন আমি আর দেরি করিতে না পারিয়া তাহার কথায় বাধা দিয়া ট্রেনের ঘটনা বলিলাম এখনও ট্রলি পাঠালে তাকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। নিজে আমি তাহাদের সঙ্গে যাইতে রাজি আছি একথাও জানাইলাম। কিন্তু আমার কথার পর তাহাদের ব্যবহারে আমি অবাক হইয়া গেলাম। ড্রাইভার স্টেশন-মাস্টারের দিকে ফিরিয়া এবার অত্যন্ত গর্বভরে জিজ্ঞাসা করিল, সে যাহা বলিয়াছিল তাহা সত্য কি না?
স্টেশন-মাস্টারেরও রাগ দেখিলাম দূর হইয়া গিয়াছে। আমার কথায় তাঁরা একেবারেই গুরুত্ব না দেওয়ায় আবার বলিলাম, ‘একটা লোক হয়তো মারাই পড়েছে, আর আপনারা তাকে উদ্ধার করবার চেষ্টা করবেন না?’
স্টেশন মাস্টার একটু হাসিয়া বলিলেন, ‘সে চেষ্টা দশ বছর আগে করা উচিত ছিল। বাবু, এখন আর হয় না।
তার মানে?
তার মানে, দশ বৎসর আগে এ রেলের একটি ব্রাঞ্চ লাইনে একবার ট্রেন আউটলাইন হয়ে যাওয়ায় গাড়ি থেকে লাফাতে গিয়ে একজন বাঙালি বাবু মারা পড়েছিলেন। সে ব্রাঞ্চ লাইন এখন তুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু লোকে বলে বাঙালি বাবু এখনও সেই লাইনে নাকি ট্রেনকে এক-একদিন চালিয়ে নিয়ে যান। এক-একদিন যে অকারণে এ লাইনের গাড়ি লেট হয় সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
তার কথা শেষ হইবার পূর্বেই চমকাইয়া উঠিয়া আমি তাহাকে চুপ করিতে বলিলাম। নীরব হইয়া সকলেই আমার ভীত দৃষ্টি অনুসরণ করিল। প্লাটফর্মের একটি মাত্র বাতির আলোয় একটি দীর্ঘকায় পুরুষের ছায়া আমাদের ঘরের দরজায় আসিয়া পড়িয়াছে। দেখিলেই মনে হয় পিঠে তাহার একটা কিছু ভার আছে। ভাল করিয়া দেখিতে দেখিতেই সে ছায়া সরিয়া গেল।
এখানেও মহাকালের পথের পথিক বুঝি তাহার নিঃসঙ্গ যাত্রার সঙ্গী খুঁজিতে আসিয়াছিল!
আপলোড: ১৭/৮/২০১৯

No comments:

Post a Comment